দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে ‘ভিশন বরিশাল-২০৫০’ গ্রহণের দাবি
- সর্বশেষ আপডেট ০৮:০১:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 71
বরিশাল অঞ্চলকে শুধু দেশের শস্যভান্ডার হিসেবে নয়, দক্ষিণ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি ‘ভিশন বরিশাল-২০৫০’ গ্রহণের দাবি উঠেছে। ২০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি এই পরিকল্পনার মাধ্যমে শিল্প, জ্বালানি, কৃষি, মৎস্য, পর্যটন ও যোগাযোগব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বরিশাল ডিভিশনাল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিডিজেএ) আয়োজিত ‘আগামীর বরিশাল: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সেমিনারে বরিশালের সার্বিক উন্নয়নে সরকার, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিডিজেএর উপদেষ্টা ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল। প্রবন্ধে বলা হয়, দেশের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ বরিশাল বিভাগ থেকে আসে। এ অঞ্চলের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি প্রতিবছর দেশের প্রায় ১৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণ পর্যটক কুয়াকাটা, ভাসমান পেয়ারা বাজার ও সুন্দরবন ভ্রমণ করেন।
তবে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের অভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে শিল্প খাতের অবদান ৩০ শতাংশের বেশি হলেও বরিশাল অঞ্চলে তা ২ শতাংশেরও কম। বিসিক শিল্পনগরী থাকলেও মূলধনের সংকট এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সেমিনারে ভোলার গ্যাসসম্পদসহ দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোর তাগিদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে লবণাক্ততার প্রভাবে ধানের উৎপাদন ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং সুপেয় পানির সংকটের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
বরিশালের উন্নয়নে বিডিজেএর পক্ষ থেকে ১০ দফা কৌশলগত সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানি সরবরাহ ও ডেল্টা অভিযোজনের জন্য পৃথক ‘উপকূলীয় উন্নয়ন মন্ত্রণালয়’ গঠন, ঢাকা-পদ্মা সেতু-বরিশাল-পটুয়াখালী-পায়রা রেল সংযোগ চালু এবং ভাঙ্গা-কুয়াকাটা মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে। এসব বাস্তবায়ন হলে ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যাতায়াতের সময় ৫ থেকে সাড়ে ৫ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে সেমিনারে জানানো হয়।
পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলারও প্রস্তাব দেওয়া হয়। বছরে ৭৫ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতাসম্পন্ন এই বন্দরকে ঘিরে লজিস্টিক হাব ও প্রসেসিং অঞ্চল গড়ে তোলা, ধান, মাছ, পেয়ারা ও আমড়ার মূল্যসংযোজনে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং কোল্ড চেইন স্থাপন এবং প্রবাসীদের বিনিয়োগে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া নদীভাঙন, প্লাবন ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ডেল্টা মাস্টারপ্ল্যান, গুরুত্বপূর্ণ নদীপথ ড্রেজিং, ব্লু-ইকোনমি সম্প্রসারণ, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুয়াকাটা, বরগুনা ও সুন্দরবনকে যুক্ত করে পর্যটন সার্কিট গঠন, তরুণদের জন্য আইটি হাব ও কারিগরি-মেরিন প্রশিক্ষণ, বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে আঞ্চলিক উন্নয়ন ও জলবায়ু গবেষণাকেন্দ্রে রূপান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ভিশন-২০৫০ বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা গঠনেরও সুপারিশ করা হয়।
সেমিনারে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের সামনে উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এখন শিল্প, জ্বালানি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত করতে সরকার, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়ায় বরিশাল অনেক দিক থেকে পিছিয়ে আছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান শক্তি পানি উল্লেখ করে তিনি বলেন, পানিকে কাজে লাগিয়েই চট্টগ্রাম শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছে। বরিশাল বিভাগজুড়ে বিপুল জলসম্পদ থাকলেও তা যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। তাই উপকূলীয় অঞ্চলকে ঘিরে সঠিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সম্মিলিতভাবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান বলেন, বরিশাল অঞ্চলের উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতে ভালো রাজনীতিবিদ ও দক্ষ নেতৃত্ব তৈরির ওপরও জোর দিতে হবে। গত ১৭ বছরে অন্যান্য খাতের মতো রাজনীতিতেও অবক্ষয় হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভালো ছেলেরা রাজনীতিতে আসতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। এমনকি অনেক রাজনীতিবিদের সন্তানও রাজনীতিতে আসতে চাইছে না। এ বিষয়ে এখনই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে ভবিষ্যতে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান বলেন, সবাই উন্নয়নের কথা বললেও সমন্বয় ও ঐক্যের ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে বরিশালের উন্নয়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, সড়ক, সেতুসহ যেসব উন্নয়ন দাবি উঠেছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা কঠিন নয়। এ জন্য সুনির্দিষ্ট ও অগ্রাধিকারভিত্তিক দাবি তুলে ধরে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সংশ্লিষ্টদের কাছে স্পষ্টভাবে দাবি জানানো হলে তা বাস্তবায়ন সহজ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিশেষ অতিথি গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, অতীতে ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে বরিশালের উন্নয়নের অনেক কাজ থেমে গেছে। এতে পুরো অঞ্চল পিছিয়ে পড়েছে। তবে এখন বরিশালবাসীর সামনে উন্নয়নের বড় সুযোগ এসেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো নিয়ে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
বরিশাল অঞ্চলের সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকার জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামনে আনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, উন্নয়নের পাশাপাশি মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। মাদকের কারণে তরুণ প্রজন্ম বিপথগামী হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিটি এলাকাকে পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও নিরাপদ রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষ অতিথি প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, পটুয়াখালীতে এক্সপার্ট প্রসেসিং জোনের কাজ প্রায় অর্ধেক শেষ হয়েছে। বাকি কাজও এগিয়ে চলছে। বিনিয়োগকারীরা ইতোমধ্যে যোগাযোগ করছেন। প্রকল্পটি চালু হলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির গতিপথ বদলে যাবে। এ জন্য ছয় লেনের সড়ক এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বরিশাল-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মজিবুর রহমান সরোয়ার, ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম জামাল, পিরোজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য রুহুল আমিন দুলাল এবং পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আকন কুদ্দুস, সাবেক সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান, বরিশাল মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতি ও বিডিজেএর উপদেষ্টা মো. নিজাম উদ্দিন, শ্যামলীর ২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়শা আক্তার, বরিশাল প্রেস ক্লাবের সভাপতি অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম খসরু, সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, বিডিজেএর উপদেষ্টা আবু জাফর সূর্য, পটুয়াখালী জার্নালিস্ট ফোরামের সভাপতি বদরুল আলম নাবিল এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কে এম শরিয়াতুল্লাহ।
বিডিজেএর সভাপতি মাহবুব সৈকতের সভাপতিত্বে সেমিনার সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সানবির রুপল ও নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং সেমিনার আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক কাজী জেবেল।
অনুষ্ঠানে বিডিজেএর সিনিয়র সহসভাপতি এম এম বাদশাহ, সহসভাপতি কে জেড সোহেল, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব জুয়েল, সাংগঠনিক সম্পাদক বোরহান উদ্দিন, অর্থ ও দপ্তর সম্পাদক ফাহিম মোনায়েম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইউসুফ বাচ্চু, প্রশিক্ষণ ও কল্যাণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিন্টুসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিডিজেএর সাবেক সভাপতি তারিকুল ইসলাম মাসুম, মিজান সবুজ, কাজী জেবেল, এটিএন নাজিয়া আফরিনসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।





























