নাফ পাড়ির অপেক্ষায় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা!
- সর্বশেষ আপডেট ০৩:০৯:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৫
- / 396
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় কক্সবাজারে শুরু হয়েছে তিন দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন। সমুদ্র পাড়ে যখন এই সম্মেলন চলছে; ঠিক তখন নাফ নদীর ওপারে রাখাইনে নতুন করে অন্তত এক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্ত পাড়ির অপেক্ষায় রয়েছে।
দুই পাড়ের স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, শুক্রবার রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত টানা গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য সিরাজুল মোস্তফা চৌধুরী বলেন, হঠাৎ করেই ওপারের গ্রামগুলোতে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে নাফ নদে থাকা জেলেসহ সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এর আগেও দীর্ঘ সময় সীমান্তে মর্টারশেলের বিকট শব্দে মানুষ আতঙ্কে দিন কাটিয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল। হঠাৎ নতুন করে গোলাগুলির শব্দে বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানিয়েছে, গত এক বছরে নতুন করে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এখনও অন্তত এক লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ির অপেক্ষায় রয়েছে।
শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ নাগাদ আরও অর্ধলক্ষ রোহিঙ্গা প্রবেশের শঙ্কা রয়েছে।
কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, সীমান্তে এখন বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বর্ডার দিয়ে প্রতিনিয়ত মাদক, অস্ত্রসহ নানা অপরাধমূলক কার্যক্রম বাড়ছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ সর্বদা তৎপর থাকলেও চ্যালেঞ্জ ক্রমেই বাড়ছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, সামরিক জান্তা বা নির্বাচিত সরকার যেই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, মিয়ানমারের নীতির পরিবর্তন না হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়।
তিনি উল্লেখ করেন, আফগানিস্তান, প্যালেস্টাইন বা ইউক্রেনের শরণার্থীরা তৃতীয় দেশে আশ্রয় পেলেও রোহিঙ্গারা সে সুযোগ পায়নি। ফলে বাংলাদেশে তাদের চাপ বেড়ে যাচ্ছে।
সীমান্তে অস্থিরতার মধ্যে বিজিবি সম্প্রতি আরাকান আর্মির এক সদস্যকেও আটক করেছে, যিনি অস্ত্রসহ পালিয়ে এসেছিলেন। নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানায়, এ পর্যন্ত পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে, তাদের মধ্যে তিনজন মিয়ানমারের নাগরিক।
২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাখাইনদের নির্যাতনে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর পূর্ণ হবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢলের ৮ বছর।

এরপর গত অর্ধযুগ ধরে তাদের প্রত্যাবাসনের প্রচেষ্টা চলে আসছে, কিন্তু আলোর মুখ দেখেনি। এরই মাঝে গত রমজানে (১৪ মার্চ) জাতিসংঘের মহাসচিবের উপস্থিতিতে ক্যাম্পে আয়োজন করা রোহিঙ্গাদের এক সমাবেশে।
সেখানে অন্তবর্তীকালিন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, এই ঈদ না হোক, আগামী ঈদে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ঈদ করতে পারবেন। উপদেষ্টার এমন প্রত্যাশা বাণী স্বস্তি এনেছিল সবার মাঝে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার এই প্রত্যাশা আর বাস্তবায়ন হয়নি।
উল্টো রাখাইনের গত কয়েক দিনের কার্যক্রমে সীমান্তে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সীমান্তের ওপারে নতুন করে আরাকান আর্মির নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে।
ইতোমধ্যে আরাকান আর্মি (এএ) রাখাইনের ১৭টির মধ্যে ১৪টি টাউনশিপ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা জানিয়েছে, প্রদেশটির রাজধানী সিত্তে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিয়াউকফিউসহ দ্রুততম সময়ে বাকি অঞ্চল দখলের শপথ নিয়েছে বিদ্রোহীরা। কিয়াউকফিউতে চীনের নির্মিত গভীর সমুদ্রবন্দর ও তেল-গ্যাসের পাইপলাইন রয়েছে।
এ ঘটনায় নতুন করে রোহিঙ্গাদের ওপর চাপ বেড়েছে। সেখানকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতনের হার কয়েকগুণ বেড়েছে।
আরাকানের বুথিডং থেকে পালিয়ে আসা সেলিম নামে এক যুবক জানান, আরাকান আর্মির নির্যাতনে তিনি মাসহ পরিবারের তিনজনকে হারিয়েছেন। যদিও নিজে প্রাণে বেঁচে আছেন, কিন্তু চোখের সামনে পরিবারের সদস্যদের হারানোর বেদনা তাকে আজীবন তাড়া করবে। ক্যাম্পের ভেতর গিয়ে দেখা যায়, অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, কারও হাত কেটে নেওয়া হয়েছে, আবার কেউ কেউ আর কখনও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবেন না।
বিজিবি টেকনাফ- ২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন, কিছু লোক সীমান্তে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছেন। কিন্তু কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। অনুপ্রবেশের সম্ভাব্য পয়েন্টগুলোতে টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সীমান্তে পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় কোস্টগার্ড ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও সতর্কাবস্থানে আছে বলে জানিয়েছেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দিন।


































