ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগের আহ্বান
- সর্বশেষ আপডেট ০৩:৪৬:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
- / 16
‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’; এই নীতিকে বাস্তবে নিশ্চিত করতে সরকারকে সম্মিলিতভাবে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেতারা। একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক উসকানি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও সহিংসতা প্রতিরোধে রাষ্ট্রের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন তারা।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে এ আহ্বান জানানো হয়। ‘সাম্প্রদায়িক উসকানি প্রতিরোধ করি, সকল নাগরিকের মানবাধিকার নিশ্চিত করি’; এই প্রতিপাদ্যে শারদীয় দুর্গাপূজার প্রাক্কালে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার দাবিতে কর্মসূচিটি আয়োজন করা হয়।
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম, লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা ও ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক কানিজ ফাতেমা টগর। কর্মসূচি সঞ্চালনা করেন প্রোগ্রাম অফিসার নুরুন নাহার তানিয়া। এতে সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেত্রী, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, কর্মকর্তা ও সাংবাদিকসহ প্রায় ৭০ জন অংশ নেন। একই দিনে দেশের ৫৭টি জেলা শাখায়ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন তৈরি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং ঘৃণা ছড়ানোর প্রবণতা বিভিন্ন মাধ্যমে বাড়ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে উসকানিমূলক বক্তব্য ও প্রচারণার বিস্তার উদ্বেগজনক। এর প্রভাব বাস্তব জীবনেও পড়ছে।
তারা বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা ধরনের উসকানিমূলক প্রচারণা। মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধির সঙ্গেও সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে। এসব পরিস্থিতিতে শিশু থেকে প্রবীণ; কেউই নিরাপদ নয় বলে মন্তব্য করেন বক্তারা।
একটি উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠী সমাজে ভয়, বিদ্বেষ ও অস্থিরতা তৈরি করে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায় উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, এ ধরনের অপতৎপরতা প্রতিহত করতে শান্তিকামী ও সম্প্রীতিপ্রিয় নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। একই সঙ্গে বাংলার আবহমান অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি ও বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থানের ঐতিহ্য ধরে রাখতে সব ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানান তারা।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ধর্মীয় উৎসব পালনের সুযোগ ও অধিকার পাওয়ার জন্য কাউকে রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানাতে হবে; এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা কাম্য নয়। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা ছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পেছনে সব সময় ধর্মীয় কারণ থাকে না। জমি দখল, ব্যক্তিগত বিরোধ, সম্পদ লুট কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের মতো কারণেও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এসব কর্মকাণ্ড আড়াল করতে ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করা হয়।
সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার রয়েছে; শুধু এমন ঘোষণা দিলেই হবে না; সেই অধিকার বাস্তবে নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। রাষ্ট্রকে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের পাশাপাশি সম্প্রীতিপূর্ণ সামাজিক পরিবেশ তৈরিতেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
আসন্ন দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ডা. ফওজিয়া মোসলেম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পূজাকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য হামলা বা বিশৃঙ্খলা নিয়ে নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে উল্লেখ করে তিনি এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরির আহ্বান জানান।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, উসকানিমূলক বা বিভাজন সৃষ্টিকারী বক্তব্য প্রচার না করে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে।
সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। প্রতিবছর এ উৎসবকে সামনে রেখে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে কর্মসূচি পালন করে। কারণ, সারা বছর বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, উসকানিমূলক বক্তব্য, বিদ্বেষমূলক প্রচার ও সহিংস কর্মকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
এসব ঘটনায় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক তৈরি হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, হামলা কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
দুর্গাপূজা এখন শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, দেশের মানুষের অংশগ্রহণে এটি সামাজিক সম্প্রীতিরও উৎসবে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে মালেকা বানু বলেন, উৎসবটি নির্বিঘ্ন, নিরাপদ ও আনন্দময়ভাবে পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম বলেন, প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে মানববন্ধনে দাঁড়াতে হওয়া দুঃখজনক। দেশ স্বাধীনের ক্ষেত্রে জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সবার অবদান থাকলেও নাগরিক হিসেবে দেশে বসবাসের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, পুলিশি পাহারায় ধর্মীয় উৎসব উদযাপন কখনো স্বস্তিদায়ক হতে পারে না। বিভিন্ন হামলার ঘটনায় সরকার পদক্ষেপ নিলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া উসকানিমূলক বক্তব্য বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে। গত দুই বছরে মবের উত্থানও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলোর বিস্তার বাড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সীমা মোসলেম এসব বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সাম্প্রদায়িক উসকানি প্রতিরোধ, সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত এবং নিরাপদ পরিবেশে ধর্মীয় উৎসব পালনের নিশ্চয়তা দেওয়ার দাবি জানান।





























