এক নেত্রীর ছায়ায় বন্দি আওয়ামী লীগ
- সর্বশেষ আপডেট ১০:৪২:৪৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ অগাস্ট ২০২৫
- / 243
“শেখ হাসিনা না থাকলে আওয়ামী লীগ কী দাঁড়াবে?” বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রশ্নটি আজ নিঃশব্দে, কিন্তু গভীরভাবে ধ্বনিত হচ্ছে। এটি নিছক কোনো দলীয় বিতর্ক নয়, বরং জাতির সামনে এক চরম আত্মজিজ্ঞাসা; একটি দলের ভবিষ্যৎ, একটি রাজনৈতিক ঐতিহ্যের স্থায়িত্ব এবং একটি আদর্শিক ধারার ধারাবাহিকতা নিয়ে।
নিঃসন্দেহে রাজনীতি আজ এক অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণে। নির্বাচন সামনে, রাজনৈতিক দলগুলো নানা প্রস্তুতিতে ব্যস্ত’ আশা, উত্তেজনা, হিসাব-নিকাশ আর জল্পনা-কল্পনায় ভরপুর। কিন্তু এই কোলাহলের মধ্যে একটি দল নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিঃশব্দ এক লড়াইয়ে লিপ্ত; দলটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
এই লড়াই কোনো নির্দিষ্ট ভোট বা প্রতীকের জন্য নয়; এই লড়াই অস্তিত্ব রক্ষার, পরিচয়ের ভার বহনের, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষার। এই অস্তিত্ব সংকটের কেন্দ্রে আজ এক প্রশ্ন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে, “শেখ হাসিনার পর আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী?”
ইতিহাসের একক নেতৃত্ব
১৯৮১ সালের ১৭ মে, পরিবারের সবাইকে হারিয়ে শেখ হাসিনা ফিরেছিলেন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে। তিনি ফিরেছিলেন কেবল বাবার স্মৃতি ধারণ করে নয়, এক বিধ্বস্ত ও নেতৃত্বশূন্য দলকে পুনরুজ্জীবিত করতে। সামরিক দমন-পীড়ন, বিভক্তি আর হতাশার মধ্যে তিনি আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের পথে নিয়ে যান।
এক নেত্রীর নেতৃত্বে ৪৩ বছরের যাত্রা ইতিহাসে বিরল। তবে সেই নেত্রী আজ নানা প্রশ্নের মুখোমুখি; স্বৈরশাসনের অভিযোগ, গণতন্ত্র হরণ, বিরোধী দমন, গুম-খুন, মিডনাইট ভোট, বাকস্বাধীনতা হরণ সবই তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে।
অন্যদিকে, ডিজিটাল বাংলাদেশ, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ বিপ্লব, অবকাঠামোগত অগ্রগতি; তাঁর হাত ধরেই এগিয়েছে দেশ।
তবে প্রশ্ন রয়ে যায়; এই দীর্ঘ নেতৃত্বের ছায়ায় কেন কোনো বিকল্প তৈরি হয়নি?
নেতৃত্ব মানেই শেখ হাসিনা?
আজকের আওয়ামী লীগ এমন এক কাঠামোতে দাঁড়িয়েছে, যেখানে “নেতৃত্ব” শব্দটির সমার্থক হয়ে উঠেছেন শেখ হাসিনা। দলীয় শীর্ষ ফোরাম, কেন্দ্রীয় কমিটি, নীতিনির্ধারণী সভা; সবই যেন আনুষ্ঠানিকতার স্তরে নেমে এসেছে। বাস্তব সিদ্ধান্ত আসে কেবল “নেত্রীর নির্দেশ” হিসেবে।
এমনকি ক্ষমতার বাইরে থাকাকালীন সময়েও তিনি একক নেতৃত্ব বজায় রাখেন। ফলত, এক সময়ের গণতান্ত্রিক চর্চায় ঋদ্ধ দল আজ হয়ে উঠেছে একব্যক্তিকেন্দ্রিক একনায়কতান্ত্রিক কাঠামো।
বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি হয়নি কেন?
১৯৮০-৯০ দশকের সামরিক শাসন, দলীয় বিভক্তি ও হিংস্র প্রতিপক্ষ শেখ হাসিনাকে এমন এক বাস্তবতায় দাঁড় করায়, যেখানে বিকল্প গড়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত সরকারের সময় দলের ‘সংস্কারপন্থী’দের বিশ্বাসভঙ্গ তাঁকে করে তোলে আরও আত্মকেন্দ্রিক। ধারণা করা হয়, তখন থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, “আমি ছাড়া আওয়ামী লীগ চলবে না।”
এরপর গড়ে ওঠে এক বলয়; যেখানে পরামর্শ নয়, কেবল প্রশংসা উচ্চারিত হয়। সৈয়দ আশরাফ, আব্দুর রাজ্জাক, আমু, তোফায়েল বহু প্রাজ্ঞ নেতার অবস্থান সীমিত হয়ে পড়ে। সমালোচনা মানেই হয়ে ওঠে ‘অবিশ্বাস’, মতামত মানেই ‘অপরাধ’।
সাংগঠনিক কাঠামোর অবক্ষয়
দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে কোনো বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির চর্চা ছিল না। যুবলীগ, ছাত্রলীগ, মহিলা লীগ; সবই পরিণত হয় নিয়োগ-ভিত্তিক সুবিধাভোগী কাঠামোতে। আদর্শ ও চেতনার জায়গা দখল করে নেয় আনুগত্য ও সুবিধাবাদ।

ফলে আওয়ামী লীগের ভেতরে এখন দেখা যায়:
নেত্রী = আদেশদাত্রী মা
কেন্দ্রীয় নেতারা = আনুগত্য প্রদর্শনকারী ম্যানেজার
তৃণমূল = সুযোগসন্ধানী কর্মচারী
জনগণ = হতাশ, সন্দেহপ্রবণ সাবেক শুভাকাঙ্ক্ষী
এই কাঠামো না ভাঙলে দলের ভবিষ্যৎ নেত্রীনির্ভর ও অস্থিরই থেকে যাবে।
নেতৃত্ব অনুপস্থিত হলে কী হবে?
শেখ হাসিনা যদি হঠাৎ অবসর নেন বা অনুপস্থিত হন, তাহলে:
কে হবেন সভাপতি?
কে দল চালাবেন?
কে সামলাবেন বিভাজন ও প্রতিযোগিতা?
কে সমন্বয় করবেন তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত?
এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর নেই। কারণ, শেখ হাসিনা কাউকে দায়িত্ব দিয়ে দেখেননি, কাউকে স্বাভাবিকভাবে ওপরে উঠতে দেননি।
প্রেসিডিয়াম সদস্যরা কি প্রস্তুত?
না, তারা জানেন না কী হবে। পালিয়ে যাওয়ার এক বছর পার হলেও এখনো দলীয়ভাবে কোনও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বা ‘শেডো লিডার’ নেই। ভবিষ্যতের জন্য কৌশলগত হস্তান্তর পরিকল্পনাও অনুপস্থিত।
ক্ষমতার বাইরে আওয়ামী লীগ কতটা প্রস্তুত?
তৃণমূলের অনেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।
সুবিধাবাদী চক্র দলবদল করবেন বা চুপ হয়ে যাবেন।
অনেকে আইনি হয়রানির শিকার হবেন।
প্রশাসন সরে গেলেই সংগঠন ভেঙে পড়বে।
আওয়ামী লীগ আন্দোলনে জন্ম নিয়েছিল, আন্দোলনের দল ছিল। আজ সেই আন্দোলন ও গণচর্চার মেরুদণ্ড হারাতে বসেছে।
উত্তরাধিকার ও ‘পারিবারিক কোম্পানি’ ভাবনা
শেখ হাসিনার পর নেতৃত্বে শেখ রেহানা বা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নাম শোনা যাচ্ছে; যারা কখনো গণতান্ত্রিকভাবে দলে নেতৃত্বে আসেননি। এ প্রবণতা দলকে পরিবারনির্ভর প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত করতে পারে।
আজকের প্রজন্ম জানে না; নেত্রী না থাকলে কাকে অনুসরণ করবে। তারা ভাবতেও ভয় পায়। এটা সাংগঠনিক দুর্বলতা নয়, রাজনৈতিক পরিণতির পূর্বাভাস।
সাংবাদিক ও লেখক
































