ভারতের সামনে নতুন পরীক্ষা
আস্থার সংকটে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে বরফ গলাবে কে?
- সর্বশেষ আপডেট ০৪:২৩:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 165
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয় শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণেও নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন বার্তার মাধ্যমে ইতিবাচক সংকেত দিলেও দুই দেশের সম্পর্কে এখনও স্পষ্ট আস্থাহীনতা রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিশ্লেষণ বলছে, এই পরিস্থিতিতে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার দায় মূলত ভারতের ওপরই বর্তায়।
গত কয়েক বছরে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক ধীরে ধীরে জটিল হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা এবং রাজনৈতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জমে থাকা অসন্তোষ আবার সামনে আসে।
একই সময়ে ভিসা সেবা সীমিত হওয়া, স্থল যোগাযোগ কমে যাওয়া এবং সরাসরি ফ্লাইট সংখ্যা হ্রাস দুই দেশের জনগণ পর্যায়ের যোগাযোগেও প্রভাব ফেলে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত–পারের রাজনৈতিক বক্তব্যের উত্তাপ। ভারতের কিছু রাজনৈতিক মহল ও টেলিভিশন বিতর্কে বাংলাদেশ নিয়ে উসকানিমূলক মন্তব্য ঢাকায় এমন ধারণা তৈরি করেছে যে, নয়াদিল্লি বাংলাদেশকে সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের প্রশ্ন এখন কূটনৈতিক অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন চিত্রও তুলে ধরে। প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত, নিরাপত্তা সহযোগিতা, গভীর সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এবং পারস্পরিক বাণিজ্যিক নির্ভরতা দুই দেশকে কার্যত একে অপরের জন্য অপরিহার্য করে রেখেছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার বাংলাদেশ, আবার এশিয়ায় বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রফতানি বাজার ভারত। ফলে সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী দূরত্ব বাস্তবসম্মত নয়; বরং প্রয়োজন নতুন কৌশলগত সমন্বয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই প্রশ্ন উঠছে প্রথম পদক্ষেপ কে নেবে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতেরই এগিয়ে আসা উচিত।
ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, শক্তিশালী নির্বাচন শেষে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের উচিত সংলাপ শুরু করা এবং সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো খুঁজে দেখা।
তিনি মনে করেন, বিএনপি অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে বলেই নতুন সম্পর্কের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়াল মনে করেন, বিএনপি ও ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে অবিশ্বাসে চিহ্নিত ছিল।
তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির নেতৃত্ব অতীতকে ভবিষ্যতের বাধা হতে দেয়নি, যা রাজনৈতিক পরিপক্বতার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে দিল্লির মধ্যেও বাস্তববাদী সম্পৃক্ততার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে সামনে পথ সহজ নয়। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের ‘নতুন স্বাভাবিকতা’ নির্ভর করবে দুই পক্ষের রাজনৈতিক বার্তা ও আচরণের ওপর।
ঢাকার নতুন নেতৃত্ব যদি অভ্যন্তরীণ ভারতবিরোধী মনোভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এবং নয়াদিল্লি যদি উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য থেকে সরে এসে বাস্তববাদী কূটনীতি অনুসরণ করে, তাহলে সম্পর্ক নতুন ভারসাম্যে পৌঁছাতে পারে।
অন্যথায় ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক হয়তো সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার মাঝামাঝি এক ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র অবস্থাতেই আটকে থাকবে।


































