মসজিদের পাশেই উচ্চ শব্দে ডিজে পার্টি
অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়িতে পার্টির আড়ালে কী?
- সর্বশেষ আপডেট ১১:৫৮:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
- / 28
রাজধানীর খিলক্ষেতের পুলিশ অফিসার হাউজিং সোসাইটিতে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের ভাড়া দেওয়া বাড়িতে মাসে ২০ থেকে ২২ দিন ডিজে পার্টির আয়োজন হতো বলে জানিয়েছে পুলিশ। এসব আয়োজনে উচ্চ শব্দে গান-বাজনা, নাচ ও মাদক সেবনের অভিযোগ রয়েছে। এতে আশপাশের বাসিন্দারা অতিষ্ঠ হয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগও করেছিলেন।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার ওই বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযান শেষে ৮৫ জনকে আটক করা হয়। পরে তাদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এ ঘটনায় বাড়ির মালিক অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে।
পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) জানিয়েছে, অভিযানে তিনটি বোতলে আনুমানিক এক লিটার ৭০০ মিলিলিটার মদ, একটি ইয়াবা, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম ও অল্প পরিমাণ কুশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া বাড়িটি থেকে কনডম উদ্ধারের কথাও জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এসব পার্টিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সন্তানদেরও যাতায়াত ছিল। উচ্চ শব্দে গান-বাজনার কারণে আশপাশের বাড়ির বাসিন্দাদের পাশাপাশি এলাকার একটি মসজিদেও সমস্যা হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির বুধবার মিন্টো রোডে নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ওই বাড়িতে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। অভিযানের আগে তাঁর কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য ছিল না। পরে তাঁকে অভিযানে যুক্ত করা হয়।
ঘটনাস্থলের বর্ণনা দিয়ে ইলিয়াস কবির বলেন, হাউজিং সোসাইটির ভেতরে একটি মসজিদের আশপাশ থেকেও উচ্চ শব্দে গান শোনা যাচ্ছিল। সেখানে প্রায় ২২টি গাড়ি ছিল। অভিযানের সময় ২৬ তরুণীসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্যাংকারদের পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, পার্টিতে সিসা সেবন, উচ্চ শব্দে গান ও নাচ চলছিল। পুলিশ প্রবেশের পর উপস্থিত ব্যক্তিরা দৌড়ে ভবনের ওপরের তলায় চলে যান। ভবনটির কয়েকটি কক্ষে নারী ও পুরুষকে একসঙ্গে পাওয়া যায়।
মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টির আয়োজন
ডিসি ইলিয়াস কবির জানান, এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলা নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পার্টিতে অংশগ্রহণকারীদের নিবন্ধন করা হতো। বাড়িটির ‘হোস্ট’ ছিলেন অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির এবং ‘কো-হোস্ট’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন মাহবুবুল আলম।
মাহবুবুল আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ২০২৫ সাল থেকে বাড়িটিতে এ ধরনের পার্টির আয়োজন হয়ে আসছিল। প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টি হতো বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
এসব আয়োজনে ১০ জনের কাছ থেকে ১৮ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হতো। এ ছাড়া আরও প্রায় ৯০ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ৬০০ টাকা নেওয়া হতো। তবে মাসে মোট কত টাকা আয় হতো, সেই অর্থ কারা পেতেন এবং বাড়ির মালিকের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন কীভাবে হতো, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষদের এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে, নারীদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও তিন দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয় বলে জানান ইলিয়াস কবির।
অভিযানে আটক কয়েকজনকে তদবিরের মাধ্যমে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা। তবে এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
দায় এড়ালেন বাড়ির মালিক
বাড়ির মালিক অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ডিসি ইলিয়াস কবির বলেন, এটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, বাড়িটিতে ডিজে পার্টির আয়োজন ও আয়ের ভাগ নিয়ে আব্দুল্লাহ আল জহির বলেন, এয়ারবিএনবির নিয়ম অনুযায়ী বাড়ির মালিক মূল হোস্ট হলেও পার্টির আয়োজন করতেন কো-হোস্ট মাহবুবুল আলম। তাঁকে ব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
আব্দুল্লাহ আল জহিরের ভাষ্য, মাহবুবুল আলমকে সব নিয়ম মেনে আয়োজন পরিচালনা করতে বলা হয়েছিল। কোনো নিয়ম লঙ্ঘন হলে তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে জানাতে এবং প্রয়োজনে অনুষ্ঠান বাতিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, ঘটনার দিন সেখানে ৩৫ থেকে ৪০ জন অতিথি থাকার কথা তাঁকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু অভিযানে এর প্রায় দ্বিগুণ মানুষ আটক হয়েছেন। মাহবুবুল আলম সাজা ভোগ করে বের হওয়ার পর তাঁর কাছ থেকে বিস্তারিত জানতে চান বলে জানান তিনি।
আয়ের ৭০ শতাংশ পাওয়ার বিষয়ে আব্দুল্লাহ আল জহির বলেন, ওই অর্থ বাড়ির ভাড়া। বাকি অংশ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ মাহবুবুল আলম নিতেন। এ ছাড়া বাড়ির পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও বাগান পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও অর্থ পেতেন বলে দাবি করেন তিনি।
































