ঢাকা ০২:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তানজিদের ইতিহাস

ক্রীড়া প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:৩৪:৫০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
  • / 26

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তানজিদের ইতিহাস

তানজিদ হাসান তামিমকে নিয়ে প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশারের আস্থা যে ভুল ছিল না, সেটি প্রমাণ করতে খুব বেশি সময় নিলেন না এই তরুণ ওপেনার। মারকুটে ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত তানজিদ টেস্ট ক্রিকেটে কতটা কার্যকর হতে পারেন, তা নিয়ে শুরু থেকেই ছিল সংশয়। তবে হাবিবুল বাশার বিশ্বাস করেছিলেন, আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের এই ধরন সাদা পোশাকেও সফল হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় টেস্টেই সেই বিশ্বাসের প্রতিদান দিলেন তানজিদ।

ডারউইনের মারারা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করেছেন বাংলাদেশের এই ওপেনার। ১৯৭ বলে ৮টি চার ও একটি ছক্কায় ১০১ রানের ইনিংস খেলে গড়েছেন ইতিহাস। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে সেঞ্চুরি করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার এখন তানজিদ হাসান তামিম।

চলতি বছর মে মাসে সিলেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল তানজিদের। সেই ম্যাচে অবশ্য বলার মতো কিছু করতে পারেননি তিনি। প্রথম ইনিংসে ২৬ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে করেছিলেন মাত্র ৪ রান। এরপর অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রস্তুতি ম্যাচেও ব্যর্থতা ছিল সঙ্গী। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে দুই ইনিংসে তার সংগ্রহ ছিল শূন্য ও ২২ রান।

এমন পারফরম্যান্সের পর অস্ট্রেলিয়ার মূল একাদশে তানজিদকে রাখা হবে কি না, সেটি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ছিল। সাদমান ইসলাম ছিলেন সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের কারণে এগিয়ে। অভিজ্ঞ সৌম্য সরকারও ছিলেন বিবেচনায়। ১৬ টেস্ট খেলা সৌম্যর সর্বোচ্চ ইনিংস ১৪৯ রান, সেটিও এসেছিল নিউজিল্যান্ডের কঠিন কন্ডিশনে। অভিজ্ঞতা ও প্রতিকূল পরিবেশে বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্যের কারণে সৌম্যও ছিলেন শক্ত দাবিদার।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিম ম্যানেজমেন্ট আস্থা রাখে তানজিদের ওপর। আর সেই আস্থার জবাব তিনি দিয়েছেন ব্যাট দিয়েই।

অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের সামনে তানজিদের ব্যাটিংয়ে ছিল অসাধারণ পরিণতিবোধ। মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজেলউডদের মতো বিশ্বমানের বোলারদের বিপক্ষে তাকে একবারও অস্বস্তিতে পড়তে দেখা যায়নি। বরং মাঠের চারদিকে সাবলীল স্ট্রোক খেলেছেন তিনি। সবচেয়ে বড় বিষয়, ঝুঁকিপূর্ণ শটের বদলে পরিস্থিতি বুঝে খেলেছেন, রান নিয়েছেন সিঙ্গেল-ডাবলসে এবং ধৈর্য ধরে ইনিংসকে এগিয়ে নিয়েছেন।

দ্বিতীয় দিনের শুরুতে ৩২ রানে অপরাজিত ছিলেন তানজিদ। সকালের কঠিন সময় পার করে মুমিনুল হকের সঙ্গে ১৮৯ বলে ১০২ রানের জুটি গড়েন তিনি। পরে নাজমুল হোসেন শান্তকে সঙ্গে নিয়ে যোগ করেন আরও ৯৩ রান। এই জুটির মাঝেই ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তানজিদ।

নব্বইয়ের ঘরে গিয়েও কোনো অযথা ঝুঁকি নেননি তিনি। বড় শট খেলার পরিবর্তে সিঙ্গেল-ডাবলস নিয়ে ধীরে ধীরে তিন অঙ্কে পৌঁছান। মাত্র দ্বিতীয় টেস্টে এমন নিয়ন্ত্রিত ব্যাটিং তার পরিণত মানসিকতারই প্রমাণ দিয়েছে।

তানজিদের সেঞ্চুরিটি আরও বিশেষ হয়ে উঠেছে প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণের কারণে। সেঞ্চুরি করার পথে তিনি যেসব অস্ট্রেলিয়ান বোলারের মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের সম্মিলিত টেস্ট অভিজ্ঞতা ৪৩৯ ম্যাচ। মিচেল স্টার্ক খেলেছেন ১০৫ টেস্ট, নাথান লিয়ন ১৪১, জশ হ্যাজেলউড ৭৬, প্যাট কামিন্স ৭২, ক্যামেরন গ্রিন ৩৭ এবং বিউ ওয়েবস্টার ৮টি টেস্ট।

এই সেঞ্চুরির মাধ্যমে ব্যক্তিগত মাইলফলকের পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্রিকেটেও নতুন অধ্যায় লিখেছেন তানজিদ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান তিনি। একই সঙ্গে ডারউইনের মারারা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে কোনো ব্যাটারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইনিংসও এটি।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে বাংলাদেশও এখন দারুণ অবস্থানে। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের ১৯৮ রানের জবাবে দ্বিতীয় দিনের চা-বিরতিতে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ৩ উইকেটে ২৮৬ রান। লিড দাঁড়ায় ৮৮ রানে। দিনের শুরুতে ১ উইকেটে ৯৬ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশ প্রথম সেশনে যোগ করে ৮৫ রান। মুমিনুল হক ৪৯ রানে আউট হন।

এরপর তানজিদের সেঞ্চুরি ও নাজমুল হোসেন শান্তর দৃঢ় ব্যাটিং বাংলাদেশকে বড় লিডের পথে এগিয়ে নেয়। তানজিদ ১০১ রানে ফিরে গেলেও শান্ত ৭৯ রানে অপরাজিত ছিলেন। তার সঙ্গে ক্রিজে ছিলেন মুশফিকুর রহিম, ২৬ রানে অপরাজিত।

হাবিবুল বাশারের সেই ‘বাজি’ তাই আপাতত দারুণভাবেই সফল। যে তানজিদকে অনেকে শুধু সীমিত ওভারের ক্রিকেটের জন্য উপযুক্ত মনে করতেন, সেই তানজিদই দেখিয়ে দিলেন; আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের সঙ্গে ধৈর্য, নিয়ন্ত্রণ ও পরিণতিবোধ যোগ হলে টেস্ট ক্রিকেটেও তা হতে পারে ভয়ংকর কার্যকর।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তানজিদের ইতিহাস

সর্বশেষ আপডেট ১১:৩৪:৫০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

তানজিদ হাসান তামিমকে নিয়ে প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশারের আস্থা যে ভুল ছিল না, সেটি প্রমাণ করতে খুব বেশি সময় নিলেন না এই তরুণ ওপেনার। মারকুটে ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত তানজিদ টেস্ট ক্রিকেটে কতটা কার্যকর হতে পারেন, তা নিয়ে শুরু থেকেই ছিল সংশয়। তবে হাবিবুল বাশার বিশ্বাস করেছিলেন, আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের এই ধরন সাদা পোশাকেও সফল হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় টেস্টেই সেই বিশ্বাসের প্রতিদান দিলেন তানজিদ।

ডারউইনের মারারা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করেছেন বাংলাদেশের এই ওপেনার। ১৯৭ বলে ৮টি চার ও একটি ছক্কায় ১০১ রানের ইনিংস খেলে গড়েছেন ইতিহাস। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে সেঞ্চুরি করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার এখন তানজিদ হাসান তামিম।

চলতি বছর মে মাসে সিলেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল তানজিদের। সেই ম্যাচে অবশ্য বলার মতো কিছু করতে পারেননি তিনি। প্রথম ইনিংসে ২৬ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে করেছিলেন মাত্র ৪ রান। এরপর অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রস্তুতি ম্যাচেও ব্যর্থতা ছিল সঙ্গী। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে দুই ইনিংসে তার সংগ্রহ ছিল শূন্য ও ২২ রান।

এমন পারফরম্যান্সের পর অস্ট্রেলিয়ার মূল একাদশে তানজিদকে রাখা হবে কি না, সেটি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ছিল। সাদমান ইসলাম ছিলেন সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের কারণে এগিয়ে। অভিজ্ঞ সৌম্য সরকারও ছিলেন বিবেচনায়। ১৬ টেস্ট খেলা সৌম্যর সর্বোচ্চ ইনিংস ১৪৯ রান, সেটিও এসেছিল নিউজিল্যান্ডের কঠিন কন্ডিশনে। অভিজ্ঞতা ও প্রতিকূল পরিবেশে বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্যের কারণে সৌম্যও ছিলেন শক্ত দাবিদার।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিম ম্যানেজমেন্ট আস্থা রাখে তানজিদের ওপর। আর সেই আস্থার জবাব তিনি দিয়েছেন ব্যাট দিয়েই।

অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের সামনে তানজিদের ব্যাটিংয়ে ছিল অসাধারণ পরিণতিবোধ। মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজেলউডদের মতো বিশ্বমানের বোলারদের বিপক্ষে তাকে একবারও অস্বস্তিতে পড়তে দেখা যায়নি। বরং মাঠের চারদিকে সাবলীল স্ট্রোক খেলেছেন তিনি। সবচেয়ে বড় বিষয়, ঝুঁকিপূর্ণ শটের বদলে পরিস্থিতি বুঝে খেলেছেন, রান নিয়েছেন সিঙ্গেল-ডাবলসে এবং ধৈর্য ধরে ইনিংসকে এগিয়ে নিয়েছেন।

দ্বিতীয় দিনের শুরুতে ৩২ রানে অপরাজিত ছিলেন তানজিদ। সকালের কঠিন সময় পার করে মুমিনুল হকের সঙ্গে ১৮৯ বলে ১০২ রানের জুটি গড়েন তিনি। পরে নাজমুল হোসেন শান্তকে সঙ্গে নিয়ে যোগ করেন আরও ৯৩ রান। এই জুটির মাঝেই ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তানজিদ।

নব্বইয়ের ঘরে গিয়েও কোনো অযথা ঝুঁকি নেননি তিনি। বড় শট খেলার পরিবর্তে সিঙ্গেল-ডাবলস নিয়ে ধীরে ধীরে তিন অঙ্কে পৌঁছান। মাত্র দ্বিতীয় টেস্টে এমন নিয়ন্ত্রিত ব্যাটিং তার পরিণত মানসিকতারই প্রমাণ দিয়েছে।

তানজিদের সেঞ্চুরিটি আরও বিশেষ হয়ে উঠেছে প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণের কারণে। সেঞ্চুরি করার পথে তিনি যেসব অস্ট্রেলিয়ান বোলারের মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের সম্মিলিত টেস্ট অভিজ্ঞতা ৪৩৯ ম্যাচ। মিচেল স্টার্ক খেলেছেন ১০৫ টেস্ট, নাথান লিয়ন ১৪১, জশ হ্যাজেলউড ৭৬, প্যাট কামিন্স ৭২, ক্যামেরন গ্রিন ৩৭ এবং বিউ ওয়েবস্টার ৮টি টেস্ট।

এই সেঞ্চুরির মাধ্যমে ব্যক্তিগত মাইলফলকের পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্রিকেটেও নতুন অধ্যায় লিখেছেন তানজিদ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান তিনি। একই সঙ্গে ডারউইনের মারারা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে কোনো ব্যাটারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইনিংসও এটি।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে বাংলাদেশও এখন দারুণ অবস্থানে। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের ১৯৮ রানের জবাবে দ্বিতীয় দিনের চা-বিরতিতে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ৩ উইকেটে ২৮৬ রান। লিড দাঁড়ায় ৮৮ রানে। দিনের শুরুতে ১ উইকেটে ৯৬ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশ প্রথম সেশনে যোগ করে ৮৫ রান। মুমিনুল হক ৪৯ রানে আউট হন।

এরপর তানজিদের সেঞ্চুরি ও নাজমুল হোসেন শান্তর দৃঢ় ব্যাটিং বাংলাদেশকে বড় লিডের পথে এগিয়ে নেয়। তানজিদ ১০১ রানে ফিরে গেলেও শান্ত ৭৯ রানে অপরাজিত ছিলেন। তার সঙ্গে ক্রিজে ছিলেন মুশফিকুর রহিম, ২৬ রানে অপরাজিত।

হাবিবুল বাশারের সেই ‘বাজি’ তাই আপাতত দারুণভাবেই সফল। যে তানজিদকে অনেকে শুধু সীমিত ওভারের ক্রিকেটের জন্য উপযুক্ত মনে করতেন, সেই তানজিদই দেখিয়ে দিলেন; আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের সঙ্গে ধৈর্য, নিয়ন্ত্রণ ও পরিণতিবোধ যোগ হলে টেস্ট ক্রিকেটেও তা হতে পারে ভয়ংকর কার্যকর।