হাম-ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নগর পরিকল্পনায় ঘাটতি
- সর্বশেষ আপডেট ০৪:০৭:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
- / 144
দেশে হাম ও ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার, ওয়াসা, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনায় জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে ভূমি ব্যবহার, ড্রেনেজ, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর পরিকল্পনা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পরিকল্পনাবিদরা।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘হাম ও ডেঙ্গু: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নগর পরিকল্পনার ভূমিকা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। বিআইপি এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম।
মূল প্রবন্ধে ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের শহরগুলোতে ডেঙ্গু, হাম, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, নগর তাপদাহ ও অনিরাপদ পানির মতো জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে। এসব সংকট মোকাবিলায় শুধু চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভর করলে হবে না; নগরের অবকাঠামো, পরিবেশ ও ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনাকেও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, রাস্তা, ড্রেনেজ, জলাশয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আবাসনের ঘনত্ব, খোলা জায়গা ও ভূমি ব্যবহারের ধরন মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসা ও মশক নিধনের পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল কমাতে হবে। নির্মাণাধীন ভবন, বেজমেন্ট ও লিফটের গর্তসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তাই ভবন নির্মাণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় পানি জমা প্রতিরোধ এবং নির্মাণস্থলে নিয়মিত লার্ভা পরিদর্শনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
হাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টিকা কভারেজের ঘাটতি এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। তাই জনঘনত্ব, শিশুদের সংখ্যা, টিকা কভারেজ ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ টিকাদান কার্যক্রমের স্থান নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, চলতি বছরে দেশে হাম ও ডেঙ্গুর পরিস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি নগর পরিকল্পনাবিদদেরও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নগর পরিকল্পনা কীভাবে মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত, তা তুলে ধরতেই এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নগরায়ন, জনঘনত্ব ও দারিদ্র্য বেশি এমন এলাকায় হাম ও ডেঙ্গুর ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। তাই শহরের জনঘনত্ব ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পিতভাবে পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত মূল্যায়নের পাশাপাশি হেলথ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (এইচআইএ) যুক্ত করা হলে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি আগেই চিহ্নিত করা সম্ভব।
জিআইএস, ড্রোন ও ম্যাপিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট এলাকায় পানি বা বর্জ্য জমে থাকা এবং মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব বলেও জানান তিনি। তাঁর মতে, জনস্বাস্থ্যকে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় হিসেবে না দেখে স্থানীয় সরকার ও নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ওয়াসার পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পানি সরবরাহ লাইনের পূর্ণাঙ্গ ম্যাপিং, লাইনের বয়স এবং পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন লাইনের মধ্যে সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত সংযোগের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ রাখা জরুরি। এসব তথ্য জিআইএসভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করা গেলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
বিআইপির সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, জনস্বাস্থ্যকে শুধু মানুষের অসুস্থতার বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না; মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণায় পরিকল্পনা করতে হবে। পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ায় বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
তিনি নিরাপদ পানির উৎস সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, শিল্পবর্জ্যের কারণে মেঘনাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর দূষণ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে নিরাপদ পানির সংকট তৈরি হতে পারে। নদী ও পানির উৎস রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে বিআইপি সরকারকে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও পেশাগত সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
বিআইপির কোষাধ্যক্ষ পরিকল্পনাবিদ আবু ছালেহ মো. শহীদুল্লাহ বলেন, স্থানভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান কার্যক্রমের স্থান নির্বাচন এবং হাসপাতাল ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয় স্থান নির্ধারণ করা সম্ভব। ভবিষ্যতে কোনো মহামারি দেখা দিলে কোথায় আইসোলেশন বা জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন হবে, তাও আগাম পরিকল্পনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা যেতে পারে।
সংগঠনের বোর্ড সদস্য সাদী মো. হারুন বলেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনগণের সচেতনতা ও অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বপরিকল্পনার মাধ্যমে বিভিন্ন ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জনগণকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীলভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির পক্ষ থেকে ভূমি ব্যবহার ও জোনিংয়ের মাধ্যমে জলাশয় ও বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল সংরক্ষণ, বড় প্রকল্পে স্বাস্থ্য প্রভাব মূল্যায়ন, ড্রেনেজ-পানি-স্যানিটেশন ব্যবস্থার সমন্বয়, জিআইএসভিত্তিক ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং নিম্ন আয়ের ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদান সুবিধা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এ ছাড়া পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিয়মিত মনিটরিং ও জবাবদিহি, ফুটপাত ও পার্কসহ সবুজ-নীল অবকাঠামো সম্প্রসারণ, নির্মাণস্থলে পানি জমা প্রতিরোধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থানভিত্তিক টিকাদান কর্মসূচি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার তথ্য সমন্বিত করে জিআইএসভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির অন্যান্য সদস্য ও পরিকল্পনাবিদরা উপস্থিত ছিলেন।





























