ঢাকা ০৪:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাঁধের সুরক্ষা ছাড়া অনিশ্চিত উপকূলের ভবিষ্যৎ

তারিক লিটু
  • সর্বশেষ আপডেট ০৭:৩৭:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
  • / 172

তারিক লিটু

সুন্দরবন উপকূলের মানুষের জীবন যেন নদী আর বাঁধের সঙ্গে বাঁধা। নদী তাঁদের জীবিকার উৎস, আবার সেই নদীই কখনো কেড়ে নেয় তাঁদের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকু। বছরের পর বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষকে নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। একটু ভালোভাবে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে তাঁরা ঘর বাঁধেন, জমিতে ফসল ফলান, মাছ চাষ করেন। কিন্তু একটি বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তেই সব স্বপ্ন পানিতে ভেসে যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, আর কত দিন এভাবে চলবে? আর কতবার বাঁধ ভাঙার পর মানুষকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম করতে হবে?

খুলনার কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপ, সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি এবং বাগেরহাটের সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন উপজেলার মানুষের কাছে টেকসই বেড়িবাঁধের দাবি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা এই দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের কথা খুবই সহজ; আমরা বারবার ত্রাণ চাই না, বারবার বাঁধ মেরামতের নামে সরকারি অর্থ ব্যয়ও দেখতে চাই না। আমরা এমন একটি বাঁধ চাই, যা আমাদের ঘরবাড়ি, জমিজমা ও জীবিকা রক্ষা করবে। দুর্যোগের সময় পরিবার নিয়ে নিরাপদে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দেবে।

এই দাবির পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, অসংখ্য মানুষের কান্না আর হারিয়ে যাওয়া জনপদের গল্প।

দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের অধিকাংশ বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল ষাটের দশকে। তখনকার বাস্তবতা আর বর্তমান বাস্তবতা এক নয়। সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যা বেড়েছে, নদীর গতিপথ বদলেছে, কোথাও পলি জমে নাব্যতা কমেছে, কোথাও নদীভাঙন তীব্র হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি। অথচ অনেক জায়গায় পুরোনো বাঁধের স্থায়ী ও সমন্বিত উন্নয়নের পরিবর্তে বারবার মেরামতের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন নথিতে বাংলাদেশের উপকূলীয় পোল্ডারব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এই বাঁধব্যবস্থার সঙ্গে দেশের কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে আছে। ফলে উপকূলের বেড়িবাঁধকে শুধু মাটির একটি অবকাঠামো হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে মানুষের বেঁচে থাকা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন জড়িত।

আমরা যদি গত দুই দশকের বড় ঘূর্ণিঝড়গুলোর দিকে তাকাই, তাহলে উপকূলের ঝুঁকির বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৯ সালের আইলা, ২০২০ সালের আম্পান কিংবা ২০২১ সালের ইয়াসের সময় দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষ ব্যাপক দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন। কোথাও বাঁধ ভেঙেছে, কোথাও জলোচ্ছ্বাসের পানি উপচে লোকালয়ে ঢুকেছে, আবার কোথাও বাঁধের ভেতরে পানি জমে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে আইলার ক্ষত কয়রা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগরের অনেক মানুষের মনে এখনো গভীরভাবে রয়ে গেছে। আইলার পর উপকূলের বহু এলাকা দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানিতে ডুবে ছিল। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অনেক পরিবারকে দিনের পর দিন সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। কেউ বেড়িবাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গেছেন, আবার কেউ বাধ্য হয়ে নিজের এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার দুর্যোগসংক্রান্ত তথ্যেও সিডর ও আইলার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে। ২০০৯ সালের আইলায় প্রায় ৩৯ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এই সংখ্যা শুধু একটি দুর্যোগের ভয়াবহতা বোঝায় না; এটি উপকূলীয় মানুষের অনিশ্চিত জীবনযাত্রার কথাও মনে করিয়ে দেয়।

আইলার এত বছর পরও উপকূলের মানুষের কাছে বেড়িবাঁধ একটি বড় উদ্বেগের নাম। কোথাও বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়লে মানুষকে আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়। নদীতে পানি বাড়লে কিংবা অমাবস্যা-পূর্ণিমার প্রবল জোয়ার এলে তাঁদের চোখ থাকে বাঁধের দিকে। কখন কোথায় ভাঙন দেখা দেবে, কখন লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়বে, কখন আবার ঘরবাড়ি ছেড়ে বের হতে হবে; এই দুশ্চিন্তা তাঁদের নিত্যদিনের সঙ্গী।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বছরেও কেন উপকূলের মানুষের এই অনিশ্চয়তা কাটল না? সরকার বিভিন্ন সময়ে উপকূলীয় বাঁধ সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য প্রকল্প নিয়েছে। কয়রার পোল্ডার ১৪/১-এর বাঁধ উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের জন্যও বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রকল্প নেওয়া আর বাস্তবে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা এক বিষয় নয়। প্রকল্পের কাজ কতটা মানসম্মত হচ্ছে, নির্ধারিত নকশা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না এবং কাজ শেষ হওয়ার পর বাঁধ কত দিন কার্যকর থাকছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কয়রার বেড়িবাঁধের কাজ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে অনিয়ম, নির্মাণের মান এবং কাজের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও বিভিন্ন কাজের মান নিয়ে অভিযোগ করেছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা জরুরি। কারণ, বাঁধ নির্মাণে সামান্য অবহেলাও একটি এলাকার হাজার হাজার মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

একটি বাঁধ নির্মাণে সরকারি অর্থ ব্যয় হলো, কাজ শেষ হয়েছে বলে কাগজে-কলমে দেখানো হলো, কিন্তু কয়েক মাস পরই সেই বাঁধের অংশবিশেষ দেবে গেল কিংবা ভেঙে পড়ল; এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। উপকূলের মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে দায়িত্বহীনতা কিংবা অনিয়মের কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়।

এখানে সরকারের পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ড, প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকল্পের নকশা, ব্যয়, কাজের অগ্রগতি ও নির্মাণসামগ্রীর মান সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হবে। স্বাধীনভাবে কাজের মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। কোথাও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, বাঁধের কাজের মান খারাপ হলে তার ক্ষতি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হয় না; তার মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা, নদীভাঙন এবং লবণাক্ততার বিস্তার উপকূলের মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। একই সঙ্গে নদীতে পলি জমে নাব্যতা কমে গেলে পানি প্রবাহ ও নিষ্কাশনের সমস্যা তৈরি হয়। এসব কারণে উপকূলের বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা এখন আর ষাটের দশকের চিন্তাভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই।

টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য বর্তমান ও ভবিষ্যতের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার ভিত্তিতে পরিকল্পনা করতে হবে। কোথায় কত উঁচু বাঁধ প্রয়োজন, কোথায় নদীতীর সংরক্ষণ করতে হবে, কোথায় জোয়ারের পানির চাপ বেশি, কোথায় বাঁধের ঢাল শক্তিশালী করা জরুরি; এসব বিষয় বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি স্লুইসগেট, খাল ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। কারণ, শুধু বাঁধ উঁচু করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকলে বাঁধের ভেতরেও জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। ফলে বাঁধ, নদী ও পানি ব্যবস্থাপনাকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

এই সংকটের আরেকটি দিক হলো মানুষের বাস্তুচ্যুতি। উপকূলের মানুষ কেন নিজেদের জন্মভূমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন, তা আমাদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। নদীভাঙনে জমি হারানো, লবণাক্ত পানিতে ফসল নষ্ট হওয়া, মাছের ঘের ভেসে যাওয়া কিংবা বারবার ঘরবাড়ি মেরামত করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ার কারণে অনেক পরিবার বিকল্প জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন।

কয়রা ও আশপাশের এলাকার অনেক মানুষকে জীবিকার প্রয়োজনে খুলনা, যশোর, ঢাকা এবং দেশের অন্যান্য স্থানে যেতে দেখা যায়। তাঁদের কেউ দিনমজুরি করেন, কেউ ছোট ব্যবসা করেন, কেউ পরিবহন খাতে কাজ করেন। অনেকে শহরের প্রান্তিক এলাকায় বসবাস শুরু করেন। অবশ্য এই স্থানান্তরের পেছনে শুধু বেড়িবাঁধের দুর্বলতা নয়, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য আর্থসামাজিক কারণও রয়েছে। তবে বারবার দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং জীবিকার অনিশ্চয়তা মানুষকে এলাকা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে।

একজন মানুষের কাছে নিজের বসতভিটা শুধু কয়েক শতক জমি নয়। সেখানে তাঁর শৈশবের স্মৃতি, পরিবারের ইতিহাস, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা জীবন জড়িয়ে থাকে। সেই ভিটা যখন নদীগর্ভে হারিয়ে যায়, তখন শুধু একটি বাড়ি হারায় না; হারিয়ে যায় মানুষের পরিচিত পৃথিবীও।

কয়রার হরিণখোলা এলাকার মতো নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত জনপদের অভিজ্ঞতা আমাদের সেই বাস্তবতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। কোনো জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে সেখানকার মানুষের জন্য শুধু নতুন ঘর নির্মাণ করাই যথেষ্ট নয়। তাঁদের নতুন করে জীবিকা গড়তে হয়, সন্তানদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করতে হয় এবং নতুন পরিবেশে বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুরু করতে হয়। তাই নদীভাঙন প্রতিরোধ ও টেকসই বাঁধ নির্মাণকে মানুষের জীবন ও বসতি রক্ষার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

সুন্দরবন উপকূলের নিরাপত্তার সঙ্গে সুন্দরবনের অস্তিত্বও জড়িয়ে আছে। সুন্দরবন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের অভিঘাত কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বন থাকলেই সব দুর্যোগ থেকে জনপদ রক্ষা পাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মানুষের বসতি রক্ষায় কার্যকর বাঁধ, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কবার্তা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিও প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাঁধ নির্মাণের সময় সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। এমন কোনো প্রকল্প নেওয়া উচিত নয়, যা এক এলাকার সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে অন্য এলাকায় ভাঙন কিংবা পরিবেশগত সংকট বাড়িয়ে দেয়।

আমার কাছে মনে হয়, উপকূলের উন্নয়ন নিয়ে এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। প্রতিবছর কোথাও বাঁধ ভাঙবে, কোথাও মাটি ফেলে সাময়িকভাবে মেরামত করা হবে, তারপর আবার দুর্যোগ এলে একই জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হবে; এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। কাজের মান নিশ্চিত করতে হবে এবং বাঁধ নির্মাণের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। শুধু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যেতে পারে না।

এ ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কোন জায়গায় জোয়ারের পানি বেশি চাপ সৃষ্টি করে, কোথায় নদীভাঙন তীব্র, কোন অংশে বারবার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়; এসব বিষয়ে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁদের মতামত নিয়ে পরিকল্পনা করলে প্রকল্পের কার্যকারিতা বাড়বে। পাশাপাশি বাঁধের দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানানোর এবং জরুরি মেরামতের কার্যকর ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, উপকূলের মানুষকে তাঁদের জন্মভূমিতে টিকিয়ে রাখতে হলে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি কিংবা আর্থিক সহায়তা দিয়ে তাঁদের দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান হবে না। ঘরবাড়ি, জমিজমা ও জীবিকা রক্ষার নিশ্চয়তা না থাকলে মানুষ একসময় বাধ্য হয়েই অন্যত্র চলে যাবেন।

সরকারের কাছে তাই সুন্দরবন উপকূলের মানুষের দাবি স্পষ্ট হওয়া উচিত; কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, শ্যামনগর, আশাশুনি ও বাগেরহাটের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পরিকল্পিত ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। প্রকল্পের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নির্মাণকাজের মান নিয়ে কোনো আপস করা যাবে না। একই সঙ্গে নদী ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হবে।

উপকূলের মানুষ বারবার দুর্যোগের পর ত্রাণ নিতে চান না; তাঁরা চান এমন একটি নিরাপদ জীবন, যেখানে প্রতিটি জোয়ার তাঁদের আতঙ্কিত করবে না, প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস তাঁদের ঘরবাড়ি হারানোর আশঙ্কায় ফেলবে না। তাঁরা চান, নিজের জমিতে ফসল ফলাতে, সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে এবং নিশ্চিন্তে নিজের ঘরে ঘুমাতে।

সুন্দরবন উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ তাই কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজন। এই বাঁধ শুধু নদীর পানি ঠেকাবে না; রক্ষা করবে জনপদ, কৃষি, জীবিকা ও মানুষের ভবিষ্যৎ। আর এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এর মূল্য দিতে হবে উপকূলের মানুষকে; নিজের ভিটেমাটি হারিয়ে, জীবিকা হারিয়ে, একসময় হয়তো জন্মভূমি ছেড়ে চলে গিয়ে।

উপকূলের মানুষ তাঁদের জন্মস্থানে থাকতে চান। তাঁদের সেই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাই সময় এসেছে সাময়িক মেরামতের চিন্তা থেকে বেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক পরিকল্পনার মাধ্যমে সুন্দরবন উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের। কারণ, একটি জনপদকে বাঁচাতে হলে আগে তার মানুষের নিরাপদে বেঁচে থাকার ভিত্তি নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: সংবাদকর্মী ও প্রধান সমন্বয়ক, সুন্দরবন ইকো-রিজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভ

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

বাঁধের সুরক্ষা ছাড়া অনিশ্চিত উপকূলের ভবিষ্যৎ

সর্বশেষ আপডেট ০৭:৩৭:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

সুন্দরবন উপকূলের মানুষের জীবন যেন নদী আর বাঁধের সঙ্গে বাঁধা। নদী তাঁদের জীবিকার উৎস, আবার সেই নদীই কখনো কেড়ে নেয় তাঁদের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকু। বছরের পর বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষকে নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। একটু ভালোভাবে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে তাঁরা ঘর বাঁধেন, জমিতে ফসল ফলান, মাছ চাষ করেন। কিন্তু একটি বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তেই সব স্বপ্ন পানিতে ভেসে যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, আর কত দিন এভাবে চলবে? আর কতবার বাঁধ ভাঙার পর মানুষকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম করতে হবে?

খুলনার কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপ, সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি এবং বাগেরহাটের সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন উপজেলার মানুষের কাছে টেকসই বেড়িবাঁধের দাবি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা এই দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের কথা খুবই সহজ; আমরা বারবার ত্রাণ চাই না, বারবার বাঁধ মেরামতের নামে সরকারি অর্থ ব্যয়ও দেখতে চাই না। আমরা এমন একটি বাঁধ চাই, যা আমাদের ঘরবাড়ি, জমিজমা ও জীবিকা রক্ষা করবে। দুর্যোগের সময় পরিবার নিয়ে নিরাপদে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দেবে।

এই দাবির পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, অসংখ্য মানুষের কান্না আর হারিয়ে যাওয়া জনপদের গল্প।

দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের অধিকাংশ বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল ষাটের দশকে। তখনকার বাস্তবতা আর বর্তমান বাস্তবতা এক নয়। সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যা বেড়েছে, নদীর গতিপথ বদলেছে, কোথাও পলি জমে নাব্যতা কমেছে, কোথাও নদীভাঙন তীব্র হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি। অথচ অনেক জায়গায় পুরোনো বাঁধের স্থায়ী ও সমন্বিত উন্নয়নের পরিবর্তে বারবার মেরামতের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন নথিতে বাংলাদেশের উপকূলীয় পোল্ডারব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এই বাঁধব্যবস্থার সঙ্গে দেশের কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে আছে। ফলে উপকূলের বেড়িবাঁধকে শুধু মাটির একটি অবকাঠামো হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে মানুষের বেঁচে থাকা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন জড়িত।

আমরা যদি গত দুই দশকের বড় ঘূর্ণিঝড়গুলোর দিকে তাকাই, তাহলে উপকূলের ঝুঁকির বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৯ সালের আইলা, ২০২০ সালের আম্পান কিংবা ২০২১ সালের ইয়াসের সময় দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষ ব্যাপক দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন। কোথাও বাঁধ ভেঙেছে, কোথাও জলোচ্ছ্বাসের পানি উপচে লোকালয়ে ঢুকেছে, আবার কোথাও বাঁধের ভেতরে পানি জমে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে আইলার ক্ষত কয়রা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগরের অনেক মানুষের মনে এখনো গভীরভাবে রয়ে গেছে। আইলার পর উপকূলের বহু এলাকা দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানিতে ডুবে ছিল। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অনেক পরিবারকে দিনের পর দিন সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। কেউ বেড়িবাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গেছেন, আবার কেউ বাধ্য হয়ে নিজের এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার দুর্যোগসংক্রান্ত তথ্যেও সিডর ও আইলার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে। ২০০৯ সালের আইলায় প্রায় ৩৯ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এই সংখ্যা শুধু একটি দুর্যোগের ভয়াবহতা বোঝায় না; এটি উপকূলীয় মানুষের অনিশ্চিত জীবনযাত্রার কথাও মনে করিয়ে দেয়।

আইলার এত বছর পরও উপকূলের মানুষের কাছে বেড়িবাঁধ একটি বড় উদ্বেগের নাম। কোথাও বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়লে মানুষকে আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়। নদীতে পানি বাড়লে কিংবা অমাবস্যা-পূর্ণিমার প্রবল জোয়ার এলে তাঁদের চোখ থাকে বাঁধের দিকে। কখন কোথায় ভাঙন দেখা দেবে, কখন লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়বে, কখন আবার ঘরবাড়ি ছেড়ে বের হতে হবে; এই দুশ্চিন্তা তাঁদের নিত্যদিনের সঙ্গী।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বছরেও কেন উপকূলের মানুষের এই অনিশ্চয়তা কাটল না? সরকার বিভিন্ন সময়ে উপকূলীয় বাঁধ সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য প্রকল্প নিয়েছে। কয়রার পোল্ডার ১৪/১-এর বাঁধ উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের জন্যও বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রকল্প নেওয়া আর বাস্তবে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা এক বিষয় নয়। প্রকল্পের কাজ কতটা মানসম্মত হচ্ছে, নির্ধারিত নকশা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না এবং কাজ শেষ হওয়ার পর বাঁধ কত দিন কার্যকর থাকছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কয়রার বেড়িবাঁধের কাজ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে অনিয়ম, নির্মাণের মান এবং কাজের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও বিভিন্ন কাজের মান নিয়ে অভিযোগ করেছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা জরুরি। কারণ, বাঁধ নির্মাণে সামান্য অবহেলাও একটি এলাকার হাজার হাজার মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

একটি বাঁধ নির্মাণে সরকারি অর্থ ব্যয় হলো, কাজ শেষ হয়েছে বলে কাগজে-কলমে দেখানো হলো, কিন্তু কয়েক মাস পরই সেই বাঁধের অংশবিশেষ দেবে গেল কিংবা ভেঙে পড়ল; এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। উপকূলের মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে দায়িত্বহীনতা কিংবা অনিয়মের কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়।

এখানে সরকারের পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ড, প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকল্পের নকশা, ব্যয়, কাজের অগ্রগতি ও নির্মাণসামগ্রীর মান সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হবে। স্বাধীনভাবে কাজের মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। কোথাও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, বাঁধের কাজের মান খারাপ হলে তার ক্ষতি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হয় না; তার মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা, নদীভাঙন এবং লবণাক্ততার বিস্তার উপকূলের মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। একই সঙ্গে নদীতে পলি জমে নাব্যতা কমে গেলে পানি প্রবাহ ও নিষ্কাশনের সমস্যা তৈরি হয়। এসব কারণে উপকূলের বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা এখন আর ষাটের দশকের চিন্তাভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই।

টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য বর্তমান ও ভবিষ্যতের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার ভিত্তিতে পরিকল্পনা করতে হবে। কোথায় কত উঁচু বাঁধ প্রয়োজন, কোথায় নদীতীর সংরক্ষণ করতে হবে, কোথায় জোয়ারের পানির চাপ বেশি, কোথায় বাঁধের ঢাল শক্তিশালী করা জরুরি; এসব বিষয় বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি স্লুইসগেট, খাল ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। কারণ, শুধু বাঁধ উঁচু করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকলে বাঁধের ভেতরেও জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। ফলে বাঁধ, নদী ও পানি ব্যবস্থাপনাকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

এই সংকটের আরেকটি দিক হলো মানুষের বাস্তুচ্যুতি। উপকূলের মানুষ কেন নিজেদের জন্মভূমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন, তা আমাদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। নদীভাঙনে জমি হারানো, লবণাক্ত পানিতে ফসল নষ্ট হওয়া, মাছের ঘের ভেসে যাওয়া কিংবা বারবার ঘরবাড়ি মেরামত করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ার কারণে অনেক পরিবার বিকল্প জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন।

কয়রা ও আশপাশের এলাকার অনেক মানুষকে জীবিকার প্রয়োজনে খুলনা, যশোর, ঢাকা এবং দেশের অন্যান্য স্থানে যেতে দেখা যায়। তাঁদের কেউ দিনমজুরি করেন, কেউ ছোট ব্যবসা করেন, কেউ পরিবহন খাতে কাজ করেন। অনেকে শহরের প্রান্তিক এলাকায় বসবাস শুরু করেন। অবশ্য এই স্থানান্তরের পেছনে শুধু বেড়িবাঁধের দুর্বলতা নয়, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য আর্থসামাজিক কারণও রয়েছে। তবে বারবার দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং জীবিকার অনিশ্চয়তা মানুষকে এলাকা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে।

একজন মানুষের কাছে নিজের বসতভিটা শুধু কয়েক শতক জমি নয়। সেখানে তাঁর শৈশবের স্মৃতি, পরিবারের ইতিহাস, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা জীবন জড়িয়ে থাকে। সেই ভিটা যখন নদীগর্ভে হারিয়ে যায়, তখন শুধু একটি বাড়ি হারায় না; হারিয়ে যায় মানুষের পরিচিত পৃথিবীও।

কয়রার হরিণখোলা এলাকার মতো নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত জনপদের অভিজ্ঞতা আমাদের সেই বাস্তবতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। কোনো জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে সেখানকার মানুষের জন্য শুধু নতুন ঘর নির্মাণ করাই যথেষ্ট নয়। তাঁদের নতুন করে জীবিকা গড়তে হয়, সন্তানদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করতে হয় এবং নতুন পরিবেশে বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুরু করতে হয়। তাই নদীভাঙন প্রতিরোধ ও টেকসই বাঁধ নির্মাণকে মানুষের জীবন ও বসতি রক্ষার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

সুন্দরবন উপকূলের নিরাপত্তার সঙ্গে সুন্দরবনের অস্তিত্বও জড়িয়ে আছে। সুন্দরবন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের অভিঘাত কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বন থাকলেই সব দুর্যোগ থেকে জনপদ রক্ষা পাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মানুষের বসতি রক্ষায় কার্যকর বাঁধ, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কবার্তা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিও প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাঁধ নির্মাণের সময় সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। এমন কোনো প্রকল্প নেওয়া উচিত নয়, যা এক এলাকার সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে অন্য এলাকায় ভাঙন কিংবা পরিবেশগত সংকট বাড়িয়ে দেয়।

আমার কাছে মনে হয়, উপকূলের উন্নয়ন নিয়ে এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। প্রতিবছর কোথাও বাঁধ ভাঙবে, কোথাও মাটি ফেলে সাময়িকভাবে মেরামত করা হবে, তারপর আবার দুর্যোগ এলে একই জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হবে; এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। কাজের মান নিশ্চিত করতে হবে এবং বাঁধ নির্মাণের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। শুধু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যেতে পারে না।

এ ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কোন জায়গায় জোয়ারের পানি বেশি চাপ সৃষ্টি করে, কোথায় নদীভাঙন তীব্র, কোন অংশে বারবার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়; এসব বিষয়ে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁদের মতামত নিয়ে পরিকল্পনা করলে প্রকল্পের কার্যকারিতা বাড়বে। পাশাপাশি বাঁধের দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানানোর এবং জরুরি মেরামতের কার্যকর ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, উপকূলের মানুষকে তাঁদের জন্মভূমিতে টিকিয়ে রাখতে হলে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি কিংবা আর্থিক সহায়তা দিয়ে তাঁদের দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান হবে না। ঘরবাড়ি, জমিজমা ও জীবিকা রক্ষার নিশ্চয়তা না থাকলে মানুষ একসময় বাধ্য হয়েই অন্যত্র চলে যাবেন।

সরকারের কাছে তাই সুন্দরবন উপকূলের মানুষের দাবি স্পষ্ট হওয়া উচিত; কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, শ্যামনগর, আশাশুনি ও বাগেরহাটের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পরিকল্পিত ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। প্রকল্পের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নির্মাণকাজের মান নিয়ে কোনো আপস করা যাবে না। একই সঙ্গে নদী ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হবে।

উপকূলের মানুষ বারবার দুর্যোগের পর ত্রাণ নিতে চান না; তাঁরা চান এমন একটি নিরাপদ জীবন, যেখানে প্রতিটি জোয়ার তাঁদের আতঙ্কিত করবে না, প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস তাঁদের ঘরবাড়ি হারানোর আশঙ্কায় ফেলবে না। তাঁরা চান, নিজের জমিতে ফসল ফলাতে, সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে এবং নিশ্চিন্তে নিজের ঘরে ঘুমাতে।

সুন্দরবন উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ তাই কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজন। এই বাঁধ শুধু নদীর পানি ঠেকাবে না; রক্ষা করবে জনপদ, কৃষি, জীবিকা ও মানুষের ভবিষ্যৎ। আর এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এর মূল্য দিতে হবে উপকূলের মানুষকে; নিজের ভিটেমাটি হারিয়ে, জীবিকা হারিয়ে, একসময় হয়তো জন্মভূমি ছেড়ে চলে গিয়ে।

উপকূলের মানুষ তাঁদের জন্মস্থানে থাকতে চান। তাঁদের সেই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাই সময় এসেছে সাময়িক মেরামতের চিন্তা থেকে বেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক পরিকল্পনার মাধ্যমে সুন্দরবন উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের। কারণ, একটি জনপদকে বাঁচাতে হলে আগে তার মানুষের নিরাপদে বেঁচে থাকার ভিত্তি নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: সংবাদকর্মী ও প্রধান সমন্বয়ক, সুন্দরবন ইকো-রিজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভ