সুন্দরবন খোলার আগে বাড়ছে বনদস্যুর আতঙ্ক
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:১৩:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
- / 29
টানা তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) খুলছে সুন্দরবন। মাছ ও কাঁকড়া আহরণের আশায় প্রস্তুতি নিচ্ছেন সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার জেলে-বাওয়ালিরা। কেউ নৌকা মেরামত করছেন, কেউ প্রস্তুত করছেন জাল ও মাছ ধরার সরঞ্জাম। একই সঙ্গে সুন্দরবনে পর্যটকবাহী ট্রলার নামানোর প্রস্তুতিও চলছে।
তবে জীবিকার আশায় বনে যাওয়ার প্রস্তুতির মধ্যেই জেলে-বাওয়ালিদের মধ্যে নতুন করে দেখা দিয়েছে বনদস্যু আতঙ্ক। তাদের অভিযোগ, সুন্দরবনের সাতক্ষীরা ও খুলনা রেঞ্জে কয়েকটি দস্যু বাহিনী আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বনে প্রবেশের আগে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তারা।
জেলেদের ভাষ্য, দস্যুদের চাঁদা দেওয়ার পর তাদের একটি ৫ টাকার নোট দেওয়া হয়। ওই নোটের সিরিয়াল নম্বর নদীপথে চলাচলের এক ধরনের ‘কোড’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নির্দিষ্ট নম্বরের নোট না থাকলে নদীতে নৌকা থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, মারধর এমনকি অপহরণ করা হয় বলেও অভিযোগ তাদের।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর প্রজনন মৌসুম বিবেচনায় প্রতিবছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশ ও মাছ শিকার বন্ধ থাকে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে বৈধ পাস ও অনুমতি নিয়ে জেলে-বাওয়ালি এবং পর্যটকবাহী নৌযান সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারবে।
তবে নিষেধাজ্ঞার তিন মাস সুন্দরবননির্ভর পরিবারগুলোর জন্য কঠিন সময় পার করতে হয়। মাছ ও কাঁকড়া আহরণ বন্ধ থাকায় অনেক পরিবার ধারদেনা করে সংসার চালিয়েছে। এখন বনে গিয়ে আয় করার আশায় অনেকে আবার ঋণ করে নৌকা, জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম মেরামত করছেন।
শ্যামনগরের দাতিনখালি এলাকার জেলে জাহাঙ্গীর সানা বলেন, তিন মাস মাছ ও কাঁকড়া ধরা বন্ধ থাকায় তাদের কষ্টে দিন কাটাতে হয়েছে। সংসারের খরচ মেটাতে অনেকে সুদে টাকা নিয়েছেন। এখন বনে গিয়ে মাছ-কাঁকড়া ধরে ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি সংসার চালানোর আশা করছেন।
তবে বনদস্যুদের চাঁদার কারণে সেই আয় নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন তিনি। জাহাঙ্গীরের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সুন্দরবনে কয়েকটি দস্যু দল আবার সক্রিয় হয়েছে বলে তারা শুনছেন। মাছ-কাঁকড়া ধরে যে অর্থ আয় হবে, তা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করবেন, নাকি দস্যুদের চাঁদা দেবেন; এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।
বুড়িগোয়ালিনী এলাকার জেলে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তিন মাস সংসার চালাতে গিয়ে তার প্রায় ৫০ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে। সুন্দরবন খুললে মাছ ধরে সেই ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু দস্যুদের চাঁদা দিতে হলে সেই আয় দিয়ে ঋণ শোধ করা কঠিন হয়ে যাবে।
একাধিক জেলের দাবি, বর্তমানে সুন্দরবনে আলিফ ওরফে দয়াল বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, ডন বাহিনী, বড় জাহাঙ্গীর ও কাজলমুন্না বাহিনী নামে পাঁচটি দস্যু দল সক্রিয় রয়েছে। তবে জেলেদের এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পর্যটন ব্যবসায়ও প্রভাব
তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক প্রবেশ বন্ধ থাকায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘ সময় পর্যটকবাহী ট্রলার অলস পড়ে থাকায় অনেক ট্রলারের বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়েছে। এখন মৌসুম শুরু হলেও আগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মুন্সীগঞ্জ এলাকার পর্যটকবাহী ট্রলার মালিক নূর ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ট্রলার বসে থাকায় বিভিন্ন অংশ মেরামত করতে হয়েছে। এ জন্য ঋণও নিতে হয়েছে। সুন্দরবন খুললেও শুরুতেই আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ ও সংসারের খরচ চালানো কঠিন হবে।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও অবৈধ শিকারের অভিযোগ
এদিকে সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন অভয়ারণ্য এলাকায় অবৈধভাবে মাছ ও বন্য প্রাণী শিকারের অভিযোগও রয়েছে। বনজীবীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, অসাধু জেলেদের একটি অংশ বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার এবং ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করছে।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা ইরফান হোসেন বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবছর তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে বৈধ পাস নিয়ে জেলে-বাওয়ালি ও পর্যটকবাহী নৌযান বনে প্রবেশ করতে পারবে।
বনদস্যুদের বিষয়ে তিনি বলেন, বন বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত টহল ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। নতুন মৌসুমে সুন্দরবনে প্রবেশকারীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।



















