মালদ্বীপে গিয়ে প্রতারণার শিকার ৩০ কর্মী
- সর্বশেষ আপডেট ১২:৩৪:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
- / 10
মালদ্বীপে চাকরির আশ্বাস দিয়ে বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর পর প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে ‘ড্রিম ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল এজেন্সি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মাত্র তিন মাসের ভিসা দিয়ে তাদের মালদ্বীপে পাঠানো হলেও সেখানে যাওয়ার পর আট মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও তারা প্রতিশ্রুত চাকরি ও কোম্পানির ভিসা পাননি। ফলে অনেকে দেশটিতে অনিবন্ধিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
ভারত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপের অর্থনীতি মূলত পর্যটননির্ভর। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ ৩১ হাজার। শ্রমবাজারের বড় একটি অংশ বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে দুই লাখের বেশি বিদেশি শ্রমিক রয়েছেন, যাদের উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশি। তবে তাদের একটি অংশ অবৈধ বা অনিবন্ধিতভাবে বসবাস করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
করোনা মহামারি এবং পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতের প্রভাবে মালদ্বীপে বিদেশি কর্মীর চাহিদা কমে গেলেও বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, রিক্রুটিং এজেন্সির বৈধ লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও ড্রিম ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল এজেন্সি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের রিক্রুটিং লাইসেন্স (আরএল) ব্যবহার করে ২০২৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে প্রায় ৩০ জন কর্মীকে মালদ্বীপে পাঠায়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, মালদ্বীপে যাওয়ার সময় তাদের সরাসরি কোম্পানির ভিসা, নির্দিষ্ট কর্মস্থলে চাকরি এবং মাসিক ৪৫০ মার্কিন ডলার বেতনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেশটিতে পৌঁছানোর পর তারা জানতে পারেন, তাদের ভিসা সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এক ভুক্তভোগী জানান, তাকে সোলমান দ্বীপে কাজ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তিনি কোনো কোম্পানির চাকরি পাননি। বরং তাকে মাত্র তিন মাসের ভিসায় রাখা হয়। পরে সেই ভিসার মেয়াদও বাড়ানো হয়নি। বর্তমানে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় গ্রেপ্তার ও দেশে ফেরত পাঠানোর আশঙ্কায় দিন কাটছে তার।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ না থাকায় তাদের অনেকেই পরিবার ও স্বজনদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মালদ্বীপে জীবনযাপন করছেন। কেউ কেউ পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে নিজ খরচে দেশে ফিরেও এসেছেন।
এক ভুক্তভোগীর স্বজন বলেন, দুই থেকে তিন মাসের ভিসা দেওয়ার কথা জানিয়ে তাদের মালদ্বীপে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর কোনো কাজ দেওয়া হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে নিয়মিত টাকা পাঠাতে হচ্ছে। এতে তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
প্রতারণার অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনেরা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করছেন।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে ড্রিম ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল এজেন্সির কার্যক্রমের বিষয়ে অনুসন্ধান করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে মালদ্বীপে কর্মী পাঠানোর বিভিন্ন আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন প্রচার করতে দেখা যায়। এমনকি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না হলে কর্মীদের দেশে ফিরিয়ে এনে অর্থ ফেরত দেওয়ার দাবিও করা হয়েছে বিজ্ঞাপনে।
তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবিদ আনোয়ার সানা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন। তার দাবি, ভুক্তভোগীদের কয়েকজন তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অভিযোগ করছেন।
আবিদ আনোয়ার সানা বলেন, অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। যারা অভিযোগ করছেন, তারা সাত থেকে আট মাস ধরে মালদ্বীপে অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে তিনি টাকা দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে তার কাছে ভিডিও ও অন্যান্য নথি রয়েছে। পাঁচ-ছয়জন ব্যক্তি মিলে তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত ও ব্ল্যাকমেইল করছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে প্রতিষ্ঠানটির বৈধ লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এতদিন ধরে কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে; এমন প্রশ্নের বিষয়ে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
পরে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো একটি ভয়েস মেসেজে সংবাদ প্রকাশ করা হলে মানহানির মামলা করার হুমকি দেন আবিদ আনোয়ার সানা। তিনি বলেন, সংবাদ প্রকাশের কারণে তার সম্মানহানি হলে তিনি আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বিবেচনা করবেন।
ড্রিম ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল এজেন্সির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, মালদ্বীপে পাঠানো কর্মীদের প্রথমে তিন মাসের ভিসা দেওয়া হলেও পরে তাদের এক বছর মেয়াদি ভিসা দেওয়া হয়েছে। তবে এই দাবির সমর্থনে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো নথি বা প্রমাণ দেখানো হয়নি।
ফলে বিদেশে চাকরির আশায় অর্থ ব্যয় করে যাওয়া এসব কর্মীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। ভুক্তভোগীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হোক।
সূত্র: স্টার নিউজ


































