১৮ দিনের ব্যবধানে তিনটি জাহাজে হামলা
জলদস্যুর দাপটে নতুন সংকটে চট্টগ্রাম বন্দর
- সর্বশেষ আপডেট ০২:১৫:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬
- / 19
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জলদস্যুদের তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মাত্র ১৮ দিনের ব্যবধানে তিনটি জাহাজে হামলা চালিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার মালামাল ও মূল্যবান সরঞ্জাম লুট করেছে দস্যুরা। একের পর এক এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আমদানিকারক, শিপিং অপারেটর ও বন্দর ব্যবহারকারীরা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি।
সাম্প্রতিক দস্যুতার ঘটনায় নতুন করে নিরাপত্তা ও সুনাম সংকটে পড়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণে কাজ করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড।
সবশেষ গত ১৬ জুলাই ভোরে চার্লি অ্যাঙ্করেজে নোঙর করা সিয়েরা লিওনের পতাকাবাহী ট্যাংকার ‘তাই শুয়েন’-এ হামলা চালায় প্রায় ২০ জন সশস্ত্র জলদস্যু। পাঁচটি কাঠের নৌকায় করে এসে তারা জাহাজে ওঠে। জাহাজটি হংকং থেকে সীতাকুণ্ডের জনতা স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য আনা হয়েছিল।
শিপিং এজেন্ট বেন লাইনের মালিক মোশাররফ হোসেন জানান, নোঙর ফেলার সময় একদল দস্যু নাবিকদের ব্যস্ত রাখে, আরেক দল ডেক থেকে নোঙরের দড়ি, ব্যাটারি ও অন্যান্য মূল্যবান সরঞ্জাম লুট করে নিয়ে যায়। জাহাজের ক্যাপ্টেন বন্দর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে রেডিও বার্তা পাঠালেও কোস্টগার্ড ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
এর আগে ২৯ জুন চার্লি অ্যাঙ্করেজে ডায়নামিক শিপ রিসাইক্লিংয়ের আমদানি করা ‘এমভি হাই জু’ জাহাজে ২০ থেকে ২৫ জন সশস্ত্র দস্যু উঠে নাবিকদের জিম্মি করে প্রায় এক কোটি টাকার যন্ত্রাংশ লুট করে। পরদিন যমুনা শিপ ব্রেকার্সের ‘এমটি আইআরওএস’ জাহাজ থেকেও কয়েক কোটি টাকার সরঞ্জাম চুরি হয়। পরে নৌপুলিশ রাজধানীর বাংলাবাজার এলাকা থেকে প্রায় দুই কোটি টাকার চোরাই মালামাল উদ্ধার করে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতিটি ঘটনায় কোস্টগার্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হলেও দ্রুত সহায়তা পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতেও এ অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, লুট হওয়া অধিকাংশ মালামাল এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা রিজিওনাল কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট অন কমবেটিং পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রবারি অ্যাগেইনস্ট শিপস ইন এশিয়া (রিক্যাপ)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে জলদস্যুতা বা চুরির কোনো ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে ধারাবাহিক তিনটি হামলা বন্দরসংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় ৭০ শতাংশ পণ্য বহির্নোঙরে খালাস করা হয়। নাব্য সংকটের কারণে বড় জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে না পারায় প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০টি বড় জাহাজ বহির্নোঙরে অবস্থান করে। এসব জাহাজ থেকে প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ টন পণ্য লাইটার জাহাজে খালাস করা হয়।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়। বহির্নোঙরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে জাতীয় অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি শিপিং কোম্পানিগুলোর ঝুঁকি, বীমা ব্যয় ও বাণিজ্য খরচ বাড়তে পারে। এ কারণেই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নৌপরিবহনমন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক তিনটি ঘটনায় প্রায় ১০ কোটি টাকার সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ লুট হয়েছে। পাশাপাশি জাহাজের নিরাপত্তা এবং নাবিকদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ বার্থ অপারেটর অ্যান্ড শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সরওয়ার হোসেন বলেন, বছরের প্রথম চার মাস কোনো দস্যুতার ঘটনা না ঘটলেও হঠাৎ করে বহির্নোঙরে এ ধরনের হামলা উদ্বেগজনক।
ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, ছোট ছোট নৌকায় করে দলবদ্ধভাবে বড় জাহাজে উঠে দস্যুরা হামলা চালাচ্ছে। এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কোস্টগার্ডকে আরও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড যৌথভাবে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে। সমন্বয় সভায় বহির্নোঙরে টহল ও নজরদারি বাড়ানো, অনুমোদিত ওয়াচম্যান নিয়োগ নিশ্চিত করা, জাহাজ আগমনের তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে সরবরাহ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা জোরদারের মতো একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব রেফায়েত হামীম বলেন, বহির্নোঙরের নিরাপত্তা আরও কঠোর করা হয়েছে। কোস্টগার্ড নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে এবং চুরির ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।


























