জুলাইয়ে বেড়েছে ধর্ষণ-আত্মহত্যা
- সর্বশেষ আপডেট ১২:০৪:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬
- / 4
চলতি বছরের জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে দেশে ধর্ষণ ও আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। যদিও একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট ঘটনা কিছুটা কমেছে। পাশাপাশি মাদক ও অনলাইন জুয়াবিরোধী অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে, তবে মাদক ব্যবসায় পুলিশের সম্পৃক্ততার অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শুক্রবার প্রকাশিত মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) জুলাই মাসের নারী, শিশু, মাদক ও অনলাইন জুয়া-সংক্রান্ত সহিংসতার মাসিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। জাতীয় দৈনিক এবং স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
এমএসএফের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আইনজীবী সুলতানা কামালের স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জুন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট ৩২০টি ঘটনার বিপরীতে জুলাইয়ে এ সংখ্যা কমে ৩০৬-এ নেমেছে। তবে একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনা ৬৮ থেকে বেড়ে ৯০-এ পৌঁছেছে, যা প্রায় ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি। আত্মহত্যার ঘটনা ১৭ থেকে বেড়ে ২৮-এ দাঁড়িয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনাও ২১ থেকে বেড়ে ২২টিতে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে, দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ১৬ থেকে কমে ৭টিতে, ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ৫ থেকে ৩টিতে, শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ৫৬ থেকে ৪২টিতে এবং হত্যার ঘটনা ৭৬ থেকে ৫২টিতে নেমে এসেছে। অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনা ১২ থেকে বেড়ে ১৩টি হয়েছে। এসিড নিক্ষেপের ঘটনা জুন ও জুলাই—উভয় মাসেই একটি করে ঘটেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট ঘটনার সংখ্যা কমলেও সহিংসতার ধরন আরও জটিল ও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ধর্ষণ ও আত্মহত্যার উচ্চহার নারী ও শিশুর নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক চাপ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রতিফলন বলে মনে করছে এমএসএফ।
মাদকবিরোধী অভিযানে জুলাই মাসে আটক বেড়ে ৩৪ থেকে ৯৩ জনে পৌঁছেছে। মাদক-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৪ জন। তবে একই সময়ে মাদক ব্যবসায় পুলিশের সম্পৃক্ততার চারটি নতুন অভিযোগের তথ্যও উঠে এসেছে। এমএসএফের মতে, এটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাসে তিনটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ স্থানীয়ভাবে সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ধর্ষণচেষ্টা এবং একটি ধর্ষণের ঘটনা ছিল। এমএসএফ বলছে, এ ধরনের অপরাধ সালিশে মীমাংসা বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে আরও উৎসাহিত করে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার পতন-পরবর্তী মামলাগুলোতে জুলাই মাসে নতুন করে ৬০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। যদিও গ্রেপ্তারের সংখ্যা কমে ১২৬-এ দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় আহতের সংখ্যা কমলেও নিহতের সংখ্যা সামান্য বেড়ে সাতজনে পৌঁছেছে।
অনলাইন জুয়া-সংক্রান্ত ঘটনায় জুলাই মাসে কোনো নিহত বা আহতের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ১০ জনকে আটক করা হয়েছে, যেখানে জুন মাসে এ ধরনের কোনো আটক হয়নি। এমএসএফের মতে, এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়তি সক্রিয়তার ইঙ্গিত বহন করে।
পরিত্যক্ত নবজাতক উদ্ধারে উদ্বেগ
জুলাই মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১১ নবজাতককে উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে আটজন মৃত এবং তিনজন জীবিত ছিল।
এমএসএফ বলছে, এসব ঘটনায় দায়ীদের শনাক্ত করতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্যকর তদন্ত হয় না। ফলে অপরাধীরা আইনের আওতার বাইরে থেকে যায়। মৃত নবজাতকের ঘটনায় সাধারণত অপমৃত্যুর মামলা করা হয় এবং জীবিত নবজাতকদের সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সংস্থাটির মতে, নবজাতক পরিত্যাগ ও বেআইনি সালিশ—উভয়ই সমাজে দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করছে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা বেড়েছে দ্বিগুণ
জুন মাসের তুলনায় জুলাইয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা দ্বিগুণ হয়েছে বলে জানিয়েছে এমএসএফ। জুলাই মাসে এ ধরনের ৩৬টি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে জুনে ছিল ১৮টি।
একই সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় মামলা ও গ্রেপ্তারের সংখ্যাও বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এমএসএফের ভাষ্য, এসব ঘটনা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য গুরুতর হুমকি।
এদিকে, জুলাই মাসে মব সহিংসতায় ৩১ জন নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন সাতজন। জুন মাসে মব সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ছিল ৩২।




















