ঢাকা ০৮:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নীলফামারীতে আগাম আলুতে নতুন স্বপ্ন কৃষকদের

আরিফুল ইসলাম আরিফ, ​নীলফামারী
  • সর্বশেষ আপডেট ০৮:২৫:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 47

নীলফামারীতে আগাম আলুতে নতুন স্বপ্ন কৃষকদের

আশ্বিনের শুরু। ভোরের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার মাঠে শুরু হয়ে যায় ব্যস্ততা। কোথাও জমি তৈরি হচ্ছে, কোথাও সার ছিটানো, আবার কোথাও সারি সারি করে মাটিতে বোনা হচ্ছে আলুর বীজ। পুরুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করছেন নারী শ্রমিকরাও। মাঠজুড়ে যেন নতুন মৌসুমের ব্যস্ততার পাশাপাশি নতুন স্বপ্নেরও শুরু।

কিশোরগঞ্জকে বলা হয় আগাম আলুর অন্যতম প্রধান এলাকা। ধান কাটার পর জমি ফাঁকা রাখার সুযোগ নেই। সেই জমিতেই দ্রুত আলু রোপণ করে আগেভাগে বাজার ধরার চেষ্টা করেন কৃষকরা। কারণ মৌসুমের শুরুতে বাজারে আলুর দাম তুলনামূলক ভালো থাকে। তাই আগাম আলু তাদের কাছে শুধু একটি ফসল নয়, গত মৌসুমের ক্ষতি পুষিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ানোরও একটি সুযোগ।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জে ৬ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে আগাম আলুর লক্ষ্যমাত্রা ৪ হাজার ১০০ হেক্টর। কম মেয়াদি আউশ ধান কাটার পরই কৃষকরা জমিতে নামিয়েছেন বিনা সেভেন, গ্রানুলা, সানশাইন, কারেজসহ বিভিন্ন জাতের আলু।

তবে এই স্বপ্নের শুরুটা মোটেও সহজ নয়। জমি ভাড়া, বীজ, সার, চাষের খরচ আর শ্রমিকের মজুরি; সব মিলিয়ে আলু মাটিতে দেওয়ার আগেই কৃষকের পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বড় অঙ্কের টাকা। এরপরও চোখ থাকে একটাই দিকে; ফসল উঠলে বাজারে কত দাম পাওয়া যাবে।

বাহাগিলি ইউনিয়নের পশ্চিমপাড়া গ্রামের কৃষক মিনারুল ইসলাম নিজের জমিতে চাষ করতে পারেন না। তাই ৪০ হাজার টাকায় দুই বিঘা জমি চুক্তি নিয়েছেন। বীজ, জৈব ও রাসায়নিক সার, জমি প্রস্তুত এবং শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে তার বিনিয়োগ বাড়ছে প্রতিদিন। তবু পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এই জমিতেই তিনি দেখছেন ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা।

মিনারুলের মতো অনেক কৃষকের হিসাবই এখন আবহাওয়া আর বাজারদরের ওপর নির্ভর করছে। একটু বেশি বৃষ্টি, রোগবালাই কিংবা বাজারে দরপতন—যেকোনো একটি কারণই বদলে দিতে পারে পুরো হিসাব। তারপরও বছরের পর বছর কৃষিকাজে অভ্যস্ত মানুষগুলো ঝুঁকি নিয়েই মাঠে নামেন। কারণ ফসলের সঙ্গে তাদের জীবিকার হিসাবটাও জড়িয়ে থাকে।

রণচণ্ডি ইউনিয়নের কৃষক আব্দুস সাত্তারের অভিজ্ঞতা অবশ্য তাকে কিছুটা আশাবাদী করে তুলেছে। গত মৌসুমে আগাম আলু তুলে শুরুর দিকেই প্রতি কেজি ৯০ টাকা দরে বিক্রি করেছিলেন তিনি। এক বিঘা জমি থেকে প্রায় ৩০ হাজার টাকা লাভও হয়েছিল। সেই স্মৃতি থেকেই এবার ৪০ শতাংশ জমিতে আবার আগাম আলু বুনেছেন তিনি।

উত্তর দুরাকুটি গ্রামের কৃষক শামীম হোসেন বাবুর গল্পটা একটু ভিন্ন। গত দুই বছরে আলু চাষে লোকসান হয়েছে তার। সেই ক্ষতির চাপ এখনো আছে। কিন্তু কৃষকের কাছে মাঠ ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই পুরোনো ক্ষতির হিসাব পাশে রেখে আবারও আলুর জমিতে নেমেছেন তিনি।

শামীম হোসেন বাবু বলেন, গত দুই বছরে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশাই এখন আগাম আলু। আবহাওয়া ভালো থাকলে এবং বাজারে ন্যায্য দাম পাওয়া গেলে এবার ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে আলু রোপণের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে গ্রামীণ জনপদে। বর্তমানে একজন পুরুষ শ্রমিক দৈনিক ৫০০ টাকা এবং নারী শ্রমিক ৩৫০ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন। ফলে কৃষকের মাঠের ব্যস্ততার সঙ্গে ব্যস্ততা বেড়েছে দিনমজুরদেরও।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান আলম জানান, সারাদেশের মধ্যে কিশোরগঞ্জ উপজেলাতেই আগাম আলু চাষ ও উত্তোলন শুরু হয়। মৌসুমের শুরুতেই এখানকার আলু দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে যায়। সে কারণে শুরুর দিকে কৃষকরা তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পান।

মাঠে এখন হাজারো কৃষকের ব্যস্ত হাত। মাটির নিচে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠবে আলুর গাছ, আর তার সঙ্গে বড় হবে কৃষকের প্রত্যাশাও। গত মৌসুমের লোকসানের দাগ মুছে এবার একটু স্বস্তির হাসি ফুটবে—এই আশাতেই কিশোরগঞ্জের মাঠে নতুন করে বোনা হচ্ছে আগাম আলুর বীজ, আর সেই বীজের সঙ্গে বোনা হচ্ছে কৃষকের নতুন স্বপ্ন।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

নীলফামারীতে আগাম আলুতে নতুন স্বপ্ন কৃষকদের

সর্বশেষ আপডেট ০৮:২৫:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আশ্বিনের শুরু। ভোরের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার মাঠে শুরু হয়ে যায় ব্যস্ততা। কোথাও জমি তৈরি হচ্ছে, কোথাও সার ছিটানো, আবার কোথাও সারি সারি করে মাটিতে বোনা হচ্ছে আলুর বীজ। পুরুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করছেন নারী শ্রমিকরাও। মাঠজুড়ে যেন নতুন মৌসুমের ব্যস্ততার পাশাপাশি নতুন স্বপ্নেরও শুরু।

কিশোরগঞ্জকে বলা হয় আগাম আলুর অন্যতম প্রধান এলাকা। ধান কাটার পর জমি ফাঁকা রাখার সুযোগ নেই। সেই জমিতেই দ্রুত আলু রোপণ করে আগেভাগে বাজার ধরার চেষ্টা করেন কৃষকরা। কারণ মৌসুমের শুরুতে বাজারে আলুর দাম তুলনামূলক ভালো থাকে। তাই আগাম আলু তাদের কাছে শুধু একটি ফসল নয়, গত মৌসুমের ক্ষতি পুষিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ানোরও একটি সুযোগ।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জে ৬ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে আগাম আলুর লক্ষ্যমাত্রা ৪ হাজার ১০০ হেক্টর। কম মেয়াদি আউশ ধান কাটার পরই কৃষকরা জমিতে নামিয়েছেন বিনা সেভেন, গ্রানুলা, সানশাইন, কারেজসহ বিভিন্ন জাতের আলু।

তবে এই স্বপ্নের শুরুটা মোটেও সহজ নয়। জমি ভাড়া, বীজ, সার, চাষের খরচ আর শ্রমিকের মজুরি; সব মিলিয়ে আলু মাটিতে দেওয়ার আগেই কৃষকের পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বড় অঙ্কের টাকা। এরপরও চোখ থাকে একটাই দিকে; ফসল উঠলে বাজারে কত দাম পাওয়া যাবে।

বাহাগিলি ইউনিয়নের পশ্চিমপাড়া গ্রামের কৃষক মিনারুল ইসলাম নিজের জমিতে চাষ করতে পারেন না। তাই ৪০ হাজার টাকায় দুই বিঘা জমি চুক্তি নিয়েছেন। বীজ, জৈব ও রাসায়নিক সার, জমি প্রস্তুত এবং শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে তার বিনিয়োগ বাড়ছে প্রতিদিন। তবু পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এই জমিতেই তিনি দেখছেন ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা।

মিনারুলের মতো অনেক কৃষকের হিসাবই এখন আবহাওয়া আর বাজারদরের ওপর নির্ভর করছে। একটু বেশি বৃষ্টি, রোগবালাই কিংবা বাজারে দরপতন—যেকোনো একটি কারণই বদলে দিতে পারে পুরো হিসাব। তারপরও বছরের পর বছর কৃষিকাজে অভ্যস্ত মানুষগুলো ঝুঁকি নিয়েই মাঠে নামেন। কারণ ফসলের সঙ্গে তাদের জীবিকার হিসাবটাও জড়িয়ে থাকে।

রণচণ্ডি ইউনিয়নের কৃষক আব্দুস সাত্তারের অভিজ্ঞতা অবশ্য তাকে কিছুটা আশাবাদী করে তুলেছে। গত মৌসুমে আগাম আলু তুলে শুরুর দিকেই প্রতি কেজি ৯০ টাকা দরে বিক্রি করেছিলেন তিনি। এক বিঘা জমি থেকে প্রায় ৩০ হাজার টাকা লাভও হয়েছিল। সেই স্মৃতি থেকেই এবার ৪০ শতাংশ জমিতে আবার আগাম আলু বুনেছেন তিনি।

উত্তর দুরাকুটি গ্রামের কৃষক শামীম হোসেন বাবুর গল্পটা একটু ভিন্ন। গত দুই বছরে আলু চাষে লোকসান হয়েছে তার। সেই ক্ষতির চাপ এখনো আছে। কিন্তু কৃষকের কাছে মাঠ ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই পুরোনো ক্ষতির হিসাব পাশে রেখে আবারও আলুর জমিতে নেমেছেন তিনি।

শামীম হোসেন বাবু বলেন, গত দুই বছরে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশাই এখন আগাম আলু। আবহাওয়া ভালো থাকলে এবং বাজারে ন্যায্য দাম পাওয়া গেলে এবার ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে আলু রোপণের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে গ্রামীণ জনপদে। বর্তমানে একজন পুরুষ শ্রমিক দৈনিক ৫০০ টাকা এবং নারী শ্রমিক ৩৫০ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন। ফলে কৃষকের মাঠের ব্যস্ততার সঙ্গে ব্যস্ততা বেড়েছে দিনমজুরদেরও।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান আলম জানান, সারাদেশের মধ্যে কিশোরগঞ্জ উপজেলাতেই আগাম আলু চাষ ও উত্তোলন শুরু হয়। মৌসুমের শুরুতেই এখানকার আলু দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে যায়। সে কারণে শুরুর দিকে কৃষকরা তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পান।

মাঠে এখন হাজারো কৃষকের ব্যস্ত হাত। মাটির নিচে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠবে আলুর গাছ, আর তার সঙ্গে বড় হবে কৃষকের প্রত্যাশাও। গত মৌসুমের লোকসানের দাগ মুছে এবার একটু স্বস্তির হাসি ফুটবে—এই আশাতেই কিশোরগঞ্জের মাঠে নতুন করে বোনা হচ্ছে আগাম আলুর বীজ, আর সেই বীজের সঙ্গে বোনা হচ্ছে কৃষকের নতুন স্বপ্ন।