ঢাকা ০৯:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরকারি টাকায় নিজের ‘ভবিষ্যত’ স্টার্টআপের সামির!

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৬:১৫:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
  • / 31

ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ অনুমোদনের পর সেই প্রতিষ্ঠানেই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে যোগ দিয়েছেন স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেডের (এসবিএল) সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামি আহমেদ। বিষয়টি নিয়ে সরকারি অর্থের ব্যবহার, বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে স্টার্টআপ বাংলাদেশ ‘হিসাব টেকনোলজিস লিমিটেড’ (বর্তমানে ‘ভারবেক্স’) নামের একটি প্রতিষ্ঠানে ২ কোটি টাকা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামি আহমেদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন হয় এবং পরে প্রথম ধাপে ১ কোটি টাকা ছাড় করা হয়।

খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত বা বাতিল হলেও হিসাব টেকনোলজিসের অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী তৎপরতা দেখা যায়। একই সময়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যেও ‘স্টার্টআপ সামিট’ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ওই আয়োজনের মাধ্যমে তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের ভাবমূর্তি তুলে ধরাই ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সামি আহমেদকে স্টার্টআপ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে অপসারণ করা হয়। পরে তিনি হিসাব টেকনোলজিসে (বর্তমানে ভারবেক্স) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন।

সামি আহমেদের দুর্নীতি নিয়ে মানববন্ধন।
সামি আহমেদের দুর্নীতি নিয়ে মানববন্ধন।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বিনিয়োগ অনুমোদনের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় যে প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন নিশ্চিত করেছিলেন, পরবর্তীতে সেই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি কোম্পানিটির শেয়ারও অর্জন করেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি স্বার্থের সংঘাতের একটি গুরুতর উদাহরণ হতে পারে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করে হিসাব টেকনোলজিস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান জুবায়ের আহমেদ। পরবর্তীতে কোম্পানিটি নাম পরিবর্তন করে ‘ভারবেক্স’ রাখে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন প্রভাব ও যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থায় কাজের সুযোগ পায়। তবে ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বর্তমানে বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সক্রিয় চুক্তি নেই বলেও খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে, স্টার্টআপ বাংলাদেশের প্রতিশ্রুত ২ কোটি টাকার মধ্যে প্রথম ধাপে ১ কোটি টাকা ছাড় হলেও সরকার পরিবর্তনের পর বাকি অর্থ আর ছাড় করা হয়নি।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থেকে রাষ্ট্রীয় তহবিল বণ্টনে প্রভাব বিস্তার এবং পরে সেই অর্থায়নপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে যোগ দেওয়া স্পষ্টতই ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের সংঘাতের গুরুতর উদাহরণ। এটি শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, বরং সুশাসনের পরিপন্থী এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিরও ইঙ্গিত বহন করে।

তার মতে, রাজনৈতিক প্রভাব বা পূর্বসমঝোতার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় অর্থ পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পুরো বিনিয়োগ প্রক্রিয়া, অর্থের ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে একটি স্বাধীন ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্টার্টআপ বাংলাদেশের বিনিয়োগ অনুমোদনের প্রক্রিয়া, হিসাব টেকনোলজিসে অর্থ ছাড়, সরকারি দায়িত্ব পালনকালীন সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তীতে সামি আহমেদের ওই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পুরো বিষয়টি স্বাধীনভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির গুলশানের কার্যালয়ে গিয়েও কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

সরকারি টাকায় নিজের ‘ভবিষ্যত’ স্টার্টআপের সামির!

সর্বশেষ আপডেট ০৬:১৫:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ অনুমোদনের পর সেই প্রতিষ্ঠানেই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে যোগ দিয়েছেন স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেডের (এসবিএল) সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামি আহমেদ। বিষয়টি নিয়ে সরকারি অর্থের ব্যবহার, বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে স্টার্টআপ বাংলাদেশ ‘হিসাব টেকনোলজিস লিমিটেড’ (বর্তমানে ‘ভারবেক্স’) নামের একটি প্রতিষ্ঠানে ২ কোটি টাকা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামি আহমেদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন হয় এবং পরে প্রথম ধাপে ১ কোটি টাকা ছাড় করা হয়।

খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত বা বাতিল হলেও হিসাব টেকনোলজিসের অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী তৎপরতা দেখা যায়। একই সময়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যেও ‘স্টার্টআপ সামিট’ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ওই আয়োজনের মাধ্যমে তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের ভাবমূর্তি তুলে ধরাই ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সামি আহমেদকে স্টার্টআপ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে অপসারণ করা হয়। পরে তিনি হিসাব টেকনোলজিসে (বর্তমানে ভারবেক্স) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন।

সামি আহমেদের দুর্নীতি নিয়ে মানববন্ধন।
সামি আহমেদের দুর্নীতি নিয়ে মানববন্ধন।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বিনিয়োগ অনুমোদনের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় যে প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন নিশ্চিত করেছিলেন, পরবর্তীতে সেই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি কোম্পানিটির শেয়ারও অর্জন করেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি স্বার্থের সংঘাতের একটি গুরুতর উদাহরণ হতে পারে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করে হিসাব টেকনোলজিস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান জুবায়ের আহমেদ। পরবর্তীতে কোম্পানিটি নাম পরিবর্তন করে ‘ভারবেক্স’ রাখে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন প্রভাব ও যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থায় কাজের সুযোগ পায়। তবে ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বর্তমানে বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সক্রিয় চুক্তি নেই বলেও খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে, স্টার্টআপ বাংলাদেশের প্রতিশ্রুত ২ কোটি টাকার মধ্যে প্রথম ধাপে ১ কোটি টাকা ছাড় হলেও সরকার পরিবর্তনের পর বাকি অর্থ আর ছাড় করা হয়নি।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থেকে রাষ্ট্রীয় তহবিল বণ্টনে প্রভাব বিস্তার এবং পরে সেই অর্থায়নপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে যোগ দেওয়া স্পষ্টতই ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের সংঘাতের গুরুতর উদাহরণ। এটি শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, বরং সুশাসনের পরিপন্থী এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিরও ইঙ্গিত বহন করে।

তার মতে, রাজনৈতিক প্রভাব বা পূর্বসমঝোতার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় অর্থ পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পুরো বিনিয়োগ প্রক্রিয়া, অর্থের ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে একটি স্বাধীন ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্টার্টআপ বাংলাদেশের বিনিয়োগ অনুমোদনের প্রক্রিয়া, হিসাব টেকনোলজিসে অর্থ ছাড়, সরকারি দায়িত্ব পালনকালীন সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তীতে সামি আহমেদের ওই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পুরো বিষয়টি স্বাধীনভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির গুলশানের কার্যালয়ে গিয়েও কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।