হিজড়া জনগোষ্ঠীর অগ্রযাত্রায় বদলে যাচ্ছে বাস্তবতা
- সর্বশেষ আপডেট ০৫:১৮:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
- / 87
সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী, ভ্রান্ত ধারণা পাল্টে দিয়েছে হিজড়া জনগোষ্ঠীর কয়েকজন। এখন তারা আর রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবারের বোঝা নয়। এরকম কয়েকজনের সাথে কথা হলো। তাদের কেউ কেউ লেখাপড়ার পাশাপাশি নিজেরাও উদ্যোক্তা, চাকরি, মডেলিং করছেন।
তাদেরই একজন অরভী রহমান। সাদা-কালোতে প্রশিক্ষণ নিয়ে রাজধানী গুলশানের একটি ফ্যাশন হাউসে কাজ করছেন তিনি। নিরাপদভাবে কাজ করার পথটা তারজন্য এতোটা সহজ ছিল না। এজন্য অনেক সংকটাকীর্ণ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে। নিজেকে ধৈর্য্য ধরে তৈরি করতে হয়েছে।
কারণ অন্যের মুখ ঝামটা নয়, লেখাপড়া শিখে চাকরি করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন অরভী রহমান। বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সহযোগিতায় টঙ্গীর বীরেরবাজারে উন্নয়ন কর্মী হিসেবে তিনি ও তার বন্ধু যোগদানও করেছিলেন। তাদের কাজ ছিল সমিতির টাকা কালেকশন করা। সাধারণ মানুষ বিষয়টাকে ভালোভাবে নিবে না। এটা ভেবে তিনি এই কাজে কিছুটা আপত্তিও জানিয়েছিলেন।
সংস্থাটি তাদের দু’মাস এখানে কাজ করতে বলেছিল। পরে অন্য বিভাগে স্থানান্তর করবেন জানিয়েছিলেন। তাদের কথামতো ২০ হাজার টাকা বেতনে কাজ শুরুও করেছিলেন। কিন্তু শেষমেষ তার ভাবনাটাই সত্যি হয়। দোকানদাররা তাদের মেনে নিতে পারে না। দোকানদাররা বলতো, ওদেরকে দেখলে টাকা দিবো না। আমাদের যাত্রা হয় না। বেচাবিক্রি হয় না। দেড় মাস কষ্টেসিষ্টে কাজ করলেও আর করা হয়ে ওঠে না। পদত্যাগ করে চলে আসেন।
এরপর ২০২০ সালে উত্তরার স্বপ্ন আউটলেটে ৮ হাজার টাকা বেতনে সেলসম্যানের চাকরি নেন। এতো কম বেতনে টঙ্গী থেকে উত্তরায় এসে কাজ করাটা তার জন্য কষ্টকর হলেও আট মাস কাজ করেন। কিন্তু বেতন না বাড়ায় তার পক্ষে কাজটি চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কারণ টঙ্গীতে বাসা ভাড়া ৯ হাজার টাকা, সেসঙ্গে যাতায়াত ভাড়া, খাওয়া-দাওয়ার খরচ। প্রতি মাসে আয় থেকে ব্যয় বেশি হওয়ায় বাধ্য হয়েই চাকরিটা ছেড়ে দেন।
এখন নিজেই পোশাকের ডিজাইন করছেন। সেসময়ে চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলেন বলেই সময়টা ভালোই যাচ্ছে বললেন অরভী রহমান।
বাংলাদেশের প্রথম ট্রান্সজেন্ডার কবি শোভা চৌধুরী। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পড়েই কবিতা লেখার প্রতি অনুপ্রাণিত হন তিনি। তিনি মনে করেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ধারক-বাহক।
নিজ উদ্যোগে ২০১৮ সালে তার প্রথম কবিতার বই ‘শ্রাবণ সন্ধ্যা’ বের হয়। দ্বিতীয় বই ‘আমি শোভা বলছি’ বের হয় ২০২২ সালে।
নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি আজ এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন। বই প্রকাশ করলেও তা পাঠকদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য অমর একুশে গ্রন্থমেলায় স্টল পাননি কবি শোভা চৌধুরী। কিন্তু মনোবল হারাননি। নিজেই বইমেলা চত্বরে ঘুরে ঘুরে বইটি বিক্রি করেন। তার কবিতা পাঠক মহলে সমাদৃত হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশনের একজন নিয়মিত আবৃত্তিকারও তিনি।
শোভা চৌধুরী বলেন, এই সফলতা পাওয়াটা অতোটা সহজ ছিল না। পরিবারে আদর-যত্নেই বেড়ে উঠছিলাম। তবে প্রতিবেশীরা, বাচ্চারা আমাকে দেখলে নানা মন্তব্য করতো। এটা আমাকে খুব কষ্ট দিতো। বয়ঃসন্ধিকালে মা প্রথম ধরতে পারেন আমার শারীরিক সমস্যাটা।
কৃষিতে ডিপ্লোমা করে ২০০৯ সালে ঢাকায় আসেন। সরকারি বাঙলা কলেজ মিরপুরে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকে ভর্তি হন । পাশাপাশি লেখালেখি ও বন্ধুতে চাকরিও করছিলেন তিনি।
এখান থেকে চলে যান লাইট হাউজে । এরপর ২০২৪ সালে বসুন্ধরার ওয়ালটনের এইচআর থেকে তাকে ফোন দেওয়া হয়, চাকরির জন্যে তার ইন্টারভিউ নিতে। পরীক্ষায় প্রথম হন তিনি। পাঁচ জনকে নির্বাচিত করা হয়। তিন জনকে এডমিনে রাখা হয়। তাকে আর আরেকজনকে শিক্ষাগত যোগ্যতা আর দক্ষতার ভিত্তিতে এইচআরে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে শোভা চৌধুরী বলেন, এইচআরে কখনো কাজ করিনি। রিক্রুটেমেন্ট ডকুমেন্টেশন ও ফাইল ম্যানেজমেন্টের পোস্ট দেওয়া হয়েছিল আমাকে। কাজটার উপর এক সপ্তাহের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় । আমার সহকর্মী সারাবান তহুরার একটি পোস্টকে ঘিরে ২০২৪ সালের এপ্রিলে রূপান্তর নাটকের ইস্যুকে কেন্দ্র করে ওয়ালটন অফিসে অনেক ঝামেলা হয়।
পোস্টটি সাড়ে ৭ হাজার শেয়ার হয়। যিনি পোস্ট করেন তাকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়। বাকিদেরকে এক মাসের ছুটি দেওয়া হয়। পরে আমরা চাকরি করতে থাকি। এরিমধ্যে এইচআরে একটা ইস্যু তৈরি হয়। তিন দিনের নোটিশে সবাইকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এখানে আমাদের কিছুই করার ছিল না।
সান্ত্বনা আক্তার জেনিফার ছোটবেলাটা গ্রামেই কেটেছে। একজন ট্রান্সজেন্ডার হওয়ায় অনেক যন্ত্রণার মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে তাকে ।
বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (বন্ধু) তে তিনি প্রথম যখন আসেন, কিছুটা ভয়ে ভয়েই ছিলেন। নাচের প্রতি আগ্রহ থাকলেও নাচ জানতেন না। একটি ফ্যাশন শোতে মডেল ও নৃত্যশিল্পী সাদিয়া ইসলাম মৌ এর প্রোগামে তাকে ডাকা হয়।
কিন্তু তার গড়ন মোটা হওয়ায় ওই ফ্যাশন শোতে মডেলিং করার জন্য তাকে নেওয়া হয় না। কিন্তু দুদিন পড়ে আবার তার ডাক পড়ে। মডেল সাদিয়া ইসলাম মৌ তাকে নেওয়ার জন্য সমর্থন জানায়।
এ ব্যাপারে সান্ত্বনা আক্তার জেনিফা বলেন, তিনি আমাকে ডায়েট মেনে চলার পরামর্শ দেন। তার কাছে নৃত্য অনুশীলন করেন। মহিলা সমিতিতে অনুষ্ঠিত ফ্যাশন শোতে আমাকে প্রধান মডেল নির্বাচিত করা হয়। এ থেকেই মডেলিং শুরু ।
তিনি আরো বলেন, ফ্যাশন শোতে নৃত্য পরিবেশন করি। কেউ বুঝতেই পারেনি, আমি ট্রান্সজেন্ডার। বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (বন্ধু) আমাকে চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়েছেন। কিন্তু লেখাপড়া কমের জন্য চাকরি হয়নি। একটু পিছিয়ে আছি। এবার এসএসসি প্রোগামে ভর্তি হয়েছি। লেখাপড়াটা অবশ্যই চালিয়ে যাবো।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কোয়ালিটি এন্ড ইনোভেশনের সানজিদা আহমেদ এর মতে, সংবিধানে সব মানুষেরই মৌলিক অধিকার রয়েছে। খাদ্য, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা যা একজন মানুষের প্রয়োজন। তেমনি মানুষ তাকে সম্মান করবে এটাও তার অধিকার। হিজড়া জনগোষ্ঠী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে তৈরি হয়েছেন। কিন্তু যেই প্রতিষ্ঠান তাদের নিয়োগ দিবে তারা, সেই প্রতিষ্ঠানের সহকর্মীরা আচরণগতভাবে তৈরি কিনা সেটাও দেখার বিষয় রয়েছে। দু’পক্ষকেই তৈরি হতে হবে জানালেন তিনি।
বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (বন্ধু)র এডভোকেসি ও কমিউনিকেশন্স ম্যানেজার মোঃ মশিউর রহমান বলেন, হিজড়া জনগোষ্ঠী যেখানে চাকরি করেন, সেই চাকরিগুলো স্থায়ীত্বশীল নয়। ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে তারা। বছর খানেক চাকরি করার পর তাদের সেখান থেকে চলে আসতে হয় নানা কারণে। ওই ভয়টা তাদের মধ্যে কাজ করে। তারা যদি স্থায়ীত্বশীল একটি চাকরি পেতেন, ওখান থেকে একটা ফিক্সড আয় আসতো, সেটা দিয়ে নিজের এবং পরিবারের ভরণপোষণ করতে পারতেন। তাহলে তাদের দেখাদেখি অন্যদের মধ্যেও চাকরি করার আগ্রহ জন্মাত। তারা ভালো আছেন, আমরাও ওই পেশায় গেলে ভালো থাকবো।
তিনি আরো বলেন, অনেকে ব্যবসা দিয়েছেন। কিন্তু লোকসান হওয়ায় আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। সরকার প্রশিক্ষণ দিয়েই ছেড়ে দিচ্ছে, আর্থিক সহায়তা করছে না। এক্ষেত্রে যারা বিভিন্ন সেক্টরে কাজ, পড়াশোনা করতে আগ্রহী, তাদের মধ্যে একটা ভয় কাজ করে, কোনো বাধা বা ঝরে পড়ার সম্মুখীন হতে হয়।
এছাড়া সমাজের গ্রহণত্বের ব্যাপারও রয়েছে। সবাই তাদের সহজভাবে গ্রহণ করছে কিনা, সমাজ তাদের গ্রহণ করছে কিনা। এই ভীতি তাদের মধ্যে রয়েছে। এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী আমাদের সমাজে রয়েছে। এটা দূর করতে পারলে এবং সবাই ইতিবাচক আচরণ প্রকাশ করলে তারা উৎসাহিত হবেন। পাশাপাশি যারা চাকরি করছেন না, তারাও ঘর থেকে বেরিয়ে কাজ করতে উৎসাহিত হবেন বলে জানালেন মোঃ মশিউর রহমান।































