ঢাকা ১০:০৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
এইচএসসিতে চমক দেখালেন রায়পুরার গৃহবধূ মেরী

স্বামী হলেন শিক্ষক, ১৯ বছর পর সফল স্ত্রী

বশির আহম্মদ মোল্লা, নরসিংদী
  • সর্বশেষ আপডেট ০৮:৫৩:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
  • / 74

এইচএসসিতে চমক দেখালেন রায়পুরার গৃহবধূ মেরী

পড়াশোনার কোনো বয়স নেই; দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে প্রতিকূলতা জয় করে স্বপ্ন পূরণ করা যায়, সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নরসিংদীর রায়পুরার দুই সন্তানের জননী আফরোজা আক্তার মেরী। বিয়ের ১৯ বছর পর নতুন করে পড়াশোনা শুরু করে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.১৯ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।

গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত ফলাফলে এ সাফল্য আসে তাঁর। মেরী রায়পুরার দৌলতকান্দি আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মানবসম্পদ উন্নয়ন শাখার অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁর ফলাফলে আনন্দিত পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসী।

আফরোজা আক্তার মেরী নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মরজাল ইউনিয়নের কুমারটেক গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর স্বামী ইমরুল হাসান বেলাবো উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। তাঁদের দুই সন্তান রয়েছে।

২০০৭ সালে বিয়ের সময় মেরী ছিলেন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সামনে ছিল এসএসসি পরীক্ষা। কিন্তু বিয়ের পর আর পরীক্ষা দেওয়া হয়নি তাঁর। ২০১২ সালে আবার পড়াশোনা শুরুর চেষ্টা করে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, বয়স নিয়ে কটূক্তি ও নানা প্রতিকূলতায় সে চেষ্টা সফল হয়নি। এরপর সংসার ও সন্তানদের লালন-পালনেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি।

দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৩ সালে আবারও পড়াশোনা শুরুর ইচ্ছার কথা স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের জানান মেরী। পরিবারের উৎসাহে আগের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দৌলতকান্দি আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। শুরু হয় নতুন করে তাঁর শিক্ষাজীবন।

সংসারের কাজ, দুই সন্তানের দেখাশোনা এবং পারিবারিক দায়িত্ব সামলে গভীর রাতে পড়াশোনা করতেন তিনি। অনেক দিন পড়তে বসার সুযোগ হতো রাত ১২টার পর। এ যাত্রায় সবচেয়ে বড় সহযোগী ছিলেন তাঁর স্বামী ইমরুল হাসান। পড়াশোনায় সহায়তার পাশাপাশি তিনি মেরীর ব্যক্তিগত শিক্ষকের ভূমিকাও পালন করেন।

সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নিয়মিত ক্লাস করতে না পারলেও শিক্ষকদের সহযোগিতায় প্রস্তুতি চালিয়ে যান মেরী। ২০২৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৪.৫৫ অর্জন করেন। এরপর একই প্রতিষ্ঠানে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন।

এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় বড় ছেলের এসএসসি পরীক্ষা, ছোট ছেলের পড়াশোনা এবং নিজের শারীরিক অসুস্থতা সামলাতে হয়েছে তাঁকে। সব বাধা পেরিয়ে এবার এইচএসসিতে জিপিএ ৪.১৯ অর্জন করেছেন।

মেরীর স্বামী ইমরুল হাসান বলেন, ‘তুমি প্রমাণ করে দিলে মানুষের ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য আর পরিশ্রমের বিকল্প কিছু নেই। আজ আমি ও আমার পরিবার খুবই আনন্দিত। ১৯ বছর পর এসেও তুমি সফল হয়েছ। নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাও, আমি তোমার পাশে আছি; তোমার প্রাইভেট টিচার হয়ে।’

মেরীর এই সাফল্য শুধু তাঁর পরিবারের আনন্দের উপলক্ষ নয়, বরং দীর্ঘ বিরতির পর পড়াশোনায় ফিরতে চাওয়া নারীদের জন্যও অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

এইচএসসিতে চমক দেখালেন রায়পুরার গৃহবধূ মেরী

স্বামী হলেন শিক্ষক, ১৯ বছর পর সফল স্ত্রী

সর্বশেষ আপডেট ০৮:৫৩:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

পড়াশোনার কোনো বয়স নেই; দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে প্রতিকূলতা জয় করে স্বপ্ন পূরণ করা যায়, সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নরসিংদীর রায়পুরার দুই সন্তানের জননী আফরোজা আক্তার মেরী। বিয়ের ১৯ বছর পর নতুন করে পড়াশোনা শুরু করে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.১৯ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।

গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত ফলাফলে এ সাফল্য আসে তাঁর। মেরী রায়পুরার দৌলতকান্দি আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মানবসম্পদ উন্নয়ন শাখার অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁর ফলাফলে আনন্দিত পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসী।

আফরোজা আক্তার মেরী নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মরজাল ইউনিয়নের কুমারটেক গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর স্বামী ইমরুল হাসান বেলাবো উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। তাঁদের দুই সন্তান রয়েছে।

২০০৭ সালে বিয়ের সময় মেরী ছিলেন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সামনে ছিল এসএসসি পরীক্ষা। কিন্তু বিয়ের পর আর পরীক্ষা দেওয়া হয়নি তাঁর। ২০১২ সালে আবার পড়াশোনা শুরুর চেষ্টা করে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, বয়স নিয়ে কটূক্তি ও নানা প্রতিকূলতায় সে চেষ্টা সফল হয়নি। এরপর সংসার ও সন্তানদের লালন-পালনেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি।

দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৩ সালে আবারও পড়াশোনা শুরুর ইচ্ছার কথা স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের জানান মেরী। পরিবারের উৎসাহে আগের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দৌলতকান্দি আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। শুরু হয় নতুন করে তাঁর শিক্ষাজীবন।

সংসারের কাজ, দুই সন্তানের দেখাশোনা এবং পারিবারিক দায়িত্ব সামলে গভীর রাতে পড়াশোনা করতেন তিনি। অনেক দিন পড়তে বসার সুযোগ হতো রাত ১২টার পর। এ যাত্রায় সবচেয়ে বড় সহযোগী ছিলেন তাঁর স্বামী ইমরুল হাসান। পড়াশোনায় সহায়তার পাশাপাশি তিনি মেরীর ব্যক্তিগত শিক্ষকের ভূমিকাও পালন করেন।

সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নিয়মিত ক্লাস করতে না পারলেও শিক্ষকদের সহযোগিতায় প্রস্তুতি চালিয়ে যান মেরী। ২০২৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৪.৫৫ অর্জন করেন। এরপর একই প্রতিষ্ঠানে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন।

এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় বড় ছেলের এসএসসি পরীক্ষা, ছোট ছেলের পড়াশোনা এবং নিজের শারীরিক অসুস্থতা সামলাতে হয়েছে তাঁকে। সব বাধা পেরিয়ে এবার এইচএসসিতে জিপিএ ৪.১৯ অর্জন করেছেন।

মেরীর স্বামী ইমরুল হাসান বলেন, ‘তুমি প্রমাণ করে দিলে মানুষের ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য আর পরিশ্রমের বিকল্প কিছু নেই। আজ আমি ও আমার পরিবার খুবই আনন্দিত। ১৯ বছর পর এসেও তুমি সফল হয়েছ। নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাও, আমি তোমার পাশে আছি; তোমার প্রাইভেট টিচার হয়ে।’

মেরীর এই সাফল্য শুধু তাঁর পরিবারের আনন্দের উপলক্ষ নয়, বরং দীর্ঘ বিরতির পর পড়াশোনায় ফিরতে চাওয়া নারীদের জন্যও অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।