ঢাকা ০১:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সৌদিতে ভয়ঙ্কর নির্যাতনের শিকার

কে নেবে লিজার সন্তানের দায়?

রীতা ভৌমিক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৭:৫৪:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
  • / 287

অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ২৫ মে এক ফুটফুটে পুত্র সন্তান জন্ম দিয়েছেন সৌদি আরব থেকে ফেরা নারী শ্রমিক লিজা (আসল নাম নয়)। সন্তানের আগমনে তার মধ্যে ছিল না কোনো প্রশান্তি।

উল্টো চোখমুখ জুড়ে ছিল একরাশ বিরক্তি আর হতাশা! সন্তানের মুখের দিকে তাকাতেই মনে পড়ে তার সাথে হওয়া দুঃসহ নির্যাতনের কথা। সঙ্গে সঙ্গেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় সে। নবজাতকটির তো কোনো দোষ নেই। তাহলে মায়ের স্নেহ, আদর, ভালোবাসা থেকে কেনো বঞ্চিত হবে সে? এই দায় কার!

তার এই বিপদে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ব্র্যাক ও বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি নামে দুটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। আজানের ধ্বনির মাধ্যমে নবজাতকের আগমন বার্তাও জানান দেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালে বসেই কথা হয় লিজার সাথে। শৈশব থেকে এখন পর্যন্ত জীবন তাকে নানা মোড়ে দাঁড় করিয়েছে। আট বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন তিনি। মা আর তার আশ্রয় জোটে নানীর কাছে। মা দ্বিতীয় বিয়ে করে চলে যান নতুন স্বামীর ঘরে। নানী তাকে স্থানীয় এতিমখানা ও মাদরাসায় রেখে আসে। ফলে এতিমখানাই হয় লিজার ঠিকানা।

এতিমখানার মালিক তাকে রামপুরায় বোনের বাড়িতে কাজে নিয়ে আসেন। কিন্তু তিনি ওকে দিয়ে কাজ করান না, বরং সন্তান স্নেহে বড় করেন। স্কুলে ভর্তি করে দেন। যদিও লেখাপড়া খুব বেশি এগোয়নি তার।

ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন মাত্র ১১ বছর বয়সে। নতুন জীবনে এসে পড়লেন চরম দারিদ্র্যের মাঝে। তাদের এক সন্তান হয়। সংসারের স্বচ্ছলতার জন্য স্বামী-স্ত্রী দুজনেই গাজীপুর গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকরি নেন। কিন্তু এখানেও সুখ সইল না। স্বামী মাদকাসক্ত হয়ে মারা যায়। শ্বশুরবাড়ির লোকজন দুই বছরের ছেলেকে রেখে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়।

তিনি বুঝতে পারলেন, দ্বিতীয়বার মা হতে চলেছেন। কোথাও জায়গা না পেয়ে আবার ফিরে যান ওই আশ্রয়দাত্রীর কাছে। তিনি তাকে ফেলে দেননি। বরং পরম স্নেহে কাছে টেনে নেন। শ্বশুরবাড়িতে জায়গা নেই, ছেলেকেও দেখতে দেয় না। কন্যা সন্তান জন্মের পরই একজনকে দিয়ে দেন।

এভাবেই জীবনের সাথে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন লিজা। সিদ্ধান্ত নেন ভাগ্য পরিবর্তনে বিদেশে যাওয়ার। তাই যে বাড়িতে থাকতেন সেখানে পরিচয় হয় ইউসুফ নামের এক লোকের সঙ্গে। তার মাধ্যমেই সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।

২৪ বছর বয়সী লিজার ভাষ্য, বিদেশ যামু দেইখ্যা নিজের টাকায় পাসপোর্ট আগেই বানাইছিলাম। পাসপোর্ট আর এনআইডি করতে ৩০ হাজার টাকা লাগছে। ট্রেনিংও নিজের টাকায় করছিলাম। মেডিক্যাল করাইতে ১০ হাজার টাকা দিছিলাম। আওয়া-যাওয়ার ভাড়াও নিজের। দালালরা আমারে কোনো টাকা দেয়নি। বরং আমারে তাগো টাকা দিতে হইছে।

তিনি বলেন, দালালরা সৌদি আরবের একটা ভিসা বাইর কইর‌্যা দিছিল। কইছিল অফিসের ভিসা। আরো বাঙালি মেয়েরা থাকবো, তিনচাইর জন একলগে কাজে যাইবা। তিনচার জন আইস্যা অফিসে থাকবা। কম দামে ভিসা নিই। দেশেই দুইবার হাত বদল হই। এক দালাল আবার আরেকজনের কাছে পাঠায়। সৌদি আরবের এয়ারপোর্টে পৌঁছুলে তিনটা ছেলে আমারে হোটেল নিয়া যায়। কফিলে স্বাক্ষর করায়। এখানে দুই দালালের কাছে হস্তান্তর হই। এভাবে চারবার হাত বদল হইছি। আমারে যেইটা বইল্যা সেইখানে নিয়া গেছিল আমি সেইট্যা পাই নাই। সম্পূর্ণ ভুয়া বইল্যা নিয়া গেছিল।

লিজা জানান, ছোটবেলা থাইক্যা যে বাড়িতে থাকছি, ইউসুফ আঙ্কেল হেইখানে আসতো। যে আমারে পালছে তাগো সম্মানের ভয়ে ঘটনাটা জানাইতে পারি নাই। তাগো তো কোনো দোষ নাই। তারা এই ব্যাপারে কিছুই জানে না।

সৌদি আরবে তার উপর নির্মমতার কথা বলতে গিয়ে যেন দুঃস্বপ্নে চলে যান তিনি। ২০২৫ সালের মে মাসে মদিনায় এক বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজে নিযুক্ত হন তিনি। দুদিন কাজ করার পরই শুরু হয় তার উপর অমানবিক নির্যাতন । ওই বাড়িতে মা আর দুই বোন, আর বাকিরা সব পুরুষ ছিলো। সারাদিন তাকে দিয়ে কাজ করাতো, ঘর মোছা, কাপড়-চোপড়, বাসন ধোওয়া। এতো কাজের পরও খাবার দিতো না, ঘুমাতে দিতো না। সারাদিন পর একটা রুটি দিতো । চাবুক দিয়া মারতো। প্রতিরাতে কয়েকজন মিলে তাকে ধর্ষণ করতো। তাদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তার মাথা কাজ করতো না। কাউকে দেখতে পেতেন না।

লিজা ঘটনাটি বলতে গিয়ে জানায়, আর বলতো, সৌদি আরবে তিন মাসের বেতন আর ১০ হাজার রিয়াল দিয়া তারা আমারে নিছে। সেই টাকাও আমি পাই নাই। আমি জানতামও না, তারা আমারে এইভাবে নিছে।
দিনের পর দিন ধর্ষণ সহ্য করতে না পেরে ময়লা ফেলতে বের হয়ে অনেক কষ্টে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। এক বাংলাদেশী নারীর সাথে দেখা হয় তার। খলিল নামে এক ড্রাইভারের সাথে তাকে মক্কায় কাজের কথা বলে পাঠায়।

এক বাসায় তাকে রাখা হয়। সেখানে অনেক মেয়ে ছিল। তাকে পতিতাবৃত্তি করতে বললে তিনি অস্বীকার করেন। তখনি তিনি জানতে পারেন, তিন হাজার রিয়েল খরচ করে মদিনা থেকে তাকে মক্কায় আনা হয়েছে। ওই টাকা ফেরত দিলে মুক্তি মিলবে। উপায়ন্তর ওই পেশায় যুক্ত হন। তিন মাস এভাবেই চলে। এরপর ড্রাইভার খলিল তাকে বিভিন্ন হোটেলে দিয়ে আসত ।

কাজ শেষে নিয়ে আসত। পালানোর কোন পথ ছিল না তার । অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে নিজেই সৌদি পুলিশের কাছে ধরা দেয় বাংলাদেশে ফিরতে। কিন্তু সৌদি পুলিশ তার আঙ্গুলের ছাপ আর ছবি তুলে ছেড়ে দেয়।

লিজার মতে, কিছুই চিনি না। কোথায় যাবো? টাকা পয়সা নেই। কি খাবো। বাঁচার তাগিদে মক্কায় হারাম শরীফের পাশে রাস্তার ধারে ছোট খাট জিনিসপত্র বিক্রি করতাম। এখানে আলী নামে এক পাকিস্তানির সাথে পরিচয় হয়। সে প্রথমে ভালো মানুষি দেখায়। আমারে একটা হুইল চেয়ার কিনা দেয়। ওমরাহ করতে আসা অসুস্থ হাজীদের হুইল চেয়ার ঠেলার কাজও ধরিয়ে দিতো।

একজন হাজীর হুইল চেয়ার ঠেললে ৩০০ টাকা পাইতাম। কোনরকমে দিন কাটছিল। কিন্তু মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না। উনাকে একটা ঘর ঠিক কইর‌্যা দিতে বলি। ঘর ঠিক করার কথা বইল্যা ওই বাসায় নিয়ে যায়। আমারে আটকাইয়্যা দেয়। বুঝতে পারি, আবার ফাঁদে পড়ছি। ওরা আমারে মারতে মারতে অজ্ঞান কইর‌্যা ফালাইত। ইনজেকশন দিতো। নির্যাতন সহ্য করতে না পাইরা আবার সেই নোংরা জীবনে ফিরা যাইতে বাধ্য হই।

আক্ষেপের সুরে লিজা বলেন, ওই ব্যক্তি আমাকে ধর্ষণ কইর‌্যাই শেষ না, অন্য ব্যক্তিদের কাছে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করত। কয়েক মাস পর খুব অসুস্থ হইয়া পড়ি। ডাক্তার দেখাইলে আলট্রাসনো কইর‌্যা বলতাছে, অবস্থা খুব খারাপ। কে কে আছে? বলছি, কেউ নাই।
ওরা বাংলাদেশের মেয়েগো মানুষ হিসাবে দেখে না আক্ষেপের সুরে কথাটা বললেন তিনি।

এরপর লিজার জন্য অপেক্ষা করছিল আরেক নরক যন্ত্রণা। তারা তাকে পুলিশে দেয়। সেখানে বাঙালি যারা ছিল তাদের সাথে কথা বলে জানতে পারেন, প্রথম যে গৃহকর্তার বাড়িতে কাজ করতেন, সে লিজার বিরুদ্ধে চুরির মামলা দিয়েছে।

লিজা জানায়, আমি আরবি না জানায়, কথা বলতে পারছিলাম না। কিচ্ছু নিয়া বাইর হই নাই। আমার নামে কেনো চোরের মামলা দিলো। প্রথমে মদিনার থানায় আমারে রাখা হইল। সেখানে সবাইরে নির্যাতন করতো। বৈদ্যুতিক শক দিতো, ল্যাংটা কইর‌্যা চাবুক দিয়া মারতো। খারাপ কথা বলতো। থানার পুলিশ খুব খারাপ। বেডারা নজর খারাপ দিতো। থানা থিক্যা যখন হাজতখানায় নিছে, সেখানে নির্যাতন করে নাই।

তিনি বলেন, থানা থিক্যা আবাখামিজের জেলে আমারে পাঠায়। সেখানে তারা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে জানায়, এক-দেড় মাসের প্রেগনেন্টের কথা। আমি জানতাম না, প্রেগনেন্ট হইছি! এটাও আমার দোষ। আমরা বাঙালি খারাপ, আমি খারাপ। তাদের কোনো দোষ নাই। ওখান থেকে দামমামে, এরপর জেদ্দা জেলে। এভাবে তিনটা জেলে পাঁচ মাসের উপর ছিলাম।

তার মাধ্যমে জানা যায়, জেদ্দা জেলে ৪৬ জন বাঙালি মেয়ে ছিলো। তাদের মধ্যে প্রেগনেন্টদের কারো কারো বছরের সাজা হয়েছে। যাদের মধ্যে দুজন জেলেই সন্তান প্রসব করেছে। মায়ের সাথে সন্তানও জেলেই রয়েছে।

চলতি বছরের (২০২৬) ৯ ফেব্রুয়ারি আউটপাশে দেশে আসা ১৫ জনের মধ্যে তিনি ছিলেন গর্ভবতী । ট্রমায় থাকায় এয়ারপোর্ট পৌঁছানোর পরপরই তার জরুরি সেবা প্রয়োজন হয় । মুমূষ অবস্থায় এয়ারপোর্ট থেকে উদ্ধার করে ব্র্যাক লানিং সেন্টারের কর্মীরা তাকে সেবা দেয়।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগামের কেইস ম্যানেজমেন্ট অফিসার নানজিবা কবির বলেন, তাকে এক মাস কাউন্সিলিং এবং জরুরি চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে কিছুটা সুস্থ করে তুলি। এরপর তাকে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির কাছে হস্তান্তর করি। ওই সংস্থার শেল্টার হোমে তিনি সাড়ে তিনমাস ছিলেন । আমরা তাকে অনলাইনে কাউন্সিলিং দিয়েছি। এখানে তিনি মেডিক্যাল সার্পোটসহ সার্বিক সহায়তা পেয়েছেন।

তিনি জানান, লিজা সামাজিক দিক বিবেচনা করে তার পরিবারকে এই অবস্থার কথা জানাতে চাননি। যেহেতু ছোটবেলায় বাবা মারা গেছেন। মাও অন্যত্র বিয়ে করেছেন। তিনি চাননি বলেই, আমরা বিষয়টি কাউকে জানাইনি।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য মতে, গর্ভবতী ও সন্তান নিয়ে দেশে ফেরত আসা ২০১৮ থেকে ২০২৬ এর জুন পর্যন্ত ০৮ জন অভিবাসী নারী শ্রমিককে সহায়তা করেছে ব্র্যাক।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগামের স্পেশালিষ্ট কেইস ম্যানেজমেন্ট আল আমিনের মতে, গর্ভবতী ও সন্তান নিয়ে বিদেশ থেকে ফেরত আসা অভিবাসী নারী শ্রমিকদের সন্তানদের পিতৃ পরিচয় পাওয়া চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। তারা স্বাস্থ্য সেবা, স্কুলে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এই সন্তানদের পিতৃ পরিচয় খুঁজে বের করা খুব কঠিন কাজ নয় বলে মনে করেন তিনি। প্রবাসী ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে পারে। সৌদি দূতাবাসের মাধ্যমে অভিবাসী নারী শ্রমিকদের কফিল বের করে এই সন্তানদের পিতৃ পরিচয় বের করতে পারে। এই সন্তানদের কল্যাণের সার্বিক দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের নেওয়া দরকার বলেও মনে করেন আল আমিন নয়ন।

দিনের পর দিন লিজার প্রতি যে অন্যায় হয়েছে সেই বিচার কি পাবেন তিনি। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির এড. ফেরদৌস নিগার জানান, এয়ারপোর্ট থানা থেকে লিজাকে উদ্ধার করা হয়েছে। ভুক্তভোগী যদি মামলা করতে চান তাহলে সংশ্লিষ্ট এয়ারপোর্ট থানায় মামলা করতে হবে। মামলায় আমরা তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো।

তিনি আরো বলেন, আমাদের শেল্টার হোমে তাকে রেখে চিকিৎসা সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করেছি। সন্তান জন্মের পরও সন্তানসহ তাকে কিছুদিন শেল্টার হোমে রেখেছি।

এ ব্যাপারে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’র (বিএমইটি) উপপরিচালক (কমসংস্থান) জোহরা মনসুর বলেন, মেয়েটি যেহেতু মামলা করতে চাচ্ছেন না। নির্যাতনের শিকার হয়ে ফেরত এসেছে। সেহেতু, বৈদেশিক কমসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের মাধ্যমে- এই অভিবাসী নারী শ্রমিকরা যখন বিপদে পড়েন মধ্য প্রাচ্যের দূতাবাসগুলো তাদের শেল্টার হোমে নিয়ে আসে।

ওখানে কারা জড়িত, মেয়েটির কাছে পাসপোর্ট, ছাড়পত্র নেই, কিন্তু টাকাটা মেয়েটি কাকে দিয়েছে এটা জানলেও সে বিচার পাবে। বিচার পেতে হলে ইউসুফ কার মাধ্যমে পাঠিয়েছে তার নাম প্রকাশ করতেই হবে। টাস্কফোর্স. বিএনসিসি’র সহায়তায় দালালকে চিহ্নিত করে ক্ষতিপূরণ মামলা করা যাবে। বাংলাদেশের একজন অপরাধী কালো তালিকাভুক্ত করে বিদেশ থেকে দেশে আনার, তার শাস্তি বিধানের ব্যবস্থাও আমাদের আইনে রয়েছে। সেই জায়গায় আমাদের যেতে হবে।

তিনি আরো বলেন, দেশের ৬৪টি জেলায় জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’র (বিএমইটি) অফিস রয়েছে। অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করছে। অবৈধভাবে যাতে কেউ বিদেশে না যায়, এজন্য বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর প্রি-ডিপারচার ওরিয়েন্টেশন (পিডিও ) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পিডিও ২০২৫ সালে উদ্বোধন করেছি। বিদেশে কাজে যাওয়ার আগে প্রয়োজন নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্মার্ট কার্ড প্রদান, লাইসেন্স ।

বিদেশে গমনেচ্ছুদের সঠিক তথ্য জানতে প্রি-ডিসিশন মেকিং ওরিয়েন্টেশন (পিডিএমও, ৫টি জেলার ৬টি উপজেলায় পাইলটিং আকারে) এবছর উদ্বোধন করা হয়েছে। ২০২৭ সাল থেকে স্কেল আপ আকারে হবে। তবে বাধ্যতামূলকভাবে হবে কিনা এর সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। প্রত্যেক উপজেলায় কারিগরী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ( টিটিসি) রয়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশগামী কমীদের সচেতনতামূলক করা হয়।

একজন নারী বা পুরুষ শ্রমিক যখন সিদ্ধান্ত নেন, বিদেশে কাজ করতে যাবেন, তিনি প্রথমে কার কাছে যাবেন, কোথায় যাবেন, কি কি কাগজ লাগবে। কি তিনি করবেন না। সবকিছু তিনি যেন জেনে বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কোনো প্রতারণার ফাঁদে পা দিতে না হয়। সেটা তাদের মধ্যে তৈরি করার জন্য পিডিএমও কমসূচী নেওয়া হয়েছে। এটা বাস্তবায়নও হয়েছে জানালেন তিনি।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

সৌদিতে ভয়ঙ্কর নির্যাতনের শিকার

কে নেবে লিজার সন্তানের দায়?

সর্বশেষ আপডেট ০৭:৫৪:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ জুন ২০২৬

অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ২৫ মে এক ফুটফুটে পুত্র সন্তান জন্ম দিয়েছেন সৌদি আরব থেকে ফেরা নারী শ্রমিক লিজা (আসল নাম নয়)। সন্তানের আগমনে তার মধ্যে ছিল না কোনো প্রশান্তি।

উল্টো চোখমুখ জুড়ে ছিল একরাশ বিরক্তি আর হতাশা! সন্তানের মুখের দিকে তাকাতেই মনে পড়ে তার সাথে হওয়া দুঃসহ নির্যাতনের কথা। সঙ্গে সঙ্গেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় সে। নবজাতকটির তো কোনো দোষ নেই। তাহলে মায়ের স্নেহ, আদর, ভালোবাসা থেকে কেনো বঞ্চিত হবে সে? এই দায় কার!

তার এই বিপদে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ব্র্যাক ও বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি নামে দুটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। আজানের ধ্বনির মাধ্যমে নবজাতকের আগমন বার্তাও জানান দেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালে বসেই কথা হয় লিজার সাথে। শৈশব থেকে এখন পর্যন্ত জীবন তাকে নানা মোড়ে দাঁড় করিয়েছে। আট বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন তিনি। মা আর তার আশ্রয় জোটে নানীর কাছে। মা দ্বিতীয় বিয়ে করে চলে যান নতুন স্বামীর ঘরে। নানী তাকে স্থানীয় এতিমখানা ও মাদরাসায় রেখে আসে। ফলে এতিমখানাই হয় লিজার ঠিকানা।

এতিমখানার মালিক তাকে রামপুরায় বোনের বাড়িতে কাজে নিয়ে আসেন। কিন্তু তিনি ওকে দিয়ে কাজ করান না, বরং সন্তান স্নেহে বড় করেন। স্কুলে ভর্তি করে দেন। যদিও লেখাপড়া খুব বেশি এগোয়নি তার।

ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন মাত্র ১১ বছর বয়সে। নতুন জীবনে এসে পড়লেন চরম দারিদ্র্যের মাঝে। তাদের এক সন্তান হয়। সংসারের স্বচ্ছলতার জন্য স্বামী-স্ত্রী দুজনেই গাজীপুর গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকরি নেন। কিন্তু এখানেও সুখ সইল না। স্বামী মাদকাসক্ত হয়ে মারা যায়। শ্বশুরবাড়ির লোকজন দুই বছরের ছেলেকে রেখে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়।

তিনি বুঝতে পারলেন, দ্বিতীয়বার মা হতে চলেছেন। কোথাও জায়গা না পেয়ে আবার ফিরে যান ওই আশ্রয়দাত্রীর কাছে। তিনি তাকে ফেলে দেননি। বরং পরম স্নেহে কাছে টেনে নেন। শ্বশুরবাড়িতে জায়গা নেই, ছেলেকেও দেখতে দেয় না। কন্যা সন্তান জন্মের পরই একজনকে দিয়ে দেন।

এভাবেই জীবনের সাথে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন লিজা। সিদ্ধান্ত নেন ভাগ্য পরিবর্তনে বিদেশে যাওয়ার। তাই যে বাড়িতে থাকতেন সেখানে পরিচয় হয় ইউসুফ নামের এক লোকের সঙ্গে। তার মাধ্যমেই সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।

২৪ বছর বয়সী লিজার ভাষ্য, বিদেশ যামু দেইখ্যা নিজের টাকায় পাসপোর্ট আগেই বানাইছিলাম। পাসপোর্ট আর এনআইডি করতে ৩০ হাজার টাকা লাগছে। ট্রেনিংও নিজের টাকায় করছিলাম। মেডিক্যাল করাইতে ১০ হাজার টাকা দিছিলাম। আওয়া-যাওয়ার ভাড়াও নিজের। দালালরা আমারে কোনো টাকা দেয়নি। বরং আমারে তাগো টাকা দিতে হইছে।

তিনি বলেন, দালালরা সৌদি আরবের একটা ভিসা বাইর কইর‌্যা দিছিল। কইছিল অফিসের ভিসা। আরো বাঙালি মেয়েরা থাকবো, তিনচাইর জন একলগে কাজে যাইবা। তিনচার জন আইস্যা অফিসে থাকবা। কম দামে ভিসা নিই। দেশেই দুইবার হাত বদল হই। এক দালাল আবার আরেকজনের কাছে পাঠায়। সৌদি আরবের এয়ারপোর্টে পৌঁছুলে তিনটা ছেলে আমারে হোটেল নিয়া যায়। কফিলে স্বাক্ষর করায়। এখানে দুই দালালের কাছে হস্তান্তর হই। এভাবে চারবার হাত বদল হইছি। আমারে যেইটা বইল্যা সেইখানে নিয়া গেছিল আমি সেইট্যা পাই নাই। সম্পূর্ণ ভুয়া বইল্যা নিয়া গেছিল।

লিজা জানান, ছোটবেলা থাইক্যা যে বাড়িতে থাকছি, ইউসুফ আঙ্কেল হেইখানে আসতো। যে আমারে পালছে তাগো সম্মানের ভয়ে ঘটনাটা জানাইতে পারি নাই। তাগো তো কোনো দোষ নাই। তারা এই ব্যাপারে কিছুই জানে না।

সৌদি আরবে তার উপর নির্মমতার কথা বলতে গিয়ে যেন দুঃস্বপ্নে চলে যান তিনি। ২০২৫ সালের মে মাসে মদিনায় এক বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজে নিযুক্ত হন তিনি। দুদিন কাজ করার পরই শুরু হয় তার উপর অমানবিক নির্যাতন । ওই বাড়িতে মা আর দুই বোন, আর বাকিরা সব পুরুষ ছিলো। সারাদিন তাকে দিয়ে কাজ করাতো, ঘর মোছা, কাপড়-চোপড়, বাসন ধোওয়া। এতো কাজের পরও খাবার দিতো না, ঘুমাতে দিতো না। সারাদিন পর একটা রুটি দিতো । চাবুক দিয়া মারতো। প্রতিরাতে কয়েকজন মিলে তাকে ধর্ষণ করতো। তাদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তার মাথা কাজ করতো না। কাউকে দেখতে পেতেন না।

লিজা ঘটনাটি বলতে গিয়ে জানায়, আর বলতো, সৌদি আরবে তিন মাসের বেতন আর ১০ হাজার রিয়াল দিয়া তারা আমারে নিছে। সেই টাকাও আমি পাই নাই। আমি জানতামও না, তারা আমারে এইভাবে নিছে।
দিনের পর দিন ধর্ষণ সহ্য করতে না পেরে ময়লা ফেলতে বের হয়ে অনেক কষ্টে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। এক বাংলাদেশী নারীর সাথে দেখা হয় তার। খলিল নামে এক ড্রাইভারের সাথে তাকে মক্কায় কাজের কথা বলে পাঠায়।

এক বাসায় তাকে রাখা হয়। সেখানে অনেক মেয়ে ছিল। তাকে পতিতাবৃত্তি করতে বললে তিনি অস্বীকার করেন। তখনি তিনি জানতে পারেন, তিন হাজার রিয়েল খরচ করে মদিনা থেকে তাকে মক্কায় আনা হয়েছে। ওই টাকা ফেরত দিলে মুক্তি মিলবে। উপায়ন্তর ওই পেশায় যুক্ত হন। তিন মাস এভাবেই চলে। এরপর ড্রাইভার খলিল তাকে বিভিন্ন হোটেলে দিয়ে আসত ।

কাজ শেষে নিয়ে আসত। পালানোর কোন পথ ছিল না তার । অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে নিজেই সৌদি পুলিশের কাছে ধরা দেয় বাংলাদেশে ফিরতে। কিন্তু সৌদি পুলিশ তার আঙ্গুলের ছাপ আর ছবি তুলে ছেড়ে দেয়।

লিজার মতে, কিছুই চিনি না। কোথায় যাবো? টাকা পয়সা নেই। কি খাবো। বাঁচার তাগিদে মক্কায় হারাম শরীফের পাশে রাস্তার ধারে ছোট খাট জিনিসপত্র বিক্রি করতাম। এখানে আলী নামে এক পাকিস্তানির সাথে পরিচয় হয়। সে প্রথমে ভালো মানুষি দেখায়। আমারে একটা হুইল চেয়ার কিনা দেয়। ওমরাহ করতে আসা অসুস্থ হাজীদের হুইল চেয়ার ঠেলার কাজও ধরিয়ে দিতো।

একজন হাজীর হুইল চেয়ার ঠেললে ৩০০ টাকা পাইতাম। কোনরকমে দিন কাটছিল। কিন্তু মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না। উনাকে একটা ঘর ঠিক কইর‌্যা দিতে বলি। ঘর ঠিক করার কথা বইল্যা ওই বাসায় নিয়ে যায়। আমারে আটকাইয়্যা দেয়। বুঝতে পারি, আবার ফাঁদে পড়ছি। ওরা আমারে মারতে মারতে অজ্ঞান কইর‌্যা ফালাইত। ইনজেকশন দিতো। নির্যাতন সহ্য করতে না পাইরা আবার সেই নোংরা জীবনে ফিরা যাইতে বাধ্য হই।

আক্ষেপের সুরে লিজা বলেন, ওই ব্যক্তি আমাকে ধর্ষণ কইর‌্যাই শেষ না, অন্য ব্যক্তিদের কাছে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করত। কয়েক মাস পর খুব অসুস্থ হইয়া পড়ি। ডাক্তার দেখাইলে আলট্রাসনো কইর‌্যা বলতাছে, অবস্থা খুব খারাপ। কে কে আছে? বলছি, কেউ নাই।
ওরা বাংলাদেশের মেয়েগো মানুষ হিসাবে দেখে না আক্ষেপের সুরে কথাটা বললেন তিনি।

এরপর লিজার জন্য অপেক্ষা করছিল আরেক নরক যন্ত্রণা। তারা তাকে পুলিশে দেয়। সেখানে বাঙালি যারা ছিল তাদের সাথে কথা বলে জানতে পারেন, প্রথম যে গৃহকর্তার বাড়িতে কাজ করতেন, সে লিজার বিরুদ্ধে চুরির মামলা দিয়েছে।

লিজা জানায়, আমি আরবি না জানায়, কথা বলতে পারছিলাম না। কিচ্ছু নিয়া বাইর হই নাই। আমার নামে কেনো চোরের মামলা দিলো। প্রথমে মদিনার থানায় আমারে রাখা হইল। সেখানে সবাইরে নির্যাতন করতো। বৈদ্যুতিক শক দিতো, ল্যাংটা কইর‌্যা চাবুক দিয়া মারতো। খারাপ কথা বলতো। থানার পুলিশ খুব খারাপ। বেডারা নজর খারাপ দিতো। থানা থিক্যা যখন হাজতখানায় নিছে, সেখানে নির্যাতন করে নাই।

তিনি বলেন, থানা থিক্যা আবাখামিজের জেলে আমারে পাঠায়। সেখানে তারা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে জানায়, এক-দেড় মাসের প্রেগনেন্টের কথা। আমি জানতাম না, প্রেগনেন্ট হইছি! এটাও আমার দোষ। আমরা বাঙালি খারাপ, আমি খারাপ। তাদের কোনো দোষ নাই। ওখান থেকে দামমামে, এরপর জেদ্দা জেলে। এভাবে তিনটা জেলে পাঁচ মাসের উপর ছিলাম।

তার মাধ্যমে জানা যায়, জেদ্দা জেলে ৪৬ জন বাঙালি মেয়ে ছিলো। তাদের মধ্যে প্রেগনেন্টদের কারো কারো বছরের সাজা হয়েছে। যাদের মধ্যে দুজন জেলেই সন্তান প্রসব করেছে। মায়ের সাথে সন্তানও জেলেই রয়েছে।

চলতি বছরের (২০২৬) ৯ ফেব্রুয়ারি আউটপাশে দেশে আসা ১৫ জনের মধ্যে তিনি ছিলেন গর্ভবতী । ট্রমায় থাকায় এয়ারপোর্ট পৌঁছানোর পরপরই তার জরুরি সেবা প্রয়োজন হয় । মুমূষ অবস্থায় এয়ারপোর্ট থেকে উদ্ধার করে ব্র্যাক লানিং সেন্টারের কর্মীরা তাকে সেবা দেয়।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগামের কেইস ম্যানেজমেন্ট অফিসার নানজিবা কবির বলেন, তাকে এক মাস কাউন্সিলিং এবং জরুরি চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে কিছুটা সুস্থ করে তুলি। এরপর তাকে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির কাছে হস্তান্তর করি। ওই সংস্থার শেল্টার হোমে তিনি সাড়ে তিনমাস ছিলেন । আমরা তাকে অনলাইনে কাউন্সিলিং দিয়েছি। এখানে তিনি মেডিক্যাল সার্পোটসহ সার্বিক সহায়তা পেয়েছেন।

তিনি জানান, লিজা সামাজিক দিক বিবেচনা করে তার পরিবারকে এই অবস্থার কথা জানাতে চাননি। যেহেতু ছোটবেলায় বাবা মারা গেছেন। মাও অন্যত্র বিয়ে করেছেন। তিনি চাননি বলেই, আমরা বিষয়টি কাউকে জানাইনি।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য মতে, গর্ভবতী ও সন্তান নিয়ে দেশে ফেরত আসা ২০১৮ থেকে ২০২৬ এর জুন পর্যন্ত ০৮ জন অভিবাসী নারী শ্রমিককে সহায়তা করেছে ব্র্যাক।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগামের স্পেশালিষ্ট কেইস ম্যানেজমেন্ট আল আমিনের মতে, গর্ভবতী ও সন্তান নিয়ে বিদেশ থেকে ফেরত আসা অভিবাসী নারী শ্রমিকদের সন্তানদের পিতৃ পরিচয় পাওয়া চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। তারা স্বাস্থ্য সেবা, স্কুলে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এই সন্তানদের পিতৃ পরিচয় খুঁজে বের করা খুব কঠিন কাজ নয় বলে মনে করেন তিনি। প্রবাসী ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে পারে। সৌদি দূতাবাসের মাধ্যমে অভিবাসী নারী শ্রমিকদের কফিল বের করে এই সন্তানদের পিতৃ পরিচয় বের করতে পারে। এই সন্তানদের কল্যাণের সার্বিক দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের নেওয়া দরকার বলেও মনে করেন আল আমিন নয়ন।

দিনের পর দিন লিজার প্রতি যে অন্যায় হয়েছে সেই বিচার কি পাবেন তিনি। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির এড. ফেরদৌস নিগার জানান, এয়ারপোর্ট থানা থেকে লিজাকে উদ্ধার করা হয়েছে। ভুক্তভোগী যদি মামলা করতে চান তাহলে সংশ্লিষ্ট এয়ারপোর্ট থানায় মামলা করতে হবে। মামলায় আমরা তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো।

তিনি আরো বলেন, আমাদের শেল্টার হোমে তাকে রেখে চিকিৎসা সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করেছি। সন্তান জন্মের পরও সন্তানসহ তাকে কিছুদিন শেল্টার হোমে রেখেছি।

এ ব্যাপারে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’র (বিএমইটি) উপপরিচালক (কমসংস্থান) জোহরা মনসুর বলেন, মেয়েটি যেহেতু মামলা করতে চাচ্ছেন না। নির্যাতনের শিকার হয়ে ফেরত এসেছে। সেহেতু, বৈদেশিক কমসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের মাধ্যমে- এই অভিবাসী নারী শ্রমিকরা যখন বিপদে পড়েন মধ্য প্রাচ্যের দূতাবাসগুলো তাদের শেল্টার হোমে নিয়ে আসে।

ওখানে কারা জড়িত, মেয়েটির কাছে পাসপোর্ট, ছাড়পত্র নেই, কিন্তু টাকাটা মেয়েটি কাকে দিয়েছে এটা জানলেও সে বিচার পাবে। বিচার পেতে হলে ইউসুফ কার মাধ্যমে পাঠিয়েছে তার নাম প্রকাশ করতেই হবে। টাস্কফোর্স. বিএনসিসি’র সহায়তায় দালালকে চিহ্নিত করে ক্ষতিপূরণ মামলা করা যাবে। বাংলাদেশের একজন অপরাধী কালো তালিকাভুক্ত করে বিদেশ থেকে দেশে আনার, তার শাস্তি বিধানের ব্যবস্থাও আমাদের আইনে রয়েছে। সেই জায়গায় আমাদের যেতে হবে।

তিনি আরো বলেন, দেশের ৬৪টি জেলায় জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’র (বিএমইটি) অফিস রয়েছে। অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করছে। অবৈধভাবে যাতে কেউ বিদেশে না যায়, এজন্য বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর প্রি-ডিপারচার ওরিয়েন্টেশন (পিডিও ) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পিডিও ২০২৫ সালে উদ্বোধন করেছি। বিদেশে কাজে যাওয়ার আগে প্রয়োজন নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্মার্ট কার্ড প্রদান, লাইসেন্স ।

বিদেশে গমনেচ্ছুদের সঠিক তথ্য জানতে প্রি-ডিসিশন মেকিং ওরিয়েন্টেশন (পিডিএমও, ৫টি জেলার ৬টি উপজেলায় পাইলটিং আকারে) এবছর উদ্বোধন করা হয়েছে। ২০২৭ সাল থেকে স্কেল আপ আকারে হবে। তবে বাধ্যতামূলকভাবে হবে কিনা এর সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। প্রত্যেক উপজেলায় কারিগরী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ( টিটিসি) রয়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশগামী কমীদের সচেতনতামূলক করা হয়।

একজন নারী বা পুরুষ শ্রমিক যখন সিদ্ধান্ত নেন, বিদেশে কাজ করতে যাবেন, তিনি প্রথমে কার কাছে যাবেন, কোথায় যাবেন, কি কি কাগজ লাগবে। কি তিনি করবেন না। সবকিছু তিনি যেন জেনে বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কোনো প্রতারণার ফাঁদে পা দিতে না হয়। সেটা তাদের মধ্যে তৈরি করার জন্য পিডিএমও কমসূচী নেওয়া হয়েছে। এটা বাস্তবায়নও হয়েছে জানালেন তিনি।