লামায় সেতুহীন পথে প্রতিদিন ঝুঁকির যাত্রা
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:০৯:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
- / 11
বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের সাত গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষের চলাচলের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বমু খাল। খালের ওপর স্থায়ী সেতু না থাকায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে পানি পার হতে হচ্ছে স্থানীয়দের। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছে শিশু, শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্করা।
কারও কাঁধে স্কুলব্যাগ, কারও হাতে বই-খাতা। কেউ মায়ের কোলে চড়ে, আবার কেউ ভিজে কাপড়েই খাল পার হয়ে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। একইভাবে অসুস্থ রোগী ও গর্ভবতী নারীদেরও জরুরি প্রয়োজনে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
চিত্তাবান পাড়া, পশ্চিম বাইশফাঁড়ি, নয়াপাড়া, তুলাতলী মুরুং পাড়া, মারমা পাড়া, ঢেকিছড়া ও হেডম্যান পাড়াসহ সাতটি গ্রামে এ পরিস্থিতি দীর্ঘদিনের। এসব এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দা ম্রো, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর। তাদের বড় একটি অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল।
স্থানীয়রা জানান, বমু খালের এপারে বাইশফাঁড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ওপারে চিত্তাবান পাড়া ও বড়থলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। তিনটি বিদ্যালয়ে প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। তাদের অনেককেই প্রতিদিন খাল পার হয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়।
বর্ষায় পানির উচ্চতা ও স্রোত বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তখন অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। অভিভাবকরাও সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। কখনো শিশুদের কোলে নিয়ে আবার কখনো ঝুঁকি নিয়ে হেঁটেই খাল পার হতে হয়।
চিত্তাবান ও বাইশফাঁড়ি পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পাউঙি ম্রো ও মাংইয়ং ম্রো জানায়, প্রতিদিন খাল পার হয়ে তাদের স্কুলে যেতে হয়। অনেক সময় বই-খাতা ও পোশাক ভিজে যায়। পানি বেশি থাকলে খাল পার হতে ভয় লাগে। তখন স্কুলেও যাওয়া সম্ভব হয় না। সেখানে সেতু নির্মাণ হলে তাদের অনেক সুবিধা হবে।
সেতুর অভাবে শুধু শিক্ষাক্ষেত্র নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় কৃষিও। কৃষকদের উৎপাদিত শাকসবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারে নিতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। যোগাযোগের দুরবস্থার কারণে পাইকারি ব্যবসায়ীরাও অনেক সময় এলাকায় যেতে চান না। ফলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ তাদের।
নয়াপাড়া ও মুরুং পাড়ার বাসিন্দা উচহ্লা ও সিংপাক ম্রো বলেন, এলাকার অনেক মানুষ জুম ও কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। সেতু না থাকায় কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে অনেক দূর হেঁটে যেতে হয়। পাইকাররা না আসায় উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দামও পাওয়া যায় না।
স্বাস্থ্যসেবাতেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের। রোগী কিংবা গর্ভবতী নারীকে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও খাল পারাপারের কারণে অনেক সময় বিলম্ব হয়। বর্ষাকালে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বান্দরবান-লামা সড়ক থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে গহিন এলাকায় বমু খালের অবস্থান। বাইশফাঁড়ি ও চিত্তাবান পাড়ার মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটি প্রায় ১৮০ ফুট প্রশস্ত। খালের এক পাশে তিনটি এবং অন্য পাশে চারটি গ্রাম রয়েছে। খালের স্রোত কখনো বেড়ে যায়, আবার কখনো হাঁটুপানি থাকে। প্রতিদিন শিক্ষার্থী, কৃষকসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের এ পথেই পারাপার হতে দেখা যায়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাকির হোসাইন বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য বমু খালের ওপর সেতু নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। খালের পানি বেড়ে গেলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়।
বাইশফাঁড়ির স্থানীয় এনজিও কর্মী অংথোয়াইনু মারমা বলেন, সেতু নির্মাণ হবে—এ কথা বলে বিভিন্ন সময়ে লোকজন এসে মাপজোখ করে গেছে। ফিতা টেনে দাগ দিয়ে চলে গেলেও বাস্তবে কাজ শুরু হয়নি।
গজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান উচাছিং মার্মা বলেন, এখানে সেতু নির্মাণ জরুরি। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ কম থাকায় এ ধরনের বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী রনি সাহা বলেন, বমু খালের ওপর সেতুটি এলাকার মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি বাস্তবায়নের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সেতু নির্মাণ করা হলে সাত গ্রামের মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমবে।





























