ঢাকা ০৬:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা খর্বে উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৮:৩৩:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬
  • / 133

মতবিনিময় সভায় উপস্থিতিদের একাংশ। ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ- ২০২৫ এবং গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ- ২০২৫ সংসদে আইনে রূপান্তরের সময় যদি পরিবর্তন এনে কমিশনের ক্ষমতা কমানো হয়, তবে প্রতিষ্ঠানটি আবারও আগের মতো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে- এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনরা। তারা বলেন, এতে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষা ও প্রতিকার নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (এনএইচআরসি) সম্মেলন কক্ষে নবনিযুক্ত চেয়ারপার্সন ও কমিশনারদের সঙ্গে ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনদের এক মতবিনিময় সভায় এসব উদ্বেগ তুলে ধরা হয়।

সভায় র‌্যাবের গুলিতে পা হারানো লিমন বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ- ২০২৫ এবং গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ- ২০২৫ কমিশনকে শক্তিশালী করেছে। এসব অধ্যাদেশের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের প্রতিকার দেওয়ার জন্য কমিশনকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা চাই এই ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকুক এবং কোনো পরিবর্তন ছাড়াই অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত হোক।”

গুমের শিকার এক ব্যক্তির ছেলে জাহিদ বলেন, বর্তমান কমিশনারদের অনেককে আগে থেকেই মানবাধিকার কর্মী হিসেবে কাজ করতে দেখা গেছে। ফলে তাদের ওপর ভুক্তভোগীদের আস্থা রয়েছে।

সভায় অংশ নেওয়া ভুক্তভোগীরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, অতীতে আইনি সীমাবদ্ধতা ও কার্যকর ক্ষমতার ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কমিশন প্রত্যাশিতভাবে ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়াতে পারেনি। এ কারণে নতুন কমিশন ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে- তা নিয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

এনএইচআরসির চেয়ারপার্সন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বর্তমান কমিশন মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকারদের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভুক্তভোগীদের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো অক্ষুণ্ণ রেখে দ্রুত আইনে পরিণত করা হবে।

তিনি আরও বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কমিশন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

কমিশনার অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, মানবাধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে কমিশন নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে কাজ করবে। কমিশনার মো. নূর খান বলেন, মানবাধিকারের ধারণা বিস্তৃত; একজন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার পরিবার ও সমাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই কমিশন ভুক্তভোগীদের পাশে থাকবে এবং কোনো চাপের কাছে মাথানত করবে না।

কমিশনার ইলিরা দেওয়ান বলেন, বর্তমান অধ্যাদেশ অনুযায়ী কমিশন তার আইনি ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করবে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার চেষ্টা করবে। অন্যদিকে কমিশনার ড. নাবিলা ইদ্রিস জানান, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো কীভাবে আইনে রূপান্তরিত হবে- তা নিয়ে তারা সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।

সভায় কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মানবাধিকার সুরক্ষায় সকল অংশীজনের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতেও নিয়মিত মতবিনিময়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা ও মতামত নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব দেওয়া হবে।

সভায় সভাপতিত্ব করেন এনএইচআরসি চেয়ারপার্সন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। এতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন, অধিকার-এর সাজ্জাদ হোসেনসহ আইন ও সালিশ কেন্দ্র, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

এ ছাড়া সভায় বিভিন্ন ঘটনার ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন র‌্যাবের গুলিতে পা হারানো লিমন, পুলিশি গ্রেপ্তারের পর মৃত্যুর শিকার জনির ভাই রকি, হেফাজতে মৃত্যুর শিকার বডি বিল্ডার ফারুকের স্ত্রী, জুলাই অভ্যুত্থানে যাত্রাবাড়ীতে গুলিবিদ্ধ কাজল মিয়া, গণপিটুনিতে নিহত দিপু দাসের পরিবার এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনরা।

সভাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা, অভিযোগ ও প্রত্যাশা সরাসরি শুনে মানবাধিকার সুরক্ষা ও প্রতিকার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার পথ খোঁজা।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা খর্বে উদ্বেগ

সর্বশেষ আপডেট ০৮:৩৩:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ- ২০২৫ এবং গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ- ২০২৫ সংসদে আইনে রূপান্তরের সময় যদি পরিবর্তন এনে কমিশনের ক্ষমতা কমানো হয়, তবে প্রতিষ্ঠানটি আবারও আগের মতো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে- এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনরা। তারা বলেন, এতে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষা ও প্রতিকার নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (এনএইচআরসি) সম্মেলন কক্ষে নবনিযুক্ত চেয়ারপার্সন ও কমিশনারদের সঙ্গে ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনদের এক মতবিনিময় সভায় এসব উদ্বেগ তুলে ধরা হয়।

সভায় র‌্যাবের গুলিতে পা হারানো লিমন বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ- ২০২৫ এবং গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ- ২০২৫ কমিশনকে শক্তিশালী করেছে। এসব অধ্যাদেশের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের প্রতিকার দেওয়ার জন্য কমিশনকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা চাই এই ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকুক এবং কোনো পরিবর্তন ছাড়াই অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত হোক।”

গুমের শিকার এক ব্যক্তির ছেলে জাহিদ বলেন, বর্তমান কমিশনারদের অনেককে আগে থেকেই মানবাধিকার কর্মী হিসেবে কাজ করতে দেখা গেছে। ফলে তাদের ওপর ভুক্তভোগীদের আস্থা রয়েছে।

সভায় অংশ নেওয়া ভুক্তভোগীরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, অতীতে আইনি সীমাবদ্ধতা ও কার্যকর ক্ষমতার ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কমিশন প্রত্যাশিতভাবে ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়াতে পারেনি। এ কারণে নতুন কমিশন ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে- তা নিয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

এনএইচআরসির চেয়ারপার্সন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বর্তমান কমিশন মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকারদের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভুক্তভোগীদের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো অক্ষুণ্ণ রেখে দ্রুত আইনে পরিণত করা হবে।

তিনি আরও বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কমিশন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

কমিশনার অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, মানবাধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে কমিশন নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে কাজ করবে। কমিশনার মো. নূর খান বলেন, মানবাধিকারের ধারণা বিস্তৃত; একজন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার পরিবার ও সমাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই কমিশন ভুক্তভোগীদের পাশে থাকবে এবং কোনো চাপের কাছে মাথানত করবে না।

কমিশনার ইলিরা দেওয়ান বলেন, বর্তমান অধ্যাদেশ অনুযায়ী কমিশন তার আইনি ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করবে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার চেষ্টা করবে। অন্যদিকে কমিশনার ড. নাবিলা ইদ্রিস জানান, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো কীভাবে আইনে রূপান্তরিত হবে- তা নিয়ে তারা সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।

সভায় কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মানবাধিকার সুরক্ষায় সকল অংশীজনের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতেও নিয়মিত মতবিনিময়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা ও মতামত নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব দেওয়া হবে।

সভায় সভাপতিত্ব করেন এনএইচআরসি চেয়ারপার্সন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। এতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন, অধিকার-এর সাজ্জাদ হোসেনসহ আইন ও সালিশ কেন্দ্র, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

এ ছাড়া সভায় বিভিন্ন ঘটনার ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন র‌্যাবের গুলিতে পা হারানো লিমন, পুলিশি গ্রেপ্তারের পর মৃত্যুর শিকার জনির ভাই রকি, হেফাজতে মৃত্যুর শিকার বডি বিল্ডার ফারুকের স্ত্রী, জুলাই অভ্যুত্থানে যাত্রাবাড়ীতে গুলিবিদ্ধ কাজল মিয়া, গণপিটুনিতে নিহত দিপু দাসের পরিবার এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনরা।

সভাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা, অভিযোগ ও প্রত্যাশা সরাসরি শুনে মানবাধিকার সুরক্ষা ও প্রতিকার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার পথ খোঁজা।