পুলিশ হেফাজতে জনির মৃত্যু: ১৩ বছরেও মিলেনি বিচার
- সর্বশেষ আপডেট ০৯:০১:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 33
পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে ইশতিয়াক হোসেন জনির মৃত্যুর ১৩ বছর পার হলেও তাঁর পরিবার এখনো চূড়ান্ত বিচার ও আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পায়নি। নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর অধীনে দেশের প্রথম ঐতিহাসিক রায়ের ছয় বছর পূর্তিতে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)।
বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে ব্লাস্ট জনির পরিবারের দায়ের করা আপিল দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তি, পলাতক আসামি এএসআই কামরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেপ্তার করে তাঁর সাজা কার্যকর এবং আদালতের নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ দ্রুত পরিবারকে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
ব্লাস্ট বলেছে, জনির মৃত্যু শুধু তাঁর পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। দীর্ঘ সময় ধরে বিচার, জবাবদিহি ও প্রতিকার ঝুলে থাকা আইনের শাসন ও মানবাধিকারের জন্য উদ্বেগজনক।
২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পল্লবী এলাকায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে জনি ও তাঁর ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। হেফাজতে তাঁদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের একপর্যায়ে জনির মৃত্যু হয় বলে মামলার অভিযোগ। পেশায় গাড়িচালক জনি রেখে যান তাঁর মা, স্ত্রী, ১১ বছর বয়সী ছেলে, ৮ বছর বয়সী মেয়ে ও ছোট ভাই রকিকে।
জনির পরিবার থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ প্রথমে তা নিতে অস্বীকৃতি জানায় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তাঁর ভাই রকি নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর অধীনে মামলা করেন। বিচারিক কার্যক্রম একপর্যায়ে স্থগিত হলে ব্লাস্টের আইনি সহায়তায় হাইকোর্ট সেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে ছয় মাসের মধ্যে বিচার শেষ করার নির্দেশ দেন।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত ওই আইনের অধীনে দেশের প্রথম ঐতিহাসিক রায় দেন। রায়ে পুলিশের এসআই জাহিদুর রহমান, এএসআই রাশেদুল হাসান ও এএসআই মো. কামরুজ্জামান মিন্টুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রত্যেককে জনির পরিবারকে দুই লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। দুই পুলিশ সোর্স সুমন ও রাসেলকে দেওয়া হয় সাত বছর করে কারাদণ্ড।
পরবর্তীতে আসামিদের আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট হাইকোর্ট রায় দেন। আদালত এসআই জাহিদুর রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা জরিমানা এবং জনির পরিবারকে দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের আদেশ বহাল রাখেন। পলাতক এএসআই কামরুজ্জামান মিন্টুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, জরিমানা ও দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের আদেশও বহাল থাকে।
এএসআই রাশেদুল হাসানের সাজা কমিয়ে ১০ বছর করা হয়। তাঁর জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ যথাক্রমে ৫০ হাজার ও ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। অপর পুলিশ সোর্স রাসেলকে খালাস দেন হাইকোর্ট। আর সোর্স সুমন ইতোমধ্যে তাঁর সাজা ভোগ করেছেন।
তবে হাইকোর্টের রায়ও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে ওই রায়ের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করা হয়নি। জনির ভাই রকির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্লাস্ট রাসেলের খালাসের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে ‘ক্রিমিনাল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল’ নম্বর ১১৮২/২০২৬ দায়ের করেছে। মামলাটি বর্তমানে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
ব্লাস্ট জানিয়েছে, এএসআই কামরুজ্জামান মিন্টু এখনো পলাতক। রাসেল হাইকোর্টে খালাস পেয়েছেন এবং সুমন তাঁর সাজা ভোগ করেছেন। ফলে ১৩ বছর আগের ওই হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহি ও বিচারিক প্রতিকারের বিষয়টি এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি।
ব্লাস্টের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিভিন্ন আদালতের রায়ে জনির পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও পরিবার এখনো তা পায়নি। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিধান না থাকায় পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় রয়েছে। একজন নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ১৩ বছর ধরে বিচার, জবাবদিহি ও প্রতিকারের অপেক্ষায় রাখা আইনের শাসন ও মানবাধিকারের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।






























