পার্বত্য চট্টগ্রামে তিন কমিটি গঠন নিয়ে নাগরিক সমাজের উদ্বেগ
- সর্বশেষ আপডেট ০৫:২৯:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 10
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক তিনটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন এবং এর সঙ্গে সামরিকায়ন বাড়ার আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের ৫২ জন নাগরিক। তারা বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান না করে নিরাপত্তা ও সামরিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলার উদ্যোগ নতুন করে সংঘাত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তারা এ উদ্বেগ জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা। দীর্ঘদিন ধরে সামরিকায়নের মাধ্যমে পাহাড়ের আদিবাসীদের অধিকার দমন ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। ষাটের দশকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে প্রায় এক লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হন। পরবর্তী সময়ে সেনাক্যাম্প স্থাপন ও সম্প্রসারণের ফলে কৃষি, জীবন-জীবিকা, পরিবেশ, জনমিতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়ে।
বিবৃতিতে বলা হয়, এসব পরিস্থিতির কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে দুই দশকের বেশি সময় সশস্ত্র সংঘাত চলে। এতে সামরিক ও বেসামরিক বহু মানুষ হতাহত হন এবং অনেক আদিবাসী ব্যক্তি ও পরিবার নিপীড়নের শিকার হন। বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিক ২৬টি বৈঠকের পর ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও প্রায় ২৯ বছর পরও এর মৌলিক ধারাগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী পাহাড় থেকে সেনাশাসন প্রত্যাহারের দাবিও জোরালোভাবে উঠেছিল। অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে পাহাড়ে অন্তত দুবার রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত সাতজন আদিবাসী নিহত হন এবং অনেকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হন বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে প্রস্তাবিত ‘রেইনবো নেশন’-এর প্রতি সমর্থন জানিয়ে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পার্বত্য তিন জেলার মানুষ বিএনপির প্রার্থীদের নির্বাচিত করেছেন। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাহাড়ের কোনো প্রতিনিধির ওপর ন্যস্ত না করে একজন অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে পাহাড়ের মানুষের আপত্তি থাকলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তারা।
নাগরিকদের অভিযোগ, গত ১০ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ তিনটি পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি, নির্বাহী কমিটি ও পরামর্শক কমিটি গঠন করেছে। জাতীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে, নির্বাহী কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রসচিব এবং পরামর্শক কমিটির সভাপতি করা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যানকে। তাদের দাবি, কমিটিগুলোর মধ্যে দুটি কমিটিকে সচিবালয়-সংক্রান্ত জনবল ও অবকাঠামোগত সহায়তা দেবে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই)।
এ সিদ্ধান্তকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, কর্তৃত্বপরায়ণ ও উদ্বেগজনক’ উল্লেখ করে বিবৃতিদাতারা বলেন, ডিজিএফআইয়ের বিরুদ্ধে পাহাড়ের আদিবাসীদের অধিকার হরণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার অভিযোগ ও ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। ফলে এ ব্যবস্থায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়তে পারে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তারা বলেন, পরামর্শক কমিটিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় দুই মাসের মধ্যে সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে। পরে নির্বাহী কমিটি তিন মাসের মধ্যে জাতীয় কর্মকৌশলের খসড়া তৈরি করবে এবং জাতীয় কমিটি তা চূড়ান্ত করবে। একইভাবে নির্বাহী কমিটিকে প্রচলিত আইন, চুক্তির শর্ত ও বিধি-বিধান পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংস্কার এবং নতুন আইন ও বিধি প্রণয়নের সুপারিশ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, এসব উদ্যোগের কিছু দিক আশাজনক হলেও গোয়েন্দা ও সামরিক কর্তৃত্বের প্রভাবের মধ্যে থেকে সেগুলো বাস্তবায়ন করা হলে ঘোষিত ‘রেইনবো নেশন’-এর লক্ষ্য কতটা অর্জিত হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়ায় বিএনপি সরকারের ভূমিকার কথাও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১৯৯১-১৯৯৫ সালের সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সঙ্গে ১৩টি আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছিল। আগের সরকারের আলোচনার ধারাবাহিকতায় এসব বৈঠক শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয় এবং পরবর্তী সময়ে চুক্তি স্বাক্ষরের পথ তৈরি করে।
বিবৃতিদাতারা অভিযোগ করেন, সরকারের একটি বিশেষ মহল আশির দশকের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে আবারও নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করছে। তাদের মতে, সামরিক ও বেসামরিক আমলা-নির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে পাহাড়ের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা হলে তা শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবর্তে সংঘাত ও বিভেদের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
তারা সরকারকে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বৈধ প্রতিনিধিদের সঙ্গে পুনরায় আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে গোয়েন্দা-নিয়ন্ত্রণমুক্তভাবে কমিটিগুলো পুনর্গঠন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তারা। পাশাপাশি কর্তৃত্ববাদী আমলাতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার যেকোনো প্রচেষ্টা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ, মানবাধিকার কর্মী ও মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির, নারীপক্ষের সদস্য শিরীন পারভিন হক, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়েরসহ আরও অনেকে।

































