জাহাজ সংঘর্ষে ঝুঁকিপূর্ণ চট্টগ্রাম বন্দর
- সর্বশেষ আপডেট ০৩:১০:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬
- / 29
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও প্রবেশ চ্যানেলে গত দুই সপ্তাহে অন্তত পাঁচটি জাহাজ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক দুর্ঘটনায় বন্দর চ্যানেলে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরে মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা, স্রোতের তীব্রতা, বাতাসের গতি, নাব্যতা সংকট এবং জাহাজের নোঙর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এর সঙ্গে নতুন ও বিদেশি নাবিকদের চ্যানেল সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার অভাবও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সম্প্রতি ৩৩ হাজার টন ডিজেলবাহী ট্যাংকার ‘এমটি সি স্পাইক’ ও গমবাহী ‘এমভি সান শাইন’-এর সংঘর্ষে একটি জাহাজের ইঞ্জিন রুম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুরো জাহাজে ব্ল্যাকআউট দেখা দেয়। এর কয়েক দিন পর চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবেশমুখে ‘সিএনসি ইউরেনাস’ স্টিয়ারিং গিয়ার হারায়। পরে প্রবল স্রোতের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্ল্যাগবাহী ‘এমভি আনাসসা’ পাশের একটি জাহাজে আঘাত করে।
শুধু বড় বাণিজ্যিক জাহাজ নয়, সাম্প্রতিক সময়ে লাইটার জাহাজের মধ্যেও একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ফলে বন্দরের বহির্নোঙর ও চ্যানেলকে আরও নিরাপদ করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, এল নিনোর প্রভাবের পাশাপাশি গত দুই মাসে বঙ্গোপসাগরে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বেশ সক্রিয় রয়েছে। এতে হারবারমাউথ ও আউটার অ্যাঙ্কারেজ এলাকা উত্তাল থাকছে। এ কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে বলে মেরিন বিভাগ মনে করছে।
তিনি জানান, স্প্রিং টাইড, নিম্নচাপজনিত পরিস্থিতি ও দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাব একসঙ্গে থাকায় জাহাজের নোঙর ঠিকভাবে স্থির রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। একই কারণে লাইটার ও কোস্টার জাহাজের পণ্য ওঠানো-নামাতেও সমস্যা হচ্ছে।
বন্দর বিশেষজ্ঞ ও বিচিং মাস্টার ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরীর মতে, বহির্নোঙরে নাব্যতা বা পর্যাপ্ত পানির গভীরতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি মূল চ্যানেল সম্পর্কে নতুন ও বিদেশি নাবিকদের পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। সঠিক নিয়মে নোঙর না করাও এর অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, আলফা অ্যাঙ্কারেজ এলাকায় পানির গভীরতা প্রায় ১২ থেকে ১৩ মিটার হলেও সেখানে ১০ থেকে ১১ মিটার ড্রাফটের জাহাজ আসে। নিরাপদ চলাচলের জন্য জাহাজের ড্রাফটের তুলনায় পর্যাপ্ত অতিরিক্ত পানির গভীরতা থাকা প্রয়োজন। তা না থাকলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এ ছাড়া পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময়ে বাতাস ও স্রোতের তীব্রতা বাড়ায় নোঙর ‘ড্রেগ’ করার ঝুঁকি থাকে। আলফা, ব্রাভো ও চার্লি অ্যাঙ্কারেজ এলাকায় জায়গা তুলনামূলক কম হলেও জাহাজের সংখ্যা বেশি। ফলে জাহাজ ঘোরানো বা অবস্থান পরিবর্তনের সময়ও সংঘর্ষের সম্ভাবনা বাড়ে।
লাইটার জাহাজের মাস্টারদের মতে, জাহাজের ওজনের সঙ্গে নোঙরের সক্ষমতার সামঞ্জস্য না থাকাও দুর্ঘটনার একটি কারণ। পাশাপাশি দক্ষ ও অভিজ্ঞ নাবিকের সংকট পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়া ও সমুদ্রের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চট্টগ্রাম বন্দরের নাব্যতা সংকট দূর করা, লাইটার জাহাজ আধুনিকায়ন এবং অভিজ্ঞ মাস্টার ও পাইলটের মাধ্যমে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা জরুরি। এসব ব্যবস্থা নেওয়া না হলে যেকোনো সময় বন্দরের চ্যানেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।































