ঢাকা ০২:১১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আমেরিকার সাথে চুক্তি হলে হরমুজ খুলবে ইরান

অন্তার্জাতিক ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:০৫:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
  • / 94

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি হলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে ইরান

দীর্ঘদিন ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চিরতরে থামানোর লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেছে ইরান। এই বিশেষ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রধান শর্ত হিসেবে কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিখ্যাত ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য খুলে দেওয়া হবে।

ইরানের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, প্রস্তাবিত এই চুক্তির মূল খসড়ার মধ্যে ইরানের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে বহাল থাকা মার্কিন কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টিও বেশ গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে ইরানের বহুল আলোচিত পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তী সময়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এই চুক্তির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে তাঁরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইরান আসলেই কোনো বড় অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে কি না, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে তেহরান চুক্তিতে দেওয়া তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কতটা সফলভাবে পূরণ করছে তার ওপর।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে জানান, তিনি ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত কিছু সামরিক বিমান হামলা শেষ মুহূর্তে এসে বাতিল করেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, দুই পক্ষের প্রধান আলোচকেরা ইতিমধ্যে ‘একটি চমৎকার ও ফলপ্রসূ সমঝোতায়’ পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন এবং খুব শিগগিরই এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি সই হতে পারে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অতর্কিত বিমান হামলার মধ্য দিয়ে এই ভয়াবহ যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল। এর জবাবে ইরানও ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ততম পথ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় তেহরান। পরবর্তীতে গত এপ্রিল মাসে দুই পক্ষ সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মাঝেমধ্যেই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে আসছিল; এমনকি চলতি সপ্তাহেও উভয় পক্ষ দুই দফায় একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে।

গতকাল শুক্রবার ইরানি গণমাধ্যমে একটি ১৪ দফা চুক্তির বিবরণ প্রকাশ করা হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এটি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে একে ভিত্তিহীন বলেছেন। এর কয়েক ঘণ্টা পর এই শান্তি চুক্তির অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারক (MoU) পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়েছে এবং এটি এখন দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই চুক্তির ক্ষেত্রে পাকিস্তান ও কাতার যৌথভাবে মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে কাজ করেছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা এক ব্রিফিংয়ে জানান, এই চুক্তির প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পর থেকেই প্রায় সাথে সাথে ইরানের নৌ-পরিবহনের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। এরপর শুরু হবে ৬০ দিনের একটি গভীর আলোচনা প্রক্রিয়া, যার মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম—যা পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রধান উপাদান। আলোচনার মাধ্যমে ওই সব বিপজ্জনক উপাদান ইরানের ভেতরেই সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হবে অথবা পরে দেশ থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।

অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা কড়া ভাষায় জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানকে আগেভাগে বা অগ্রিম কোনো অর্থ দেওয়া হবে না। এর মাধ্যমে ইরানি গণমাধ্যমের সেই সব প্রতিবেদন সরাসরি নাকচ হয়ে গেল, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে মূল আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই ইরানের কিছু অবরুদ্ধ ব্যাংক তহবিল ছেড়ে দেওয়া হবে। মার্কিন প্রশাসন জানায়, ইরানকে ধাপে ধাপে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা হবে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও আটকে থাকা সম্পদ অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত করার মতো পদক্ষেপগুলো নেওয়া হবে পর্যায়ক্রমে। একই সাথে এই চুক্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের হিজবুল্লাহসহ অন্যান্য প্রক্সি বা ছায়া গোষ্ঠীগুলোকে ইরানের পক্ষ থেকে সব ধরনের অর্থায়ন স্থায়ীভাবে বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতায় সহায়তাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যে একটি সতর্ক আশাবাদ দেখা গেলেও চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে সই হতে এখনো কিছুটা আইনি পথ বাকি রয়েছে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

আমেরিকার সাথে চুক্তি হলে হরমুজ খুলবে ইরান

সর্বশেষ আপডেট ১১:০৫:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

দীর্ঘদিন ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চিরতরে থামানোর লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেছে ইরান। এই বিশেষ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রধান শর্ত হিসেবে কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিখ্যাত ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য খুলে দেওয়া হবে।

ইরানের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, প্রস্তাবিত এই চুক্তির মূল খসড়ার মধ্যে ইরানের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে বহাল থাকা মার্কিন কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টিও বেশ গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে ইরানের বহুল আলোচিত পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তী সময়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করা হবে। মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এই চুক্তির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে তাঁরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইরান আসলেই কোনো বড় অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে কি না, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে তেহরান চুক্তিতে দেওয়া তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কতটা সফলভাবে পূরণ করছে তার ওপর।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে জানান, তিনি ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত কিছু সামরিক বিমান হামলা শেষ মুহূর্তে এসে বাতিল করেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, দুই পক্ষের প্রধান আলোচকেরা ইতিমধ্যে ‘একটি চমৎকার ও ফলপ্রসূ সমঝোতায়’ পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন এবং খুব শিগগিরই এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি সই হতে পারে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অতর্কিত বিমান হামলার মধ্য দিয়ে এই ভয়াবহ যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল। এর জবাবে ইরানও ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ততম পথ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় তেহরান। পরবর্তীতে গত এপ্রিল মাসে দুই পক্ষ সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মাঝেমধ্যেই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে আসছিল; এমনকি চলতি সপ্তাহেও উভয় পক্ষ দুই দফায় একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে।

গতকাল শুক্রবার ইরানি গণমাধ্যমে একটি ১৪ দফা চুক্তির বিবরণ প্রকাশ করা হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এটি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে একে ভিত্তিহীন বলেছেন। এর কয়েক ঘণ্টা পর এই শান্তি চুক্তির অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারক (MoU) পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়েছে এবং এটি এখন দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই চুক্তির ক্ষেত্রে পাকিস্তান ও কাতার যৌথভাবে মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে কাজ করেছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা এক ব্রিফিংয়ে জানান, এই চুক্তির প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পর থেকেই প্রায় সাথে সাথে ইরানের নৌ-পরিবহনের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। এরপর শুরু হবে ৬০ দিনের একটি গভীর আলোচনা প্রক্রিয়া, যার মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম—যা পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রধান উপাদান। আলোচনার মাধ্যমে ওই সব বিপজ্জনক উপাদান ইরানের ভেতরেই সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হবে অথবা পরে দেশ থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।

অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা কড়া ভাষায় জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানকে আগেভাগে বা অগ্রিম কোনো অর্থ দেওয়া হবে না। এর মাধ্যমে ইরানি গণমাধ্যমের সেই সব প্রতিবেদন সরাসরি নাকচ হয়ে গেল, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে মূল আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই ইরানের কিছু অবরুদ্ধ ব্যাংক তহবিল ছেড়ে দেওয়া হবে। মার্কিন প্রশাসন জানায়, ইরানকে ধাপে ধাপে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা হবে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও আটকে থাকা সম্পদ অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত করার মতো পদক্ষেপগুলো নেওয়া হবে পর্যায়ক্রমে। একই সাথে এই চুক্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের হিজবুল্লাহসহ অন্যান্য প্রক্সি বা ছায়া গোষ্ঠীগুলোকে ইরানের পক্ষ থেকে সব ধরনের অর্থায়ন স্থায়ীভাবে বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতায় সহায়তাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যে একটি সতর্ক আশাবাদ দেখা গেলেও চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে সই হতে এখনো কিছুটা আইনি পথ বাকি রয়েছে।