অনুমোদন পেলো পদ্মা ব্যারাজ,ব্যয় ৩৩ হাজার কোটি টাকা
- সর্বশেষ আপডেট ০৩:০৫:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
- / 169
দীর্ঘদিনের আলোচনা, সংশোধন ও অনিশ্চয়তার পর অবশেষে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, লবণাক্ততা কমানো এবং মৃতপ্রায় নদীগুলো পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প।
বুধবার (১৩ মে) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় পদ্মা ব্যারাজকে অগ্রাধিকারভিত্তিক অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রকল্পের প্রথম ধাপে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত সাত বছরে ধাপে ধাপে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের মতে, শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী নাব্য হারিয়েছে। এতে কৃষি, মৎস্য, নৌপথ, সুপেয় পানি ও সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে চাপে রয়েছে। পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে বর্ষা-পরবর্তী সময়ে পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে নিয়ন্ত্রিতভাবে বিভিন্ন নদীতে প্রবাহ সরবরাহ করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে একাধিক স্পিলওয়ে গেট, নেভিগেশন সুবিধা, ফিস পাস ও রেল সংযোগ থাকবে। একই সঙ্গে ব্যারাজ ও গড়াই অফটেক এলাকায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্পটি চালু হলে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিকল্পনা অনুযায়ী, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে পুনরুজ্জীবিত করা হবে। প্রথম পর্যায়ে গড়াই-মধুমতি ও হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদী সিস্টেমে পুনর্খনন, ড্রেজিং ও পানি প্রবাহ বৃদ্ধির কাজ শুরু হবে।
এ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাড়তে থাকা লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ করা। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট এবং কৃষিজমির ক্ষতি কমাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে। কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার পাশাপাশি মাছ উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া ভবদহসহ জলাবদ্ধ এলাকায় পানি নিষ্কাশন পরিস্থিতির উন্নতিরও আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্প এলাকা দেশের চারটি বিভাগের ১৯ জেলার ১২০টির বেশি উপজেলায় বিস্তৃত। সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ এর সুফল পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে প্রকল্পটি ঘিরে ভূ-রাজনৈতিক ও পরিবেশগত কিছু প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে পদ্মায় পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার যে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হয়েছে, সেটির বাস্তব সমাধান অনেকাংশে নির্ভর করবে আন্তঃসীমান্ত পানিবণ্টন পরিস্থিতির ওপর। চলতি বছরের ডিসেম্বরে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, প্রকল্পটি দক্ষিণাঞ্চলের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি জমা, নদীভাঙন ও পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়গুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সঠিক নকশা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা ছাড়া এত বড় প্রকল্প প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে।

































