জবিতে সংঘাত বাড়ছে, উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থীরা
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:৫৭:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 14
আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখা ছাত্রদলের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে একের পর এক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এরই মধ্যে নতুন ক্যাম্পাস নির্মাণের দাবিকে কেন্দ্র করে অন্য ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গেও সংঘর্ষে জড়িয়েছে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।
বারবার সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা।
দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণের তিন দফা দাবিতে আয়োজিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জকসু, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি, ছাত্রফ্রন্ট ও ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শাখা ছাত্রদলের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ পরে ক্যাম্পাসের বাইরে পার্শ্ববর্তী ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে অন্তত ৭০ জন আহত হন।
ঘটনার পর কেন্দ্রীয় ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের রুদ্ধদ্বার বৈঠক হলেও প্রশাসনিকভাবে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
জবি শাখা ছাত্রদলের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে মঞ্চে বসাকে কেন্দ্র করে যুগ্ম আহ্বায়ক সুমন সরদার ও মুস্তাফিজুর রহমান রুমির অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত তিনজন আহত হন। পরে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল দুই নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়।
এর আগে গত ২০ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে একটি সমালোচনামূলক পোস্টকে কেন্দ্র করে শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব শামছুল আরেফিন ও যুগ্ম আহ্বায়ক নাহিয়ান বিন অনিকের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। এ সময় স্টিলের পাইপ ও রড নিয়ে সংঘর্ষে অন্তত চারজন আহত হন।
ওই ঘটনার পর কেন্দ্রীয় ছাত্রদল দুই পক্ষের আট নেতাকর্মীকে বহিষ্কার এবং নাহিয়ান বিন অনিককে শোকজ করে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষে নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছেন ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা উপস্থিত থাকেন, তাই ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে সংঘর্ষ হলে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এ ধরনের সংঘর্ষ ক্যাম্পাসের বাইরে হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে ওই শিক্ষার্থী বলেন, তারা কেন এ বিষয়ে যথাযথ দৃষ্টি দিচ্ছে না, তা তিনি বুঝতে পারছেন না।
গত ৪ আগস্টের সংঘর্ষের কারণে একাডেমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথাও জানিয়েছেন ওই শিক্ষার্থী। তার ভাষ্য, পরদিন পরীক্ষা থাকলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে পরিবার তাকে ক্যাম্পাসে যেতে দেয়নি। ফলে মিডটার্ম পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি এবং পরবর্তী সময়েও পরীক্ষাটি দেওয়ার সুযোগ পাননি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইসমাইল হোসেন তাসিন বলেন, ক্যাম্পাসে লাঠিসোঁটা নিয়ে শোডাউন ও সংঘর্ষের ঘটনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় তৈরি করছে। তার অভিযোগ, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সহিংসতার সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে।
ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ ও অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু)। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চা, নিরাপদ চলাচল ও মুক্ত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার জায়গা; সংঘর্ষের জন্য নয়।
বিবৃতিতে সংঘর্ষে জড়িতদের দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়।
জাতীয় ছাত্রশক্তির জবি শাখার সভাপতি শাহীন মিয়া অভিযোগ করেন, ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সংঘাত বন্ধ করে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের জবি শাখাও ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে। সংগঠনটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক খিজির আল সিফাত স্বাক্ষরিত প্রেসনোটে বলা হয়, ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষ এবং ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের সন্দেহে কাউকে মারধর কিংবা সংঘর্ষের মাধ্যমে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয় বলেও উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকেই দলমত-নির্বিশেষে সব সংগঠনকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ ক্যাম্পাস গঠনে ছাত্রদল কাজ করছে। শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল বহিষ্কারসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
তার দাবি, কোনো ইউনিটের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে সংশ্লিষ্ট ইউনিটের দায়িত্বশীলদের সুপারিশের ভিত্তিতেই কেন্দ্রীয় সংসদ সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যক্তিগত স্বার্থ, দ্বন্দ্ব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে কেন্দ্র করে কেউ সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
হিমেল বলেন, ব্যক্তির চেয়ে দল বড় এবং দলের চেয়ে দেশ বড়; এই নীতিতে বিশ্বাস রেখে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ছাত্রদল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
গত ২০ সেপ্টেম্বরের সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিস থেকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী কর্মকাণ্ড থেকে সবাইকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। কোনো শিক্ষার্থী শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. আযম খান বলেন, প্রক্টরিয়াল বডি সতর্ক অবস্থায় থেকে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ছাত্রনেতাদের ডেকে শান্ত থাকার জন্য বলা হয়েছে।
সংঘর্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না; এমন প্রশ্নের জবাবে প্রক্টর বলেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রদল ব্যবস্থা নেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর আলাদাভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়া পদক্ষেপের ওপরই তারা নির্ভর করছেন বলে জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন বলেন, সংঘর্ষ এড়াতে প্রশাসনিকভাবে আলোচনা হয়েছে এবং প্রক্টরিয়াল টিমকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সহিংসতা প্রতিরোধে বিভিন্ন দিক থেকে কার্যকরভাবে কাজ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
































