উপকূলে মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালনে নারীর অনন্য সাফল্য
- সর্বশেষ আপডেট ০৫:৫৯:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
- / 18
ভোলার চরফ্যাশনের বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর তীর ঘেঁষা চর মানিকা ইউনিয়নের চর আইচা গ্রাম। নিঃশব্দ এই উপকূলীয় গ্রামে লুকিয়ে আছে এক নারীর সংগ্রাম, আত্মত্যাগ আর স্বাবলম্বিতার অনন্য গল্প। সেই নারী আনোয়ারা বেগম- যার জীবন একসময় ছিল সীমাহীন অনিশ্চয়তা আর অভাবের অন্ধকারে ঘেরা।
স্বামী হারানোর পর ছোট ছেলে ও বৃদ্ধ মায়ের দায়িত্ব একাই কাঁধে তুলে নেন আনোয়ারা। সীমিত আয়ের মধ্যে জীবন চালাতে গিয়ে যখন টিকে থাকাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, ঠিক তখনই তার জীবনে আসে নতুন দিগন্ত- পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর অর্থায়নে এবং এফডিএ কর্তৃক বাস্তবায়িত “Resilient Homestead and Livelihood Support to the Vulnerable Coastal People of Bangladesh (RHL) প্রকল্প”।
প্রকল্পের আওতায় আনোয়ারা বেগম পান মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালন ও জলবায়ু-সহনশীল পশুসম্পদ ব্যবস্থাপনার উপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ। এরপর মাত্র ২০ হাজার টাকার ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে শুরু করেন নিজের ছোট খামার।
শুরুর দিনগুলো ছিল কঠিন, কিন্তু ধৈর্য আর নিয়মিত পরিচর্যায় ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে তার ভাগ্য। আধুনিক মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালন শুরু করার পর কমে আসে রোগবালাই, বাড়ে উৎপাদনশীলতা।
সময় গড়াতে গড়াতে খামারে বেড়ে ওঠে ছাগলের সংখ্যা। গত ঈদুল আজহায় নিজের খামারের দুটি সুস্থ ছাগল বিক্রি করে উল্লেখযোগ্য আয় করেন আনোয়ারা বেগম। এই আয় তার জীবনে শুধু অর্থনৈতিক স্বস্তিই আনেনি, বরং তাকে দিয়েছে আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদা।
আনোয়ারা বলেন,
“আগে সাধারণ পদ্ধতিতে ছাগল পালতাম, প্রায়ই অসুখে মারা যেত। এখন মাচা পদ্ধতিতে রোগবালাই কম, আমরা অনেক লাভবান হচ্ছি।”
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে পিকেএসএফ ও গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ)-এর সহায়তায় পরিচালিত আরএইচএল প্রকল্প। স্থানীয় সংস্থা পরিবার উন্নয়ন সংস্থা (এফডিএ) নারীদের শুধু প্রশিক্ষণই নয়, মাচা ঘর নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় সহায়তাও প্রদান করছে।
এ পর্যন্ত চরফ্যাশন ও মনপুরার ১৯টি ইউনিয়নে প্রায় ১ হাজার নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং ৬২৫ জনকে মাচা পদ্ধতির খামার স্থাপনে সহায়তা করা হয়েছে।
প্রকল্প সমন্বয়কারী মেহেদী আজম বলেন, মাচা পদ্ধতি শুধু লাভজনক নয়, এটি জলবায়ু-সহনশীল ও টেকসই কৃষির একটি কার্যকর মডেল।
এফডিএ-এর সিনিয়র প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী শংকর চন্দ্র দেবনাথ জানান, গ্রামীণ নারীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করাই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
এফডিএ পরিচালক মো: কামাল উদ্দিন বলেন, এই পদ্ধতি ছাগলের স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাও গড়ে তুলছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রাজন আলী বলেন, “মাচা পদ্ধতি বিজ্ঞানসম্মত। এতে রোগ কমে, উৎপাদন বাড়ে এবং খামার পরিচালনা সহজ হয়।”
আজ আনোয়ারা বেগম শুধু একজন খামারি নন- তিনি উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের জন্য একটি জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তার ছোট খামার এখন একটি বৃহৎ পরিবর্তনের প্রতীক, যা প্রমাণ করছে- সঠিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সুযোগ পেলে গ্রামের নারীরাও হয়ে উঠতে পারেন স্বাবলম্বী উদ্যোক্তা।
চরফ্যাশন ও মনপুরার উপকূলে আনোয়ারার এই গল্প এখন শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্য নয়- এটি একটি সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা।





































