শিশুদের বাণিজ্যিক যৌন শোষণের অদৃশ্য জাল
- সর্বশেষ আপডেট ০৯:৫২:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
- / 26
নদীবন্দর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম, বাসস্ট্যান্ড থেকে ব্যক্তিগত বাড়ি—বাংলাদেশে শিশুদের বাণিজ্যিক যৌন শোষণ ও নির্যাতন যেন বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়, বরং দারিদ্র্য, নীরবতা ও সুযোগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক বিস্তৃত বাস্তবতা। দ্য ফ্রিডম ফান্ড ও পপুলেশন কাউন্সিলের গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে—এই সংকটের গভীরতা ও বিস্তার এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি স্পষ্ট।
গ্রাম থেকে পরিবারসহ শহরে আসা—কাজের খোঁজে, টিকে থাকার চেষ্টায়। বাবার আয় অনিয়মিত, সংসারের চাপ ক্রমেই বাড়ে। হোটেল বা ছোট কারখানায় কাজ করেও প্রয়োজন মেটে না। একসময় সে থেমে বলে, “সব সময় নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।” গবেষণায় দেখা গেছে, পথ ও শ্রমজীবী ছেলেদের একটি অংশ খাবার, আশ্রয় বা অল্প টাকার বিনিময়ে যৌন সম্পর্কে জড়াতে বাধ্য হয়—অনেকেই এটিকে শোষণ হিসেবেও চিনতে পারে না।
একটি বিয়ের প্রস্তাব—নিরাপত্তা, ভালো থাকার প্রতিশ্রুতি। পরিবার রাজি হয়েছিল দ্রুত। কিন্তু অল্প সময়েই সেই প্রতিশ্রুতি ভেঙে পড়ে। তাকে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে শোষণের চক্রে ফেলে দেওয়া হয়। গবেষণা বলছে, গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের মেয়েরা প্রায়ই ভুয়া বিয়ে, চাকরির প্রলোভন বা আবেগীয় প্রতারণার মাধ্যমে এই চক্রে ঢুকে পড়ে। একবার ঢুকে পড়লে চলাফেরা নিয়ন্ত্রিত হয়, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন হয়ে ওঠে নিয়মিত।
বন্যায় ঘর হারিয়ে পরিবার ভেঙে যায়। কাজের খোঁজে সে চলে আসে বন্দরে। রাত কাটে ঘাটে, ট্রলারে, খোলা আকাশের নিচে। “খাবার না থাকলে… অন্য পথ খুঁজতে হয়,” সংক্ষিপ্ত জবাব। গবেষণায় দেখা গেছে, নদীবন্দর, টার্মিনাল, বাজার—এ ধরনের জনসমাগমস্থলগুলোতে শিশুদের শোষণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
এগুলো আলাদা ঘটনা নয়—বরং একটি কাঠামোগত সমস্যার অংশ। দারিদ্র্য সবচেয়ে বড় কারণ হলেও এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও কিছু বিষয়।
অর্থনৈতিক চাপ শিশুদের অল্প বয়সেই শ্রমবাজারে ঠেলে দেয়। পরিবার ভাঙন, সহিংসতা বা অবহেলা তাদের ঘর ছাড়তে বাধ্য করে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১২–১৭ বছর বয়সী পথসংযুক্ত ছেলেদের মধ্যে ৬১.৭ শতাংশ অন্য জেলা থেকে শহরে এসেছে। এর মধ্যে ৬৮.১ শতাংশ কাজের খোঁজে, ২৯ শতাংশ পারিবারিক স্থানান্তরের কারণে এবং ২৫.৫ শতাংশ আর্থিক সংকটের কারণে এসেছে। গড়ে তারা ১০.৫ বছর বয়সে স্থানান্তরিত হয়, এবং ২২.৯ শতাংশ একাই শহরে আসে।
ক্ষুধা এখানে বড় বাস্তবতা। প্রায় ৩২.৬ শতাংশ ছেলে গত চার সপ্তাহে অন্তত একবেলা খাবার বাদ দিয়েছে টাকার অভাবে। যারা একা থাকে, তাদের মধ্যে এই হার আরও বেশি—প্রায় অর্ধেক নিয়মিত খাবার মিস করে।
পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, বাল্যবিয়ে এবং মেয়েশিশুর প্রতি বৈষম্যও শোষণের পথ তৈরি করে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—বন্যা, নদীভাঙন—বাস্তুচ্যুতি বাড়িয়ে ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।
দ্য ফ্রিডম ফান্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ খালেদা আক্তার বলেন, “মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রতারণা বড় ভূমিকা রাখে, আর ছেলেদের ক্ষেত্রে ক্ষুধা ও আশ্রয়হীনতা তাদের শোষণের দিকে ঠেলে দেয়।”
তিনি আরও বলেন , “শিশুদের বাণিজ্যিক যৌন শোষণ প্রতিরোধে ক্ষতিকর সামাজিক রীতিনীতি পরিবর্তন করা অপরিহার্য। এর জন্য সমাজের সর্বস্তরে মনোভাব ও আচরণের পরিবর্তন প্রয়োজন। পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই সুরক্ষামূলক রীতিনীতির প্রচার, শিশুদের অধিকার সমুন্নত রাখা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একযোগে কাজ করতে হবে, যাতে শেষ পর্যন্ত তাদের বাণিজ্যিক যৌন শোষণ থেকে রক্ষা করা যায়।”
এই শোষণ নির্দিষ্ট কোনো স্থানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সর্বত্র ছড়িয়ে আছে:
- রাস্তার নির্জন অংশ ও সড়কের ধারের কর্মস্থল
- বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও নদীবন্দর
- পার্ক, বাজার ও জনসমাগমস্থল
- হোটেল, দোকান, কারখানা—যেখানে শিশুরা কাজ করে
- ব্যক্তিগত বাড়ি ও ভাড়া কক্ষ
- যৌনপল্লী ও এর আশপাশ
৬৩টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও তিনটি বড় যৌনপল্লীতে পরিচালিত গবেষণায় এসব স্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মমতাজ আহমেদ বলেন, “আইন থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে সমস্যা রয়েছে। বাল্যবিয়ের কারণে অপ্রাপ্তবয়সী মায়েরা অনেক সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, ফলে মা ও শিশু দুজনই ঝুঁকিতে থাকছে।”
এই সমস্যা শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে শিশু নির্যাতন একটি বড় বাস্তবতা।
আফগানিস্তানে ৭৪ শতাংশ শিশু সহিংস শাস্তির শিকার। ভুটানে ৭০ শতাংশের বেশি কিশোরী মনে করে কিছু ক্ষেত্রে স্ত্রী নির্যাতন গ্রহণযোগ্য। শ্রীলঙ্কায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিচারাধীন মামলা শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত।
ভারতে ৯ শতাংশ নারী যৌন সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, যার অনেকটাই কিশোরী বয়সে ঘটে। বাংলাদেশে ১৫–১৯ বছর বয়সী বিবাহিত মেয়েদের ৪৭ শতাংশ সহিংসতার শিকার। মালদ্বীপে ১৭ শতাংশ কিশোর ছেলে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কের অভিজ্ঞতা জানিয়েছে।
ইউনিসেফ বলছে, এই সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি সামাজিক ও কাঠামোগত সমস্যার অংশ। প্রতিবন্ধী শিশুরা আরও বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ইন্টারনেটের বিস্তার নতুন ধরনের শোষণ—অনলাইন হয়রানি ও যৌন নির্যাতনের পথও তৈরি করছে।
শিশু শোষণ এখন আন্তর্জাতিক মাত্রাও পেয়েছে। পাচার চক্রগুলো সাধারণত পরিচিত মানুষের মাধ্যমে শুরু হয়—দালাল, আত্মীয় বা স্থানীয় কেউ।
প্রথমে প্রলোভন—চাকরি, বিয়ে বা ভালো জীবনের প্রতিশ্রুতি। এরপর স্থানান্তর—দেশের ভেতরে বা সীমান্ত পেরিয়ে। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর শুরু হয় কঠোর নিয়ন্ত্রণ—নথিপত্র কেড়ে নেওয়া, ঋণের ফাঁদ, শারীরিক নির্যাতন।
অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের একাধিকবার বিক্রি করা হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কিছু আলোচিত ঘটনার মধ্য দিয়ে দেখা গেছে, ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর মধ্যেও এই ধরনের শোষণ সংগঠিত হতে পারে—যা সমস্যার গভীরতা আরও স্পষ্ট করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাচারকারীরা দ্রুত কৌশল বদলায়, কিন্তু প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেই তুলনায় ধীরগতির।
সমস্যার সমাধান একক কোনো পদক্ষেপে সম্ভব নয়, তবে কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারের দিকনির্দেশনা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে শিশুরা ঝুঁকিতে পড়ে। কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিংয়ের অভাব রয়েছে, বিশেষ করে ছেলে শিশুদের জন্য। অনেকেই নিজেদের অভিজ্ঞতাকে শোষণ হিসেবে চিনতে পারে না, যা সমস্যাকে আড়াল করে রাখে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. সাইদুর রহমান খান বলেন, “বর্তমান সেবাগুলো থাকলেও আরও বিস্তৃত, ট্রমা-সচেতন এবং ছেলে-মেয়েদের ভিন্ন প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।”
আইনি সহায়তা ও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও বড় বাধা।
ইউনিসেফের কাঠামো অনুযায়ী, সমাধানে প্রয়োজন—আইন বাস্তবায়ন, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন, নিরাপদ পরিবেশ, পরিবারকে সহায়তা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষা।
শিশু শোষণের এই চিত্র নতুন নয়, তবে এখন তা আরও দৃশ্যমান। দারিদ্র্য, নীরবতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এটিকে টিকিয়ে রেখেছে।
তবু পরিবর্তনের সম্ভাবনা একেবারে নেই—এমনও নয়। ছোট ছোট উদ্যোগ, সচেতনতা, এবং দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা এই বাস্তবতার কিছু অংশ বদলাতে পারে।
প্রশ্ন থেকে যায়—এই পরিবর্তনের শুরুটা কোথায়, আর কে নেবে সেই প্রথম পদক্ষেপ?































