যৌন হয়রানি ও পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ
- সর্বশেষ আপডেট ০৮:৫৬:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 328
অন্তবর্তীকালীন সরকার উপদেষ্টা পরিষদের সাপ্তাহিক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে ৩০ জানুয়ারি কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি ও পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে দুটি অধ্যাদেশ নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। এরিমধ্যে একটি কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ২০২৬ ও দ্বিতীয়টি পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ – ২০২৬।
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশের খসড়ায় যৌন হয়রানির বিস্তৃত সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। যেখানে শারীরিক, মৌখিক, অমৌখিক (ইঙ্গিতপূর্ণ), ডিজিটাল ও অনলাইনে করা আচরণসহ জেন্ডারভিত্তিক সব অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপমানজনক কার্যকলাপ যৌন হয়রানি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল, মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ও অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সংঘটিত হয়রানিকেও এর আওতায় আনা হয়েছে।
খসড়ায় অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এই কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটি অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত; তদন্তকালে সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং উপযুক্ত শাস্তির সুপারিশ করতে পারবে।
প্রধান উপদেষ্টার সহকারী প্রেস সচিব সুচিস্মিতা তিথি বলেছেন, কর্মক্ষেত্র-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ২০২৬’ এর খসড়ায় চারটা অধ্যায় এবং ২০টি ধারা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক হচ্ছে, এই খসড়ায় শারীরিক, মৌখিক, মানসিক, ইঙ্গিতপূর্ণ ও ডিজিটাল স্পেসের আচরণকে যৌন হয়রানি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশের খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, নারীরা ডিজিটাল স্পেসে ভয়াবহ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। নারী নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি মৌখিকভাবে লিখিতভাবে বা অনলাইনের মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ করতে পারবে এবং অভিযোগ গ্রহণ করার ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করা।
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তির বিধান থাকছে বলেও জানান সুচিস্মিতা তিথি ।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, শাস্তি হিসেবে সতর্কীকরণ, বরখাস্ত বা চাকরিচ্যুত করা, বহিষ্কার করা বা ক্ষতিপূরণের বিধান এখানে আছে। আর অভিযোগ যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয় সেক্ষেত্রেও এক ধরনের শাস্তির বিধান এই অধ্যাদেশে রয়েছে।
‘পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ২০২৬’ এর খসড়ায় সাতটি অধ্যায়ে ৩০টি ধারা রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আশ্রয়কেন্দ্র, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, আইনত এবং জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, নির্যাতনকারী ব্যক্তির সঙ্গে যাতে যোগাযোগ বা ঘনিষ্ঠতা সীমিত করা যায়, সেজন্য এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী আদালতের অভিযোগের ভিত্তিতে অস্থায়ী সুরক্ষা আদেশ এবং তদন্ত শেষে স্থায়ী আদেশ জারি করা যাবে। নির্ধারিত ফর্মে অভিযোগ গ্রহণের পর সাত দিনের মধ্যে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করতে হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা করতে হবে।
অভিযোগকারীকে নিরাপত্তা ও মানসিক সহায়তা প্রদানের বিষয়টিকে বিবেচনা করা হয়েছে এবং শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদাভাবে বিশেষ ব্যবস্থা এই অধ্যাদেশে আছে। তদন্তের সম্পূর্ণ গোপনীয়তা যাতে নিশ্চিত করা হয় সেটার প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীর নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষায় অধ্যাদেশটি ‘সার্ভাইভারকেন্দ্রিক পদ্ধতি’ গ্রহণ করেছে। অভিযোগের কারণে কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক আচরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রে সুবিচার নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে প্রকৃত ভুক্তভোগীরা নিরুৎসাহিত না হন।
অধ্যাদেশের খসড়ায় অসংগঠিত, যেখানে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি গঠন সম্ভব নয়, সেখানে স্থানীয় অভিযোগ কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এই কমিটি গঠিত হবে, যাতে নাগরিকেরা অভিযোগ জানানোর কার্যকর সুযোগ পান।
অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মনিটরিং কমিটি গঠনের নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের আর্থিক সহায়তা, পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা ও সচেতনতা কার্যক্রমের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত রয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম এ প্রসঙ্গে বলেন, অধ্যাদেশ হয়েছে এটি একটি অর্জন বলে মনে করছি আমরা । এতে একটি মৌলিক দুর্বলতা রয়েছে, অভিযোগ কমিটি কি প্রশাসনিক কর্মকর্তারাই থাকবেন, নাকি এর বাইরের লোকেরাও থাকবেন। আমাদের সংগঠনগুলোর দাবি ছিল অভিযোগ কমিটিতে একজন নারীকে প্রধান করতে হবে। এখানে নারী প্রধানের কথা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ নেই। মনিটরিং ঠিকভাবে হবে না। কি করা হবে, এই দায়বদ্ধতা এখানে উল্লেখ করা হয়নি। অধ্যাদেশ পালন না করলে কি করা হবে এ কথারও উল্লেখ নেই।
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন ২০২৪ এ বলা হয়েছে, এই আইন প্রণয়নের ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে সরকারকে স্থানীয় অভিযোগ কমিটি গঠনের কথা রয়েছে। অভিযোগ দাখিলের ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করার নির্দেশ রয়েছে।
অন্যদিকে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ২০২৬ এর খসড়ায় ডিজিটাল ও অনলাইনে করা আচরণসহ জেন্ডারভিত্তিক সব অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপমানজনক কার্যকলাপ যৌন হয়রানি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল, মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ও অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সংঘটিত হয়রানিকেও এর আওতায় আনা হয়েছে।
এই দুটি অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে নারীপক্ষ ও জাতীয় নারী কমিশনের সদস্য এডভোকেট কামরুননাহার বলেন, আমরা খসড়ায় যে বিষয়গুলো সুপারিশ করেছি , যে নীতিমালা হাইকোর্টে ছিল তা আইনি কাঠামোতে তৈরি করা হয়েছে। আইনের কিছু প্রক্রিয়া এখানে সংযুক্ত করা হয়েছে। গৃহস্থকাজে যুক্ত গৃহকর্মীরা যৌন হয়রানির শিকার হলে কোথায় যাবেন। এজন্য একটা স্থানীয় অভিযোগ কমিটি থাকবে। কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি ও অভিযোগ কমিটি গঠন করতে হবে। অভিযোগ কমিটি গঠন না করলে একটা শাস্তির বিধান রাখার কথা আমরা বলেছি। যদি কর্তৃপক্ষ অবহেলা করেন অভিযোগ কমিটি গঠন না করার ক্ষেত্রে, সেগুলোকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, যৌন হয়রানি বলা হবে কী হবে না, সংজ্ঞার ক্ষেত্রে নীতিমালাকে অনুসরণ করে আচরণ গুলোর ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হলে শিশু আইনে বিচার হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যৌন নির্যাতনের শিকার হলে প্রতিবন্ধী বিষয়ক আইন ২০১৩ কে অনুসরণ করা হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই অধ্যাদেশ নিয়ে প্রচার প্রচারণা করা। যাতে কেউ বলতে না পারেন, আমি এটা জানি না। প্রচারণার জন্য সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে। এছাড়াও বিধিমালা দ্রুত করতে হবে।
এডভোকেট কামরুননাহার বলেন, পারিবারিক সহিংসতা ( প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ এর কিছু সংশোধন করা হয়েছে। এই অধ্যাদেশটি মূলত সংশোধন মূলক আইন। পারিবারিক সহিংসতা হলেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ হবে, শাস্তি দিবে। তা নও, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতা, বোঝা পড়ার একটি সুযোগ রাখা হয়েছে। কার্যক্রমগুলোকে একটু সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে।





































