ঢাকা ০৪:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নারী আন্দোলনে পুরুষদেরও যুক্ত করতে হবে

বিশেষ প্রতিনিধি
  • সর্বশেষ আপডেট ১০:১১:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬
  • / 144

নারীর অগ্রগতি হলেও সংগঠিতভাবে ও সুচিন্তিতভাবে তাকে পিছনে ঠেলে দেয়ার কাজটি হচ্ছে। এটি আমাদের এড্রেস করতে হবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা কেবল নারী আন্দোলন একা করতে পারবেনা, এখানে পুরুষদেরও যুক্ত করতে হবে।

সোমবার (৩০ মার্চ) সকাল ১০ টায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে কৌশলগত পরিকল্পনা বিষয়ক কর্মশালায় বক্তারা একথা বলেন।
উক্ত কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। বিশেষ অতিথি ছিলেন ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ গীতাঞ্জলি সিং। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন নিজেরা করির সমন্বয়ক খুশী কবির। কর্মশালার উদ্দেশ্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অ্যাডভোকেসি ও নেটওয়ার্কিং পরিচালক জনা গোস্বামী। ঐক্যবদ্ধ নারী আন্দোলনের ভূমিকা ও গুরুত্ব সম্পর্কে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহ সভাপতি রেখা চৌধুরী এবং প্রাগ্রসরের এর নির্বাহী পরিচালক ফৌজিয়া খন্দকার ইভা।
উদ্বোধনী অধিবেশন শেষে সাতটি গ্রুপে পারিবারিক চ্যালেঞ্জ; ধর্মীয় মৌলবাদ ও উগ্রপন্থী; নারীর প্রতি সহিংসতা; নারী আন্দোলন ও সংহতি; নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব; আইন ও নীতি এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বনহীনতা বিষয়ে দলীয় কাজ অনুষ্ঠিত হয়: দলীয় কাজ পরিচালনায় ফ্যাসিলিটেটর ছিলেন বহ্নিশিখার তাসাফ্ফী হোসেন। দলীয় কাজে গাইড করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের শারমিন আক্তার; ব্র্যাকের শাশ^তী বিপ্লব; উই ক্যান এলায়েন্সের জিনাত আরা হক; একশন এইড বাংলাদেশের মরিয়ম নেছা ; গণসাক্ষরতা অভিযানের সামছুন নাহার কলি এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের শাহাজাদী আফজালী শম্পা। দলীয় কাজ শেষে দলীয় কাজ উপস্থাপন করে প্রতিটি দল। এসময় ফ্যাসিলিটেটর ছিলেন ওয়াইডাব্লিউসিএ অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হেলেন মনীষা সরকার।

দলীয় কাজ শেষে সমাপনী অধিবেশনে বক্তব্য দেন বিশেষ অতিথি ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ গীতাঞ্জলি সিং। আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক-এর ফাল্গুনী ত্রিপুরা; ডিজিটাল রাইটস এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ চৌধুরী; আ্যড সালামা আলী, উপদেষ্টা বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা অ্যাড.সালমা আলী।

দলীয় কাজ উপস্থাপন শেষে সমাপনী অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ গীতাঞ্জলি সিং বলেন; সি এস ডব্লিউ এর ৭০ তম অধিবেশন সহ বিভিন্ন জাতীয় ও বৈশ্বিক আলোচনায় নারী আন্দোলন নিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত হচ্ছে । তবে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের কোথাও সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়িত হচ্ছেনা। সেজন্য সময় অনুসারে অ্যাডভোকেসি পদ্ধতি ও কৌশল পরিবর্তন নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে; ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে; আমাদের সুপারিশগুলো আমাদের চিন্তার প্রতিফলন। সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব কমেছে।

আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক-এর ফাল্গুনী ত্রিপুরা বলেন, আদিবাসী ও প্রান্তিক ও দলিত নারীদেও নিয়ে আলোচনায় গুরুত্ব দিতে হবে অনেকসময় অনিচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টি বাদ পড়ে যায়। ১৩২৫ নম্বর রেজুলুশনে আদিবাসী –ইস্যু যুক্ত হয়েছে, এখানে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজের বিষয়ে ভাবতে হবে।

ডিজিটাল রাইটস এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ চৌধুরী বলেন, আজকের কর্মশালায় উত্থাপিত বিষয়গুলোর সাথে প্রযুক্তির সংযোগ আছে, অধিকার ও বৈষম্যের সম্পর্ক আছে এটি সকলকে বুঝতে হবে। এতে আন্দোলন শক্তিশালী হবে এবং সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির কাজগুলোর মাধ্যমে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা অ্যাড.সালমা আলী বলেন, এখন অনেক নারী বিচারক থাকলেও থানাগুলো নারীবান্ধব নয়। নারী কমিশন, শিশুদের জন্য গঠিত কমিশন অনেক ভালোভাবে কাজ করছে। আগামী ৬ মাস থেকে ০১ বছরে যেসকল কাজ করা হবে তা দৃশ্যমান হোক- আমাদের সেই অঙ্গীকার করতে হবে। বৈষম্য নিরসনে প্রতিকার, প্রতিরোধ ও লিগ্যাল এ্যাকশনের ক্ষেত্রে কিভাবে কাজ করা হবে তার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি এসময়।

সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি ২৪ বছর যাবৎ নারীর মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করছে। এই কমিটির কাজের মধ্য দিয়ে নারী আন্দোলন সামাজিক শক্তি হিসেবে গড়ে উঠেছে। নারী যত অগ্রসর হচ্ছে তত বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তার সামনে আসছে। এসব মোকাবেলা করে নারী আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির মাধ্যমে সকল সংগঠনগুলোকে একত্রিত করে এই বাধাসমূহ দূর করার জন্য কৌশল নির্ধারণের উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, ৫৫ বছরে কি কাজ করলাম এটা অনেকের প্রশ্ন । আমি কখনও হতাশ হইনি, বরং এগিয়ে যাচ্ছি। তিনি এসময় নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নীতিমালা গ্রহণ ও নীতিমালা বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার গুরুত্ব উল্লেখ করে আবারও সেই আলোকে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের উপর জোর দিতে সকলকে আহ্বান জানান।

উদ্বোধনী অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্যে নিজেরা করির সমন্বয়ক খুশী কবির বলেন, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি আমাদের সকলের। এখানে সবাই অংশগ্রহণ না করলে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি প্রাণটা হারিয়ে ফেলে। কমিটির কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও মতামত প্রদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগের সময়গুলোতে বাংলাদেশে একটা ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি তেমন নেই। তিনি এসময় বলেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে এখন সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে, অনেক আন্দোলন হচ্ছে তবুও নারীর প্রতি সহিংসতা কমছে না। এমতাবস্থায় সমাধান না পেলেও আমরা সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করলে নারীর অগ্রযাত্রার পথে থাকা অন্যতম বাধা সহিংসতা মোকাবেলায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করি।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অ্যাডভোকেসি ও নেটওয়ার্কিং পরিচালক জনা গোস্বামী বলেন, আজকের কর্মশালা আয়োজনের উদ্দেশ্যে হচ্ছে বর্তমান বাস্তবতায় নারীর মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংক্রান্ত অগ্রাধিকার ভিত্তিক ইস্যূগুলো চিহ্নিত করা। সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির শক্তি, সীমাবদ্ধতা, সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ও বাসÍবসম্মত কৌশল ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। প্ল্যাটফরমের সদস্য ও সদস্য সংগঠনের মধ্যে সমন্বয়, অংশগ্রহণ, পারস্পারিক সৌহার্দ্য ও শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি করা। আমরা আশা করি আজকের কর্মশালার মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত মতামত ও সুপারিশসমূহ নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সম্মিলিত উদ্যোগকে আরও জোরদার করবে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহ সভাপতি রেখা চৌধুরী সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গঠনের প্রেক্ষাপট আলোচনায় বলেন, যেকোন রাজনৈতিক, সামাজিক এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় নারীরা বেশি নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হন। নারীর প্রতি নির্যাতন প্রতিরোধে ১৯৯৪ সনে নারী নেত্রীদের আহবানে সম্মিলিত নারী সমাজ নামে একটি প্ল্যাটফরম গঠন করা হলো। এই প্ল্যাটফরমের সদস্যবৃন্দ যেকোন নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনায় একজোট হয়ে কাজ করেছে; সকল মানবাধিকার সংগঠনকে একত্রিত করার চেষ্টা করেছে। পরবর্তীতে ২০০২ সনে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করার পরও আমরা এখন পর্যন্ত একসাথে কাজ করছি। দীর্ঘ সময়ের কাজের ধারাবাহিকতায় নারী বান্ধব অনেক আইন প্রণয়ণ করা হলেও দেশে এখনও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে ও নারী আন্দোলনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় পদক্ষেপ গ্রহণে আজকের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সকলের সম্মিলিত মতামত সহায়ক ভ’মিকা পালন করবে।

প্রাগ্রসরের এর নির্বাহী পরিচালক ফৌজিয়া খন্দকার ইভা বলেন, নারী আন্দোলন গড়ে তোলার সাথে সম্পৃক্ত মোর্চাগুলোর সাথে কোন না কোনভাবে যুক্ত থাকার ফলে আমাদের শক্তি বেড়েছে। প্রাপ্তিও এসেছে । বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দীর্ঘসময়ের পদযাত্রায় কাজ এগিয়ে নিয়ে গেছে, এই যাত্রা সহজ নয়। নারী আন্দোলনের মধ্যেই শক্তির সৌরভ ছড়িয়ে আছে; ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সৌরভ ছড়িয়ে আছে। তবে নারী আন্দোলন শক্তিশালী ভাবে এগিয়ে নিতে পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠমোকে সংঘবদ্ধভাবে ও কৌশলগতভাবে নিরসন করতে হবে; আদর্শিক জায়গাত সংঘাত না হলে একত্রিত হতে হবে; রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক ও শ্রম বাজারের বৈষম্য দূর করতে হবে; অর্ন্তভ’ক্তিমূলক অংশগ্রহণে নিশ্চিতের প্রতি জোর দিতে হবে; নারী আন্দোলন উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত নারীর-এই ভাবনা খন্ডন করতে হবে; নারী সংগঠনগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা জোরদার সহ তরুণদের যুক্ত করার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

উক্ত কৌশলগত পরিকল্পনা বিষয়ক কর্মশালায় সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির ২৮ টি সংগঠনের প্রতিনিধি, ইউএনউইমেন বাংলাদেশ এর প্রতিনিধিবৃন্দ এবং যশোর, চট্টগ্রাম, রংপুর; দিনাজপুর; বাগেরহাট, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ এবং টঙ্গী জেলার তৃণমূলের সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির সদস্যবৃন্দসহ ৯০জন উপস্থিত ছিলেন।

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

নারী আন্দোলনে পুরুষদেরও যুক্ত করতে হবে

সর্বশেষ আপডেট ১০:১১:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

নারীর অগ্রগতি হলেও সংগঠিতভাবে ও সুচিন্তিতভাবে তাকে পিছনে ঠেলে দেয়ার কাজটি হচ্ছে। এটি আমাদের এড্রেস করতে হবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা কেবল নারী আন্দোলন একা করতে পারবেনা, এখানে পুরুষদেরও যুক্ত করতে হবে।

সোমবার (৩০ মার্চ) সকাল ১০ টায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে কৌশলগত পরিকল্পনা বিষয়ক কর্মশালায় বক্তারা একথা বলেন।
উক্ত কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। বিশেষ অতিথি ছিলেন ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ গীতাঞ্জলি সিং। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন নিজেরা করির সমন্বয়ক খুশী কবির। কর্মশালার উদ্দেশ্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অ্যাডভোকেসি ও নেটওয়ার্কিং পরিচালক জনা গোস্বামী। ঐক্যবদ্ধ নারী আন্দোলনের ভূমিকা ও গুরুত্ব সম্পর্কে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহ সভাপতি রেখা চৌধুরী এবং প্রাগ্রসরের এর নির্বাহী পরিচালক ফৌজিয়া খন্দকার ইভা।
উদ্বোধনী অধিবেশন শেষে সাতটি গ্রুপে পারিবারিক চ্যালেঞ্জ; ধর্মীয় মৌলবাদ ও উগ্রপন্থী; নারীর প্রতি সহিংসতা; নারী আন্দোলন ও সংহতি; নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব; আইন ও নীতি এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বনহীনতা বিষয়ে দলীয় কাজ অনুষ্ঠিত হয়: দলীয় কাজ পরিচালনায় ফ্যাসিলিটেটর ছিলেন বহ্নিশিখার তাসাফ্ফী হোসেন। দলীয় কাজে গাইড করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের শারমিন আক্তার; ব্র্যাকের শাশ^তী বিপ্লব; উই ক্যান এলায়েন্সের জিনাত আরা হক; একশন এইড বাংলাদেশের মরিয়ম নেছা ; গণসাক্ষরতা অভিযানের সামছুন নাহার কলি এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের শাহাজাদী আফজালী শম্পা। দলীয় কাজ শেষে দলীয় কাজ উপস্থাপন করে প্রতিটি দল। এসময় ফ্যাসিলিটেটর ছিলেন ওয়াইডাব্লিউসিএ অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হেলেন মনীষা সরকার।

দলীয় কাজ শেষে সমাপনী অধিবেশনে বক্তব্য দেন বিশেষ অতিথি ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ গীতাঞ্জলি সিং। আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক-এর ফাল্গুনী ত্রিপুরা; ডিজিটাল রাইটস এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ চৌধুরী; আ্যড সালামা আলী, উপদেষ্টা বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা অ্যাড.সালমা আলী।

দলীয় কাজ উপস্থাপন শেষে সমাপনী অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ গীতাঞ্জলি সিং বলেন; সি এস ডব্লিউ এর ৭০ তম অধিবেশন সহ বিভিন্ন জাতীয় ও বৈশ্বিক আলোচনায় নারী আন্দোলন নিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত হচ্ছে । তবে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের কোথাও সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়িত হচ্ছেনা। সেজন্য সময় অনুসারে অ্যাডভোকেসি পদ্ধতি ও কৌশল পরিবর্তন নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে; ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে; আমাদের সুপারিশগুলো আমাদের চিন্তার প্রতিফলন। সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব কমেছে।

আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক-এর ফাল্গুনী ত্রিপুরা বলেন, আদিবাসী ও প্রান্তিক ও দলিত নারীদেও নিয়ে আলোচনায় গুরুত্ব দিতে হবে অনেকসময় অনিচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টি বাদ পড়ে যায়। ১৩২৫ নম্বর রেজুলুশনে আদিবাসী –ইস্যু যুক্ত হয়েছে, এখানে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজের বিষয়ে ভাবতে হবে।

ডিজিটাল রাইটস এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ চৌধুরী বলেন, আজকের কর্মশালায় উত্থাপিত বিষয়গুলোর সাথে প্রযুক্তির সংযোগ আছে, অধিকার ও বৈষম্যের সম্পর্ক আছে এটি সকলকে বুঝতে হবে। এতে আন্দোলন শক্তিশালী হবে এবং সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির কাজগুলোর মাধ্যমে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা অ্যাড.সালমা আলী বলেন, এখন অনেক নারী বিচারক থাকলেও থানাগুলো নারীবান্ধব নয়। নারী কমিশন, শিশুদের জন্য গঠিত কমিশন অনেক ভালোভাবে কাজ করছে। আগামী ৬ মাস থেকে ০১ বছরে যেসকল কাজ করা হবে তা দৃশ্যমান হোক- আমাদের সেই অঙ্গীকার করতে হবে। বৈষম্য নিরসনে প্রতিকার, প্রতিরোধ ও লিগ্যাল এ্যাকশনের ক্ষেত্রে কিভাবে কাজ করা হবে তার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি এসময়।

সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি ২৪ বছর যাবৎ নারীর মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করছে। এই কমিটির কাজের মধ্য দিয়ে নারী আন্দোলন সামাজিক শক্তি হিসেবে গড়ে উঠেছে। নারী যত অগ্রসর হচ্ছে তত বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তার সামনে আসছে। এসব মোকাবেলা করে নারী আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির মাধ্যমে সকল সংগঠনগুলোকে একত্রিত করে এই বাধাসমূহ দূর করার জন্য কৌশল নির্ধারণের উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, ৫৫ বছরে কি কাজ করলাম এটা অনেকের প্রশ্ন । আমি কখনও হতাশ হইনি, বরং এগিয়ে যাচ্ছি। তিনি এসময় নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নীতিমালা গ্রহণ ও নীতিমালা বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার গুরুত্ব উল্লেখ করে আবারও সেই আলোকে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের উপর জোর দিতে সকলকে আহ্বান জানান।

উদ্বোধনী অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্যে নিজেরা করির সমন্বয়ক খুশী কবির বলেন, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি আমাদের সকলের। এখানে সবাই অংশগ্রহণ না করলে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি প্রাণটা হারিয়ে ফেলে। কমিটির কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও মতামত প্রদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগের সময়গুলোতে বাংলাদেশে একটা ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি তেমন নেই। তিনি এসময় বলেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে এখন সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে, অনেক আন্দোলন হচ্ছে তবুও নারীর প্রতি সহিংসতা কমছে না। এমতাবস্থায় সমাধান না পেলেও আমরা সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করলে নারীর অগ্রযাত্রার পথে থাকা অন্যতম বাধা সহিংসতা মোকাবেলায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করি।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অ্যাডভোকেসি ও নেটওয়ার্কিং পরিচালক জনা গোস্বামী বলেন, আজকের কর্মশালা আয়োজনের উদ্দেশ্যে হচ্ছে বর্তমান বাস্তবতায় নারীর মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংক্রান্ত অগ্রাধিকার ভিত্তিক ইস্যূগুলো চিহ্নিত করা। সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির শক্তি, সীমাবদ্ধতা, সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ও বাসÍবসম্মত কৌশল ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। প্ল্যাটফরমের সদস্য ও সদস্য সংগঠনের মধ্যে সমন্বয়, অংশগ্রহণ, পারস্পারিক সৌহার্দ্য ও শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি করা। আমরা আশা করি আজকের কর্মশালার মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত মতামত ও সুপারিশসমূহ নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সম্মিলিত উদ্যোগকে আরও জোরদার করবে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহ সভাপতি রেখা চৌধুরী সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গঠনের প্রেক্ষাপট আলোচনায় বলেন, যেকোন রাজনৈতিক, সামাজিক এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় নারীরা বেশি নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হন। নারীর প্রতি নির্যাতন প্রতিরোধে ১৯৯৪ সনে নারী নেত্রীদের আহবানে সম্মিলিত নারী সমাজ নামে একটি প্ল্যাটফরম গঠন করা হলো। এই প্ল্যাটফরমের সদস্যবৃন্দ যেকোন নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনায় একজোট হয়ে কাজ করেছে; সকল মানবাধিকার সংগঠনকে একত্রিত করার চেষ্টা করেছে। পরবর্তীতে ২০০২ সনে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করার পরও আমরা এখন পর্যন্ত একসাথে কাজ করছি। দীর্ঘ সময়ের কাজের ধারাবাহিকতায় নারী বান্ধব অনেক আইন প্রণয়ণ করা হলেও দেশে এখনও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে ও নারী আন্দোলনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় পদক্ষেপ গ্রহণে আজকের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সকলের সম্মিলিত মতামত সহায়ক ভ’মিকা পালন করবে।

প্রাগ্রসরের এর নির্বাহী পরিচালক ফৌজিয়া খন্দকার ইভা বলেন, নারী আন্দোলন গড়ে তোলার সাথে সম্পৃক্ত মোর্চাগুলোর সাথে কোন না কোনভাবে যুক্ত থাকার ফলে আমাদের শক্তি বেড়েছে। প্রাপ্তিও এসেছে । বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দীর্ঘসময়ের পদযাত্রায় কাজ এগিয়ে নিয়ে গেছে, এই যাত্রা সহজ নয়। নারী আন্দোলনের মধ্যেই শক্তির সৌরভ ছড়িয়ে আছে; ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সৌরভ ছড়িয়ে আছে। তবে নারী আন্দোলন শক্তিশালী ভাবে এগিয়ে নিতে পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠমোকে সংঘবদ্ধভাবে ও কৌশলগতভাবে নিরসন করতে হবে; আদর্শিক জায়গাত সংঘাত না হলে একত্রিত হতে হবে; রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক ও শ্রম বাজারের বৈষম্য দূর করতে হবে; অর্ন্তভ’ক্তিমূলক অংশগ্রহণে নিশ্চিতের প্রতি জোর দিতে হবে; নারী আন্দোলন উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত নারীর-এই ভাবনা খন্ডন করতে হবে; নারী সংগঠনগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা জোরদার সহ তরুণদের যুক্ত করার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

উক্ত কৌশলগত পরিকল্পনা বিষয়ক কর্মশালায় সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির ২৮ টি সংগঠনের প্রতিনিধি, ইউএনউইমেন বাংলাদেশ এর প্রতিনিধিবৃন্দ এবং যশোর, চট্টগ্রাম, রংপুর; দিনাজপুর; বাগেরহাট, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ এবং টঙ্গী জেলার তৃণমূলের সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির সদস্যবৃন্দসহ ৯০জন উপস্থিত ছিলেন।