ধর্ষণের পর গামছায় শ্বাসরোধে তাজমিন হত্যা
- সর্বশেষ আপডেট ১০:৫৫:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
- / 21
কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৩) ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার অটোরিকশাচালক মো. সুমন ছাড়া অন্য কেউ জড়িত ছিলেন না বলেও জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনের প্রতি লোভ হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ হতে পারে। সুমনকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেলে ফোনটি উদ্ধার করা হয়। ফোনের কললিস্ট, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে পুলিশ।
বাসা থেকে বেরিয়ে দুই জেলা ঘুরে কুমিল্লায়
পুলিশ জানায়, গত ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তাজমিন। পরিবারের সদস্যদের সে জানিয়েছিল, বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে যাচ্ছে। পরে তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে, ওই দিন সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়েছিল। পরদিন কুমিল্লায় ফিরে আবার কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে তাজমিন। ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজে তাকে একটি গাড়ি থেকে একা নামতে দেখা যায়। আশপাশের ক্যামেরার ফুটেজেও তার হাতে মোবাইল ফোন ও কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ দেখা গেছে। এরপর তাকে সড়কের দিকে চলে যেতে দেখা গেলেও পরবর্তী গতিবিধি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার মতো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
অটোরিকশায় ওঠার পর হত্যাকাণ্ড
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় ফেরার জন্য তাজমিন একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে। চালক সুমন তার হাতে থাকা আইফোনটি দেখতে পান। এরপর শহরের পথে না গিয়ে অটোরিকশাটি অন্য পথে নিয়ে যান বলে তদন্তে উঠে আসে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তাজমিনকে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে সুমন একাই জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার মরদেহ
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের পাশ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাও জব্দ করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ধানক্ষেতের পাশে অটোরিকশাটি পড়ে থাকতে দেখে তারা ঘটনাস্থলের আশপাশে খোঁজাখুঁজি করেন। সেখানে ধস্তাধস্তি ও দৌড়াদৌড়ির আলামতও দেখতে পান তারা। পরে সামনের একটি ধানক্ষেতে তাজমিনের মরদেহ দেখতে পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেন।
পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
অটোরিকশার সূত্র ধরে গ্রেপ্তার সুমন
মরদেহের পাশ থেকে উদ্ধার করা অটোরিকশাটির নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে এর মালিক হিসেবে লালমাই উপজেলার আবুল হাসেমকে শনাক্ত করে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, অটোরিকশাটি ভাড়ায় চালাতেন মো. সুমন।
সুমন লালমাই উপজেলার বাগমারা ইউনিয়নের জয়নগর এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন। পরে তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালিয়ে শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে আটক করে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়।
সুমনের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়। কয়েক বছর আগে বিয়ের পর ঘরজামাই হিসেবে লালমাইয়ের জয়নগর গ্রামে বসবাস শুরু করেন তিনি। প্রায় এক মাস আগে পারিবারিক বিরোধের জেরে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যান বলে জানা গেছে।
আইফোন ঘিরে তদন্ত
তাজমিন কেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে গিয়েছিল, সেখানে কার সঙ্গে দেখা করেছিল এবং কুমিল্লায় ফিরে কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। উদ্ধার হওয়া আইফোনের কললিস্ট ও অন্যান্য তথ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তার চলাফেরা ও যোগাযোগের সূত্র যাচাই করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, আইফোনের প্রতি লোভ হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হিসেবে সামনে এসেছে। তবে ঘটনার পেছনের কারণ ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সম্পর্কে পুলিশের বিস্তারিত বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়েছে।
ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার তাজমিনের মরদেহ যশোরের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।































