ঢাকা ০৬:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘এসআরবি’ জ্যাকেটে অপহরণ, সাবেক র‍্যাব সদস্য গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
  • সর্বশেষ আপডেট ০৪:৫৩:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
  • / 19

‘এসআরবি’ জ্যাকেটে অপহরণ, সাবেক র‍্যাব সদস্য গ্রেপ্তার

চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণের পর প্রায় পাঁচ দিন আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় তার চোখ ও দুই হাত পেছনে বাঁধা রাখা হয়। অপহরণকারীরা পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। পরে কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশ থেকে ওই ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় চাকরিচ্যুত সাবেক র‍্যাব সদস্যসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া ব্যবসায়ীর নাম মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসান। তিনি বাঁশখালীর পুঁইছড়ি প্রেমবাজারে মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি হার্ডওয়্যারের দোকান পরিচালনা করেন। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত সাড়ে আটটার দিকে নিজের দোকান থেকে তাকে অপহরণ করা হয়। বুধবার (২১ অক্টোবর) ভোর চারটার দিকে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বাঁশখালী থানা-পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।

পুলিশ ও ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন কালো পোশাকের ওপর ‘এসআরবি’ লেখা জ্যাকেট পরা চার ব্যক্তি দোকানে প্রবেশ করেন। তাদের মাথায় ক্যাপ ও মুখে মাস্ক ছিল। নিজেদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে তারা হাসানকে জানান, তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে এবং তাদের সঙ্গে যেতে হবে। এরপর তার দুই হাত পেছনে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেওয়া হয়। পরে কয়েক দফায় যানবাহন পরিবর্তন করে তাকে কক্সবাজারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

অপহরণের পর হাসানের স্ত্রী ও দোকানের ব্যবস্থাপকের কাছে ফোন করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অপহরণকারীরা ভিওআইপি নম্বর ব্যবহার করায় শুরুতে তাদের শনাক্ত করতে তদন্তকারীদের বেগ পেতে হয়।

পরে দোকান থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং স্থানীয় সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। এর ধারাবাহিকতায় ২০ অক্টোবর কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫-সংলগ্ন এলাকায় হাসানের অবস্থান শনাক্ত করা হয়।

পুলিশ জানায়, ক্যাম্পের ভেতরে সরাসরি অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কৌশল অবলম্বন করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দিয়ে সেখানে থাকা সহযোগীদের ফোন করানো হয়। মুক্তিপণের টাকা পাওয়া গেছে এবং হাসানকে ফেরত দিতে হবে—এমন কথা বলে তাকে ক্যাম্পের বাইরে আনা হয়। পরে বুধবার ভোরে তাকে উদ্ধার করা হয়।

উদ্ধারের পর হাসান পুলিশকে জানান, অপহরণকারীরা তাকে বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে মারধর করেন। পুরো সময় তার চোখ ও হাত বাঁধা ছিল। প্রায় পাঁচ দিনের মধ্যে তাকে মাত্র একবার খাবার দেওয়া হয়। পুলিশ নিজেদের পরিচয় দেওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, অপহরণকারীদের কবল থেকে মুক্ত হয়েছেন।
সাবেক র‍্যাব সদস্যসহ গ্রেপ্তার ৬
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন সুমন মুন্সি, মিজানুর রহমান, জয়নাল উদ্দিন, দেলোয়ার হোসেন, আব্বাস উদ্দিন এবং ছলিম ওরফে সেলিম। তাদের মধ্যে সুমন মুন্সি সাবেক র‍্যাব সদস্য। অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২১ সালে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, সুমন মুন্সি বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের নিয়ে একটি চক্র গড়ে তোলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ভুয়া ‘এসআরবি’ পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা করতেন তিনি বলে পুলিশের দাবি।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রের সদস্যরা সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের আর্থিক অবস্থা ও চলাফেরার তথ্য সংগ্রহ করে সুমনকে জানাতেন। আব্বাস উদ্দিন স্থানীয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৬-এর বাসিন্দা ছলিম ওরফে সেলিম ক্যাম্পের ভেতরে যোগাযোগ ও সমন্বয়ে সহায়তা করতেন বলে মনে করছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে অপহরণে ব্যবহৃত একটি ব্যক্তিগত গাড়ি, ‘এসআরবি’ লেখা পাঁচটি কালো জ্যাকেট, দুটি ভুয়া পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করা হয়েছে।

পুলিশ আরও জানায়, সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্র আইনে ১৩টি মামলা রয়েছে। জয়নাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে তিনটি, ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে দুটি এবং আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে কেউ কাউকে নিয়ে যেতে চাইলে আগে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া জরুরি। সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে আশপাশের লোকজনের সহায়তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি। ব্যবসায়ী হাসানকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করাকে অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য বলে উল্লেখ করেন পুলিশ সুপার।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

‘এসআরবি’ জ্যাকেটে অপহরণ, সাবেক র‍্যাব সদস্য গ্রেপ্তার

সর্বশেষ আপডেট ০৪:৫৩:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণের পর প্রায় পাঁচ দিন আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় তার চোখ ও দুই হাত পেছনে বাঁধা রাখা হয়। অপহরণকারীরা পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। পরে কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশ থেকে ওই ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় চাকরিচ্যুত সাবেক র‍্যাব সদস্যসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া ব্যবসায়ীর নাম মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসান। তিনি বাঁশখালীর পুঁইছড়ি প্রেমবাজারে মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি হার্ডওয়্যারের দোকান পরিচালনা করেন। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত সাড়ে আটটার দিকে নিজের দোকান থেকে তাকে অপহরণ করা হয়। বুধবার (২১ অক্টোবর) ভোর চারটার দিকে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বাঁশখালী থানা-পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।

পুলিশ ও ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন কালো পোশাকের ওপর ‘এসআরবি’ লেখা জ্যাকেট পরা চার ব্যক্তি দোকানে প্রবেশ করেন। তাদের মাথায় ক্যাপ ও মুখে মাস্ক ছিল। নিজেদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে তারা হাসানকে জানান, তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে এবং তাদের সঙ্গে যেতে হবে। এরপর তার দুই হাত পেছনে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেওয়া হয়। পরে কয়েক দফায় যানবাহন পরিবর্তন করে তাকে কক্সবাজারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

অপহরণের পর হাসানের স্ত্রী ও দোকানের ব্যবস্থাপকের কাছে ফোন করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অপহরণকারীরা ভিওআইপি নম্বর ব্যবহার করায় শুরুতে তাদের শনাক্ত করতে তদন্তকারীদের বেগ পেতে হয়।

পরে দোকান থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং স্থানীয় সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। এর ধারাবাহিকতায় ২০ অক্টোবর কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫-সংলগ্ন এলাকায় হাসানের অবস্থান শনাক্ত করা হয়।

পুলিশ জানায়, ক্যাম্পের ভেতরে সরাসরি অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কৌশল অবলম্বন করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দিয়ে সেখানে থাকা সহযোগীদের ফোন করানো হয়। মুক্তিপণের টাকা পাওয়া গেছে এবং হাসানকে ফেরত দিতে হবে—এমন কথা বলে তাকে ক্যাম্পের বাইরে আনা হয়। পরে বুধবার ভোরে তাকে উদ্ধার করা হয়।

উদ্ধারের পর হাসান পুলিশকে জানান, অপহরণকারীরা তাকে বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে মারধর করেন। পুরো সময় তার চোখ ও হাত বাঁধা ছিল। প্রায় পাঁচ দিনের মধ্যে তাকে মাত্র একবার খাবার দেওয়া হয়। পুলিশ নিজেদের পরিচয় দেওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, অপহরণকারীদের কবল থেকে মুক্ত হয়েছেন।
সাবেক র‍্যাব সদস্যসহ গ্রেপ্তার ৬
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন সুমন মুন্সি, মিজানুর রহমান, জয়নাল উদ্দিন, দেলোয়ার হোসেন, আব্বাস উদ্দিন এবং ছলিম ওরফে সেলিম। তাদের মধ্যে সুমন মুন্সি সাবেক র‍্যাব সদস্য। অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২১ সালে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, সুমন মুন্সি বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের নিয়ে একটি চক্র গড়ে তোলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ভুয়া ‘এসআরবি’ পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা করতেন তিনি বলে পুলিশের দাবি।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রের সদস্যরা সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের আর্থিক অবস্থা ও চলাফেরার তথ্য সংগ্রহ করে সুমনকে জানাতেন। আব্বাস উদ্দিন স্থানীয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৬-এর বাসিন্দা ছলিম ওরফে সেলিম ক্যাম্পের ভেতরে যোগাযোগ ও সমন্বয়ে সহায়তা করতেন বলে মনে করছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে অপহরণে ব্যবহৃত একটি ব্যক্তিগত গাড়ি, ‘এসআরবি’ লেখা পাঁচটি কালো জ্যাকেট, দুটি ভুয়া পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করা হয়েছে।

পুলিশ আরও জানায়, সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্র আইনে ১৩টি মামলা রয়েছে। জয়নাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে তিনটি, ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে দুটি এবং আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে কেউ কাউকে নিয়ে যেতে চাইলে আগে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া জরুরি। সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে আশপাশের লোকজনের সহায়তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি। ব্যবসায়ী হাসানকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করাকে অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য বলে উল্লেখ করেন পুলিশ সুপার।