ক্ষেপণাস্ত্র সংকটে যুক্তরাষ্ট্র
- সর্বশেষ আপডেট ১০:৪৯:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
- / 59
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) হোয়াইট হাউসের কাছে ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকৃত মজুতসংক্রান্ত তথ্য পুরোপুরি প্রকাশ করছে না—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের একাধিক বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা।
তাদের দাবি, প্রতিরক্ষা দপ্তরের অভ্যন্তরে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে নেতিবাচক বা উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরতে অনীহা দেখা দিচ্ছে। এ নিয়ে হোয়াইট হাউসের ভেতরেও উদ্বেগ বাড়ছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ মঙ্গলবার (২১ জুলাই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। সাম্প্রতিক হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর কঠোর জবাব দেওয়ার চাপ বেড়েছে। তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাওয়ার খবর প্রশাসনের ভেতরে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে বাস্তব পরিস্থিতি বা ‘খারাপ খবর’ তুলে ধরলে তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না। আরেক কর্মকর্তা দাবি করেন, পেন্টাগনে তৈরি হওয়া এই ‘নীরবতার সংস্কৃতি’ প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করছে।
গত মার্চে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট (রুসি) এক বিশ্লেষণে জানায়, সংঘাতের প্রথম ১৬ দিনেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ১১ হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও বিভিন্ন ধরনের গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। একই হারে ব্যবহার অব্যাহত থাকলে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। জর্ডানে দুটি এবং ইরাকে একজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর তিনি বলেন, কোনো মার্কিন সেনা নিহত হলে তার জবাব আরও কঠোরভাবে দেওয়া হবে। এ বিষয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইনসহ সামরিক নেতৃত্বকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত এফ-৩৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার বিমান মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। একই সময়ে ইরানের বন্দর আব্বাসের আশপাশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতেও হামলা চালানো হয়েছে। এতে উপকূলীয় সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরের লক্ষ্যবস্তুতেও অভিযান সম্প্রসারণের ইঙ্গিত মিলছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পেন্টাগনের ভেতরে এমন আশঙ্কাও রয়েছে যে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে। অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তার দেশ কার্যত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো থাড ও প্যাট্রিয়ট প্যাক-৩ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত। ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের গবেষক রায়ান ব্রোবস্ট বলেন, প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমে গেলে সেনাদের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। সাধারণত একটি শত্রু ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে দুটি ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা হয়। কিন্তু মজুত সীমিত হলে একটি দিয়েই প্রতিরোধের চেষ্টা করতে হয়, যা সফলতার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র পর টমাহক ও থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতায় টমাহকের মজুত আগের অবস্থায় ফিরতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত এবং থাডের ক্ষেত্রে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
মার্কিন সামরিক অস্ত্রের মজুতসংক্রান্ত তথ্য অত্যন্ত গোপনীয় হওয়ায় হাতে গোনা কয়েকজন কর্মকর্তাই এ বিষয়ে অবগত থাকেন। ফলে হোয়াইট হাউস ও শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাচ্ছেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের নেতৃত্বে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে কর্মকর্তারা নেতিবাচক তথ্য তুলে ধরতে ভয় পান। তার ভাষায়, পেন্টাগন হোয়াইট হাউসের সঙ্গে কতটা স্বচ্ছতা বজায় রাখছে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
আরেক কর্মকর্তা দাবি করেন, হেগসেথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিধি সীমিত কয়েকজন উপদেষ্টার মধ্যে আটকে ফেলেছেন। এতে প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দেওয়া কিংবা কংগ্রেসে বক্তব্য দেওয়ার সময়ও সব তথ্য তার কাছে পৌঁছায় না।
এদিকে ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, বৃহত্তর সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি থাকলেও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও দূরপাল্লার গোলাবারুদের সীমিত মজুত বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই বলেও তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, গত সপ্তাহে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে চালানো তিনটি হামলার তথ্যও পেন্টাগন প্রকাশ করেনি। ওই হামলাগুলোতে কয়েকজন সেনা আহত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি সামরিক হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে পেন্টাগন। সংস্থাটির প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল বলেন, হতাহতের তথ্য গোপনের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তার দাবি, তিন মার্কিন সেনার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি ছড়াতেই এসব অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিচ্ছে না—এ অভিযোগ তুলে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা ১ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট-সংক্রান্ত বিলের অগ্রগতি সাময়িকভাবে আটকে দিয়েছেন।
অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অস্ত্র বা গোলাবারুদের কোনো সংকট নেই। তার ভাষ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সব কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনের চেয়েও বেশি অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও বেশি অস্ত্র উৎপাদনের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।



































