ঢাকা ০২:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সীমান্তে পুশ ইন রুখে দিল বিজিবি

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:৪৮:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
  • / 72

সীমান্তে ‘পুশ ইন’ উত্তেজনা

ভারত থেকে অবৈধ পন্থায় বাংলাদেশের দিকে জোরপূর্বক লোকজনকে ঠেলে দেওয়ার (পুশ ইন) ঘটনাকে কেন্দ্র করে সীমান্ত পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। গত বুধবার (৩ জুন) সকাল থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত মাত্র ২৪ ঘণ্টায় দেশের সীমান্ত এলাকার ১০টি পৃথক পয়েন্ট দিয়ে অন্তত ১৩০ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা চালিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের অতন্দ্র প্রহরা ও কঠোর অবস্থানের মুখে বিএসএফের এই অপচেষ্টাগুলো সম্পূর্ণ নস্যাৎ হয়ে গেছে। এই আকস্মিক ও ব্যাপক অনুপ্রবেশের চেষ্টা দুই দেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং বড় ধরণের ফাটল ধরাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে স্থানীয় জনতাকে সাথে নিয়ে পাহারা জোরদার করেছে বিজিবি।

বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের পশ্চিম, উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত দিয়ে এই পুশ ইনের ঘটনাগুলো ঘটানো হয়েছে:

  • ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত: ৫৮ বিজিবির আওতাধীন সামন্তা বিওপি এলাকায় বিএসএফ একটি প্রিজন ভ্যানে করে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ জনকে নিয়ে এসে সীমান্তের গেট খুলে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসী মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুললে বিএসএফ তাদের পুনরায় ভ্যানে তুলে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
  • চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাঙ্গাবাড়ী সীমান্ত: গোমস্তাপুর উপজেলার এই সীমান্তে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে ১২ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের আশরাফপুর ক্যাম্পের সদস্যরা ১২ জন পুরুষ, ১০ জন নারী এবং ৬টি শিশুকে পুশ ইন করানোর চেষ্টা করলে বিজিবি তাদের শূন্য রেখায় (নো ম্যানস ল্যান্ড) আটকে দেয়। এই ২৮ জন ব্যক্তি বর্তমানে সীমান্তে খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
  • অন্যান্য সীমান্ত পয়েন্ট: যশোরের গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্ত দিয়ে বেশ কিছু নারী-পুরুষকে পুশ ইনের চেষ্টা করা হয়। এছাড়া জয়পুরহাটের কয়া ও বাসুদেবপুর সীমান্তের বিপরীতে ১০ জন এবং নেত্রকোনার কচুগড়া সীমান্তে ১৫ থেকে ২০ জনকে পুশ ইনের উদ্দেশ্যে জড়ো করা হলেও বিজিবির কঠোর নজরদারির কারণে বিএসএফ পিছু হটতে বাধ্য হয়।

সীমান্তের এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ১৫ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। বিজিবির একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, এই সম্মেলনে পুশ ইনের অপচেষ্টা, নো ম্যানস ল্যান্ডে ভারতের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং সীমান্ত হত্যার বিষয়গুলো বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কড়া প্রতিবাদ জানানো হবে।

ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর প্রধান কিরীটী রায় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই জোরপূর্বক পুশ ইনকে সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করেছে। তাঁদের মতে, পরিচয় নিশ্চিত না করে কাউকে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া যায় না; কেউ অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করলে তাকে চিহ্নিত করে আদালতের মাধ্যমে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোই আইনি পদ্ধতি।

এই বিষয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, সরকার অবৈধ পুশ ইনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, ভারতের তরফ থেকে যদি দাবি করা হয় যে কোনো বাংলাদেশি সেখানে অবৈধভাবে আছে, তবে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার পর যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা (রিপ্যাট্রিয়েশন) হবে, কিন্তু জোর করে ঠেলে দেওয়া বাংলাদেশ কোনোভাবেই মেনে নেবে না। বর্তমানে বিজিবির পাশাপাশি পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন সীমান্তের সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিজিরা রাত জেগে সীমান্ত পাহারায় সম্পৃক্ত হয়েছেন। বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন, দেশের sovereignty ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার পরিপন্থী যেকোনো পুশ ইন চেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

সীমান্তে পুশ ইন রুখে দিল বিজিবি

সর্বশেষ আপডেট ১১:৪৮:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬

ভারত থেকে অবৈধ পন্থায় বাংলাদেশের দিকে জোরপূর্বক লোকজনকে ঠেলে দেওয়ার (পুশ ইন) ঘটনাকে কেন্দ্র করে সীমান্ত পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। গত বুধবার (৩ জুন) সকাল থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত মাত্র ২৪ ঘণ্টায় দেশের সীমান্ত এলাকার ১০টি পৃথক পয়েন্ট দিয়ে অন্তত ১৩০ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা চালিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের অতন্দ্র প্রহরা ও কঠোর অবস্থানের মুখে বিএসএফের এই অপচেষ্টাগুলো সম্পূর্ণ নস্যাৎ হয়ে গেছে। এই আকস্মিক ও ব্যাপক অনুপ্রবেশের চেষ্টা দুই দেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং বড় ধরণের ফাটল ধরাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে স্থানীয় জনতাকে সাথে নিয়ে পাহারা জোরদার করেছে বিজিবি।

বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের পশ্চিম, উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত দিয়ে এই পুশ ইনের ঘটনাগুলো ঘটানো হয়েছে:

  • ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত: ৫৮ বিজিবির আওতাধীন সামন্তা বিওপি এলাকায় বিএসএফ একটি প্রিজন ভ্যানে করে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ জনকে নিয়ে এসে সীমান্তের গেট খুলে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসী মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুললে বিএসএফ তাদের পুনরায় ভ্যানে তুলে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
  • চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাঙ্গাবাড়ী সীমান্ত: গোমস্তাপুর উপজেলার এই সীমান্তে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে ১২ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের আশরাফপুর ক্যাম্পের সদস্যরা ১২ জন পুরুষ, ১০ জন নারী এবং ৬টি শিশুকে পুশ ইন করানোর চেষ্টা করলে বিজিবি তাদের শূন্য রেখায় (নো ম্যানস ল্যান্ড) আটকে দেয়। এই ২৮ জন ব্যক্তি বর্তমানে সীমান্তে খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
  • অন্যান্য সীমান্ত পয়েন্ট: যশোরের গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্ত দিয়ে বেশ কিছু নারী-পুরুষকে পুশ ইনের চেষ্টা করা হয়। এছাড়া জয়পুরহাটের কয়া ও বাসুদেবপুর সীমান্তের বিপরীতে ১০ জন এবং নেত্রকোনার কচুগড়া সীমান্তে ১৫ থেকে ২০ জনকে পুশ ইনের উদ্দেশ্যে জড়ো করা হলেও বিজিবির কঠোর নজরদারির কারণে বিএসএফ পিছু হটতে বাধ্য হয়।

সীমান্তের এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ১৫ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। বিজিবির একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, এই সম্মেলনে পুশ ইনের অপচেষ্টা, নো ম্যানস ল্যান্ডে ভারতের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং সীমান্ত হত্যার বিষয়গুলো বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কড়া প্রতিবাদ জানানো হবে।

ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর প্রধান কিরীটী রায় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই জোরপূর্বক পুশ ইনকে সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করেছে। তাঁদের মতে, পরিচয় নিশ্চিত না করে কাউকে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া যায় না; কেউ অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করলে তাকে চিহ্নিত করে আদালতের মাধ্যমে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোই আইনি পদ্ধতি।

এই বিষয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, সরকার অবৈধ পুশ ইনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, ভারতের তরফ থেকে যদি দাবি করা হয় যে কোনো বাংলাদেশি সেখানে অবৈধভাবে আছে, তবে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার পর যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা (রিপ্যাট্রিয়েশন) হবে, কিন্তু জোর করে ঠেলে দেওয়া বাংলাদেশ কোনোভাবেই মেনে নেবে না। বর্তমানে বিজিবির পাশাপাশি পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন সীমান্তের সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিজিরা রাত জেগে সীমান্ত পাহারায় সম্পৃক্ত হয়েছেন। বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন, দেশের sovereignty ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার পরিপন্থী যেকোনো পুশ ইন চেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।