ঢাকা ১২:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যৌথ দায়িত্বে কেয়ার, নীতিতে বদলের ডাক

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৯:২৫:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
  • / 21

মানুষের কল্যাণে বিনা পারিশ্রমিকে সেবা প্রদান এখনো স্বীকৃত নয়। যা নীতিনির্ধারণে উপেক্ষিত এবং জিডিপির বাইরে । কেয়ারের দায়িত্ব শুধু নারী বা পুরুষের নয়—এটি সবার যৌথ দায়িত্ব হওয়া উচিত। এজন্য আমাদের মানসিকতার পাশাপাশি নীতিগত পরিবর্তন আনতে হবে। যাতে সত্যিকারের ৫০-৫০ দায়িত্ব নিশ্চিত করা যায়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার নারীদের ক্ষমতায়নে কাজ করছে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যাতে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারেন।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর হোটেলে জেন্ডার সমতা, সম্মানজনক সেবামূলক কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ইউএন উইমেন এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) যৌথভাবে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় (এমওডব্লিউসিএ), শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (এমওএলই) এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের (এমওএসডব্লিউ) সমন্বয়ে দিনব্যাপী আয়োজিত ‘জাতীয় সেবা সম্মেলন ২০২৬’ এ বক্তারা একথা বলেন।

বক্তারা বলেন, বেতনভুক্ত কেয়ারও অবমূল্যায়িত, কম পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত এবং প্রায়ই অদক্ষ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। আমরা সবাই জানি—বেতনভুক্ত বা অবৈতনিক—অধিকাংশ কেয়ার কাজই নারী ও কিশোরীরা করে থাকেন।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, নারীর কর্মসংস্থান এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের লক্ষ্যে দেশের সেবামূলক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন অংশীদার, নীতিনির্ধারক, শ্রমিক প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ এবং সুশীল সমাজের নেতাদের একত্রিত করে বাংলাদেশ ‘জাতীয় সেবা সম্মেলন ২০২৬’ আহ্বান করা হয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ৫০ শতাংশে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ৪২.৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবুও বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বাধা রয়ে গেছে, যার মধ্যে রয়েছে অবৈতনিক পরিচর্যার কাজে অসম বণ্টন, স্বল্প কর্মসংস্থান, মজুরির বৈষম্য এবং অনানুষ্ঠানিক কাজে নারীদের কেন্দ্রীভূত অবস্থান।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে ইউএন উইমেন বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং সেবা পরিচর্যা ব্যবস্থায় বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরেন। যা নারী ও পরিবারের জন্য সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি কেয়ার পরিচর্যার কাজকে স্বীকৃতি, পুনর্বণ্টন ও পুরস্কৃত করবে।

গীতাঞ্জলি সিং তাঁর বক্তব্যে বলেন, “সেবামূলক কাজের (অবৈতনিক ও বেতনভুক্ত) অবমূল্যায়ন এবং জেন্ডারভিত্তিক বিভাজন জেন্ডার বৈষম্যের অন্যতম প্রধান কারণ। সেবা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ নারী, সমাজ এবং অর্থনীতির জন্য ত্রিমুখী লাভজনক। যেহেতু নারীদের সময়ের পরিমাণ কমে আসে, তাই আরও বেশি নারী শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন, সেখানে টিকে থাকেন। অন্যদিকে সেবা খাতে বিনিয়োগ মানব উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য হ্রাস এবং সমাজের কল্যাণে দীর্ঘমেয়াদী সুফল বয়ে আনে।”

আইএলও এবং এডিবি-র মূল বক্তাদের মতে, কীভাবে কেয়ার ব্যবস্থায় বিনিয়োগ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিয়ে আসে। আইএলও-র হিসাব অনুযায়ী, শিশু ও দীর্ঘমেয়াদী কেয়ার সার্বজনীন বিনিয়োগের মাধ্যমে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৭০ লাখেরও বেশি সম্মানজনক সেবামূলক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। যা কর্মসংস্থান ও আয়ের ক্ষেত্রে জেন্ডারভিত্তিক ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে।

বাংলাদেশ আইএলও-র কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন এর সঞ্চালনায় জাতীয় পর্যায়ের সংলাপে অংশ নেন নারী ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, এমপি; এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, এমপি।

আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন এমপি বলেন, “সেবাকে শুধুমাত্র নারীদের কাজের বোঝা হিসেবে নয়, একটি যৌথ দায়িত্ব হিসেবে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছি। জাতীয় সমৃদ্ধির জন্য আমাদের কর্মশক্তির পূর্ণ সম্ভাবনাকে উন্মোচন করছি।”

ফারজানা শারমিনএমপি বলেন, “আমাদের অবশ্যই সেবা অর্থনীতিকে উন্নয়নের একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। সেবা খাতকে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলে তা একটি মর্যাদাপূর্ণ ও পেশাদার খাতে পরিণত হবে। যা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বয়ে আনবে এবং বাংলাদেশের নারীদের ক্ষমতায়ন করবে।”

“ কেয়ারকে একটি অদৃশ্য, ব্যক্তিগত দায়িত্ব থেকে জননীতির অগ্রাধিকার হিসেবে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে সরকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জেন্ডার সমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি উন্মোচন করছে। সমাজের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে আমরা মানসম্মত ও সহজলভ্য শিশুযত্ন এবং দীর্ঘমেয়াদী কেয়ার পরিষেবা সম্প্রসারণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

গীতাঞ্জলি সিং এর সঞ্চালনায় “প্রতিশ্রুতি থেকে কর্মে: বাংলাদেশে সেবায় অর্থনীতির অগ্রগতি” শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শবনম মুশতারী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রিন্সিপাল সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অফিসার ( জেন্ডার) নাশিবা সেলিম, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার, অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. তারিকুল ইসলাম খান।

এই অধিবেশনগুলিতে দেশীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে সেবাকর্মীদের পেশাদার করে তোলা, পরিবার থেকে রাষ্ট্রের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য সেবা-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করা এবং সবেতন ছুটি ও স্তন্যপান বিরতির মতো সেবা-সংক্রান্ত অধিকারগুলিকে শ্রম সুরক্ষার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার উপর আলোকপাত করা হয়।

অংশগ্রহণকারীরা বলেন, সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে সম্মানজনক সেবা-সংক্রান্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এই সংস্কারগুলি অপরিহার্য।

অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, বেইজিং ৩০ অ্যাকশন এজেন্ডা সাহসী পদক্ষেপের আহ্বান জানায়। যেখানে দারিদ্র্য কমানো এবং লাখো শোভন কর্মসংস্থান তৈরিতে সামাজিক সুরক্ষা ও উচ্চমানের জনসেবা, যার মধ্যে কেয়ার সেবা ও অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত, কেন্দ্রীয় জায়গায় রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী নারী ও কিশোরীরা পুরুষদের তুলনায় প্রতিদিন ২.৫ গুণেরও বেশি সময় বিনা পারিশ্রমিকের কাজ করেন। বাংলাদেশ ব্যুরো পরিসংখ্যানের এর টাইম-ইউজ জরিপে (ইউএন ওমেন-এর সহায়তায় পরিচালিত) জানা যায়, নারীরা পুরুষদের তুলনায় ৭.৩ গুণ বেশি সময় বিনা পারিশ্রমিকের সেবা ও গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করেন।

 

মো. তারিকুল ইসলাম খান বলেন, এই সেবা খাতটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী কর্মসংস্থানের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র হতে পারে।

এখানে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ এবং এজন্য সঠিক কৌশল ও পরিকল্পনা প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিভিন্ন প্রকল্পে বেসরকারি খাতের জন্য প্রণোদনা দেওয়া হয়। সেই প্রণোদনাগুলোকে শ্রম অধিকার এবং কেয়ার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।

সমাপনী বক্তব্যে বাংলাদেশে এডিবি-র কান্ট্রি ডিরেক্টর হো ইউন জিয়ং উল্লেখ করেন, “আমরা নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালীকরণ, সম্প্রসারণযোগ্য পরীক্ষামূলক বিনিয়োগে সহায়তা এবং আমাদের খাতভিত্তিক কার্যক্রম জুড়ে সেবাকে আরও পদ্ধতিগতভাবে সমন্বিত করার উপর জোর দেন।”

এই সম্মেলনটি মানসম্মত সেবা, শোভন কাজ, জেন্ডার সমতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে এমন একটি সমন্বিত সেবা নীতি কাঠামো প্রণয়নে শক্তিশালী জাতীয় ঐকমত্য তৈরিতে অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই সম্মেলনে একটি ইন্টারেক্টিভ মার্কেটপ্লেসেরও আয়োজন করা হয়। যেখানে বাংলাদেশে বর্তমানে চালু থাকা শিশুযত্ন, দীর্ঘমেয়াদী যত্ন এবং প্রশিক্ষণ পরিষেবার বিদ্যমান মডেলগুলো প্রদর্শন করা হয়।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

যৌথ দায়িত্বে কেয়ার, নীতিতে বদলের ডাক

সর্বশেষ আপডেট ০৯:২৫:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

মানুষের কল্যাণে বিনা পারিশ্রমিকে সেবা প্রদান এখনো স্বীকৃত নয়। যা নীতিনির্ধারণে উপেক্ষিত এবং জিডিপির বাইরে । কেয়ারের দায়িত্ব শুধু নারী বা পুরুষের নয়—এটি সবার যৌথ দায়িত্ব হওয়া উচিত। এজন্য আমাদের মানসিকতার পাশাপাশি নীতিগত পরিবর্তন আনতে হবে। যাতে সত্যিকারের ৫০-৫০ দায়িত্ব নিশ্চিত করা যায়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার নারীদের ক্ষমতায়নে কাজ করছে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যাতে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারেন।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর হোটেলে জেন্ডার সমতা, সম্মানজনক সেবামূলক কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ইউএন উইমেন এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) যৌথভাবে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় (এমওডব্লিউসিএ), শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (এমওএলই) এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের (এমওএসডব্লিউ) সমন্বয়ে দিনব্যাপী আয়োজিত ‘জাতীয় সেবা সম্মেলন ২০২৬’ এ বক্তারা একথা বলেন।

বক্তারা বলেন, বেতনভুক্ত কেয়ারও অবমূল্যায়িত, কম পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত এবং প্রায়ই অদক্ষ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। আমরা সবাই জানি—বেতনভুক্ত বা অবৈতনিক—অধিকাংশ কেয়ার কাজই নারী ও কিশোরীরা করে থাকেন।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, নারীর কর্মসংস্থান এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের লক্ষ্যে দেশের সেবামূলক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন অংশীদার, নীতিনির্ধারক, শ্রমিক প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ এবং সুশীল সমাজের নেতাদের একত্রিত করে বাংলাদেশ ‘জাতীয় সেবা সম্মেলন ২০২৬’ আহ্বান করা হয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ৫০ শতাংশে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ৪২.৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবুও বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বাধা রয়ে গেছে, যার মধ্যে রয়েছে অবৈতনিক পরিচর্যার কাজে অসম বণ্টন, স্বল্প কর্মসংস্থান, মজুরির বৈষম্য এবং অনানুষ্ঠানিক কাজে নারীদের কেন্দ্রীভূত অবস্থান।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে ইউএন উইমেন বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং সেবা পরিচর্যা ব্যবস্থায় বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরেন। যা নারী ও পরিবারের জন্য সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি কেয়ার পরিচর্যার কাজকে স্বীকৃতি, পুনর্বণ্টন ও পুরস্কৃত করবে।

গীতাঞ্জলি সিং তাঁর বক্তব্যে বলেন, “সেবামূলক কাজের (অবৈতনিক ও বেতনভুক্ত) অবমূল্যায়ন এবং জেন্ডারভিত্তিক বিভাজন জেন্ডার বৈষম্যের অন্যতম প্রধান কারণ। সেবা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ নারী, সমাজ এবং অর্থনীতির জন্য ত্রিমুখী লাভজনক। যেহেতু নারীদের সময়ের পরিমাণ কমে আসে, তাই আরও বেশি নারী শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন, সেখানে টিকে থাকেন। অন্যদিকে সেবা খাতে বিনিয়োগ মানব উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য হ্রাস এবং সমাজের কল্যাণে দীর্ঘমেয়াদী সুফল বয়ে আনে।”

আইএলও এবং এডিবি-র মূল বক্তাদের মতে, কীভাবে কেয়ার ব্যবস্থায় বিনিয়োগ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিয়ে আসে। আইএলও-র হিসাব অনুযায়ী, শিশু ও দীর্ঘমেয়াদী কেয়ার সার্বজনীন বিনিয়োগের মাধ্যমে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৭০ লাখেরও বেশি সম্মানজনক সেবামূলক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। যা কর্মসংস্থান ও আয়ের ক্ষেত্রে জেন্ডারভিত্তিক ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে।

বাংলাদেশ আইএলও-র কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন এর সঞ্চালনায় জাতীয় পর্যায়ের সংলাপে অংশ নেন নারী ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, এমপি; এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, এমপি।

আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন এমপি বলেন, “সেবাকে শুধুমাত্র নারীদের কাজের বোঝা হিসেবে নয়, একটি যৌথ দায়িত্ব হিসেবে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছি। জাতীয় সমৃদ্ধির জন্য আমাদের কর্মশক্তির পূর্ণ সম্ভাবনাকে উন্মোচন করছি।”

ফারজানা শারমিনএমপি বলেন, “আমাদের অবশ্যই সেবা অর্থনীতিকে উন্নয়নের একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। সেবা খাতকে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলে তা একটি মর্যাদাপূর্ণ ও পেশাদার খাতে পরিণত হবে। যা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বয়ে আনবে এবং বাংলাদেশের নারীদের ক্ষমতায়ন করবে।”

“ কেয়ারকে একটি অদৃশ্য, ব্যক্তিগত দায়িত্ব থেকে জননীতির অগ্রাধিকার হিসেবে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে সরকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জেন্ডার সমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি উন্মোচন করছে। সমাজের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে আমরা মানসম্মত ও সহজলভ্য শিশুযত্ন এবং দীর্ঘমেয়াদী কেয়ার পরিষেবা সম্প্রসারণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

গীতাঞ্জলি সিং এর সঞ্চালনায় “প্রতিশ্রুতি থেকে কর্মে: বাংলাদেশে সেবায় অর্থনীতির অগ্রগতি” শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শবনম মুশতারী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রিন্সিপাল সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অফিসার ( জেন্ডার) নাশিবা সেলিম, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার, অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. তারিকুল ইসলাম খান।

এই অধিবেশনগুলিতে দেশীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে সেবাকর্মীদের পেশাদার করে তোলা, পরিবার থেকে রাষ্ট্রের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য সেবা-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করা এবং সবেতন ছুটি ও স্তন্যপান বিরতির মতো সেবা-সংক্রান্ত অধিকারগুলিকে শ্রম সুরক্ষার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার উপর আলোকপাত করা হয়।

অংশগ্রহণকারীরা বলেন, সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে সম্মানজনক সেবা-সংক্রান্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এই সংস্কারগুলি অপরিহার্য।

অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, বেইজিং ৩০ অ্যাকশন এজেন্ডা সাহসী পদক্ষেপের আহ্বান জানায়। যেখানে দারিদ্র্য কমানো এবং লাখো শোভন কর্মসংস্থান তৈরিতে সামাজিক সুরক্ষা ও উচ্চমানের জনসেবা, যার মধ্যে কেয়ার সেবা ও অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত, কেন্দ্রীয় জায়গায় রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী নারী ও কিশোরীরা পুরুষদের তুলনায় প্রতিদিন ২.৫ গুণেরও বেশি সময় বিনা পারিশ্রমিকের কাজ করেন। বাংলাদেশ ব্যুরো পরিসংখ্যানের এর টাইম-ইউজ জরিপে (ইউএন ওমেন-এর সহায়তায় পরিচালিত) জানা যায়, নারীরা পুরুষদের তুলনায় ৭.৩ গুণ বেশি সময় বিনা পারিশ্রমিকের সেবা ও গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করেন।

 

মো. তারিকুল ইসলাম খান বলেন, এই সেবা খাতটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী কর্মসংস্থানের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র হতে পারে।

এখানে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ এবং এজন্য সঠিক কৌশল ও পরিকল্পনা প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিভিন্ন প্রকল্পে বেসরকারি খাতের জন্য প্রণোদনা দেওয়া হয়। সেই প্রণোদনাগুলোকে শ্রম অধিকার এবং কেয়ার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।

সমাপনী বক্তব্যে বাংলাদেশে এডিবি-র কান্ট্রি ডিরেক্টর হো ইউন জিয়ং উল্লেখ করেন, “আমরা নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালীকরণ, সম্প্রসারণযোগ্য পরীক্ষামূলক বিনিয়োগে সহায়তা এবং আমাদের খাতভিত্তিক কার্যক্রম জুড়ে সেবাকে আরও পদ্ধতিগতভাবে সমন্বিত করার উপর জোর দেন।”

এই সম্মেলনটি মানসম্মত সেবা, শোভন কাজ, জেন্ডার সমতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে এমন একটি সমন্বিত সেবা নীতি কাঠামো প্রণয়নে শক্তিশালী জাতীয় ঐকমত্য তৈরিতে অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই সম্মেলনে একটি ইন্টারেক্টিভ মার্কেটপ্লেসেরও আয়োজন করা হয়। যেখানে বাংলাদেশে বর্তমানে চালু থাকা শিশুযত্ন, দীর্ঘমেয়াদী যত্ন এবং প্রশিক্ষণ পরিষেবার বিদ্যমান মডেলগুলো প্রদর্শন করা হয়।