ঢাকা ০৪:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
দুর্ভোগে রায়পুরার চরাঞ্চলের মানুষ

৪৮ বছর ধরে ঝুলে আছে কাঁকন নদী সেচ প্রকল্প

শফিকুল ইসলাম, রায়পুরা (নরসিংদী)
  • সর্বশেষ আপডেট ০৩:৪৫:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
  • / 56

সেচ প্রকল্প ঝুলে, দুর্ভোগে রায়পুরার চরাঞ্চল

একটি নদী, একটি প্রকল্প আর দীর্ঘ ৪৮ বছরের অপেক্ষা। ১৯৭৭ সালে নেওয়া হয়েছিল কাঁকন নদী সেচ প্রকল্পের পরিকল্পনা। এরপর কেটে গেছে প্রায় অর্ধশতাব্দী। একের পর এক সরকার বদলেছে, পরিবর্তন এসেছে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনে। কিন্তু এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প।

একইভাবে রায়পুরার মেঘনা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলকে বন্যা ও নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষায় প্রস্তাবিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশন প্রকল্পও আলোর মুখ দেখেনি। ফলে বছরের পর বছর ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন উপজেলার শ্রীনগর, পাড়াতলী, বাঁশগাড়ী, চরমধুয়া, চাঁনপুর ও মির্জারচর ইউনিয়নের দুই লক্ষাধিক মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একদিকে বর্ষায় মেঘনার ভাঙন ও বন্যা, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে তীব্র সেচ সংকট; দুই মৌসুমেই তাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। প্রতিবছর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কবরস্থান। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটে অনেক কৃষক জমি অনাবাদি রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।

৪৮ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি সেচ প্রকল্প

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য ও পুরোনো আবেদনপত্র অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালে কাঁকন নদী সেচ প্রকল্পের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি প্রায় ৭ হাজার ৬১১ হেক্টর এলাকা বন্যার ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষার পরিকল্পনা ছিল।

অন্যদিকে প্রস্তাবিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৪২ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এতে প্রায় ৮ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ও ৮৫০ হেক্টর জলাভূমি রক্ষা করা সম্ভব হতো বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ ও নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে পরিকল্পনা, আবেদন ও উদ্যোগ চললেও প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

শুষ্ক মৌসুমে সেচ সংকট

শুষ্ক মৌসুমে কাঁকন নদী ও আশপাশের খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় সেচের পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সাধারণ শ্যালো মেশিন দিয়েও অনেক জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হয় না।

ফলে সেচের জন্য বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে কৃষকদের। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রান্তিক কৃষক জমি অনাবাদি রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।

চরাঞ্চলে ধান, আলু, বাদাম ও বিভিন্ন ধরনের সবজির ব্যাপক উৎপাদন হয়। পানি ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধান হলে এ অঞ্চলের কৃষি আরও সমৃদ্ধ হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

বর্ষায় নদীভাঙন-বন্যা

শুষ্ক মৌসুমের সেচ সংকটের বিপরীত চিত্র দেখা যায় বর্ষায়। তখন মেঘনার পানি বৃদ্ধি ও নদীভাঙনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে চরাঞ্চল। ফসলি জমির পাশাপাশি বসতভিটা, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কবরস্থানও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া বন্যার পানি সময়মতো নামতে না পারায় বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে আমনসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্থানীয়দের দাবি, স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ ও কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে প্রতিবছরের এই ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও যোগাযোগেও দুর্ভোগ

চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ শুধু কৃষি ও নদীভাঙনে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও তারা পিছিয়ে রয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, জরুরি রোগী কিংবা গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নিতে অনেক সময় নৌযানের ওপর নির্ভর করতে হয়। বর্ষায় নদী উত্তাল থাকলে এই যাত্রা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তাদের প্রশ্ন, দুই লক্ষাধিক মানুষের বসবাসের এই বিশাল চরাঞ্চলে এখনো কেন স্থায়ী ও সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে উঠল না?

প্রতিশ্রুতি আছে, বাস্তবায়ন নেই

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচন এলেই সেচ, বাঁধ, নদী খনন ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে এসব প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে তেমন তৎপরতা দেখা যায় না।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রকৌশলী শহীদুল ইসলাম জানান, তিনি ২০০৫ সালে কাঁকন নদী পুনঃখনন এবং ২০০৮ সালে চরাঞ্চলের ছয় ইউনিয়নকে মেঘনার প্লাবন থেকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় আবেদন ও উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজুর গাফিলতির কারণে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে তাঁর দাবি।

অতীতেও চরাঞ্চলের ছয় ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা যৌথভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে আবেদন করেছিলেন বলে পুরোনো নথির সূত্রে জানা গেছে।

রায়পুরা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান খোকনও অভিযোগ করেন, তৎকালীন সংসদ সদস্য রাজুর প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও আন্তরিকতার অভাবেই প্রকল্প দুটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি।

তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সাবেক সংসদ সদস্য রাজুর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি।

এ বিষয়ে নরসিংদী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নতুন করে আশার আলো

দীর্ঘ অপেক্ষার পর কাঁকন নদী সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প নিয়ে নতুন করে আশার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য।

নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল বলেন, কাঁকন নদী দীর্ঘদিন ধরে মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। নদীটি পুনঃখননের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, চরাঞ্চলের ছয় ইউনিয়নের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে একটি সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে ম্যাপিংয়ের কাজও করা হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, ৪৮ বছর আগে নেওয়া যে প্রকল্প মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল, সেটি এত দীর্ঘ সময়েও কেন বাস্তবায়িত হলো না? কোন পর্যায়ে প্রকল্প আটকে ছিল, কার সময়ে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং কেন বারবার আবেদন ও পরিকল্পনার পরও তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি; এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি।

এদিকে নদীভাঙনে প্রতিবছর জমি ও বসতভিটা হারাচ্ছেন মানুষ। শুষ্ক মৌসুমে কৃষক সেচের পানির জন্য হাহাকার করছেন, আর বর্ষায় একই মানুষকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে বন্যা ও নদীভাঙনের।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এবার যেন নতুন কোনো প্রতিশ্রুতিতে বিষয়টি আটকে না থাকে। কাঁকন নদী পুনঃখনন, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও নদীভাঙন রোধে সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।

৪৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে কাঁকন নদী প্রকল্প ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ-নিষ্কাশন প্রকল্প এবার বাস্তবায়নের পথে এগোয়, নাকি আগের মতোই অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকে; এখন সেটিই দেখার বিষয়।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

দুর্ভোগে রায়পুরার চরাঞ্চলের মানুষ

৪৮ বছর ধরে ঝুলে আছে কাঁকন নদী সেচ প্রকল্প

সর্বশেষ আপডেট ০৩:৪৫:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

একটি নদী, একটি প্রকল্প আর দীর্ঘ ৪৮ বছরের অপেক্ষা। ১৯৭৭ সালে নেওয়া হয়েছিল কাঁকন নদী সেচ প্রকল্পের পরিকল্পনা। এরপর কেটে গেছে প্রায় অর্ধশতাব্দী। একের পর এক সরকার বদলেছে, পরিবর্তন এসেছে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনে। কিন্তু এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প।

একইভাবে রায়পুরার মেঘনা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলকে বন্যা ও নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষায় প্রস্তাবিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশন প্রকল্পও আলোর মুখ দেখেনি। ফলে বছরের পর বছর ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন উপজেলার শ্রীনগর, পাড়াতলী, বাঁশগাড়ী, চরমধুয়া, চাঁনপুর ও মির্জারচর ইউনিয়নের দুই লক্ষাধিক মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একদিকে বর্ষায় মেঘনার ভাঙন ও বন্যা, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে তীব্র সেচ সংকট; দুই মৌসুমেই তাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। প্রতিবছর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কবরস্থান। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটে অনেক কৃষক জমি অনাবাদি রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।

৪৮ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি সেচ প্রকল্প

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য ও পুরোনো আবেদনপত্র অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালে কাঁকন নদী সেচ প্রকল্পের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি প্রায় ৭ হাজার ৬১১ হেক্টর এলাকা বন্যার ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষার পরিকল্পনা ছিল।

অন্যদিকে প্রস্তাবিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৪২ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এতে প্রায় ৮ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ও ৮৫০ হেক্টর জলাভূমি রক্ষা করা সম্ভব হতো বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ ও নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে পরিকল্পনা, আবেদন ও উদ্যোগ চললেও প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

শুষ্ক মৌসুমে সেচ সংকট

শুষ্ক মৌসুমে কাঁকন নদী ও আশপাশের খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় সেচের পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সাধারণ শ্যালো মেশিন দিয়েও অনেক জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হয় না।

ফলে সেচের জন্য বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে কৃষকদের। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রান্তিক কৃষক জমি অনাবাদি রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।

চরাঞ্চলে ধান, আলু, বাদাম ও বিভিন্ন ধরনের সবজির ব্যাপক উৎপাদন হয়। পানি ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধান হলে এ অঞ্চলের কৃষি আরও সমৃদ্ধ হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

বর্ষায় নদীভাঙন-বন্যা

শুষ্ক মৌসুমের সেচ সংকটের বিপরীত চিত্র দেখা যায় বর্ষায়। তখন মেঘনার পানি বৃদ্ধি ও নদীভাঙনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে চরাঞ্চল। ফসলি জমির পাশাপাশি বসতভিটা, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কবরস্থানও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া বন্যার পানি সময়মতো নামতে না পারায় বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে আমনসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্থানীয়দের দাবি, স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ ও কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে প্রতিবছরের এই ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও যোগাযোগেও দুর্ভোগ

চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ শুধু কৃষি ও নদীভাঙনে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও তারা পিছিয়ে রয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, জরুরি রোগী কিংবা গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নিতে অনেক সময় নৌযানের ওপর নির্ভর করতে হয়। বর্ষায় নদী উত্তাল থাকলে এই যাত্রা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তাদের প্রশ্ন, দুই লক্ষাধিক মানুষের বসবাসের এই বিশাল চরাঞ্চলে এখনো কেন স্থায়ী ও সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে উঠল না?

প্রতিশ্রুতি আছে, বাস্তবায়ন নেই

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচন এলেই সেচ, বাঁধ, নদী খনন ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে এসব প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে তেমন তৎপরতা দেখা যায় না।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রকৌশলী শহীদুল ইসলাম জানান, তিনি ২০০৫ সালে কাঁকন নদী পুনঃখনন এবং ২০০৮ সালে চরাঞ্চলের ছয় ইউনিয়নকে মেঘনার প্লাবন থেকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় আবেদন ও উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজুর গাফিলতির কারণে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে তাঁর দাবি।

অতীতেও চরাঞ্চলের ছয় ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা যৌথভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে আবেদন করেছিলেন বলে পুরোনো নথির সূত্রে জানা গেছে।

রায়পুরা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান খোকনও অভিযোগ করেন, তৎকালীন সংসদ সদস্য রাজুর প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও আন্তরিকতার অভাবেই প্রকল্প দুটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি।

তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সাবেক সংসদ সদস্য রাজুর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি।

এ বিষয়ে নরসিংদী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নতুন করে আশার আলো

দীর্ঘ অপেক্ষার পর কাঁকন নদী সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প নিয়ে নতুন করে আশার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য।

নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল বলেন, কাঁকন নদী দীর্ঘদিন ধরে মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। নদীটি পুনঃখননের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, চরাঞ্চলের ছয় ইউনিয়নের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে একটি সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে ম্যাপিংয়ের কাজও করা হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, ৪৮ বছর আগে নেওয়া যে প্রকল্প মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল, সেটি এত দীর্ঘ সময়েও কেন বাস্তবায়িত হলো না? কোন পর্যায়ে প্রকল্প আটকে ছিল, কার সময়ে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং কেন বারবার আবেদন ও পরিকল্পনার পরও তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি; এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি।

এদিকে নদীভাঙনে প্রতিবছর জমি ও বসতভিটা হারাচ্ছেন মানুষ। শুষ্ক মৌসুমে কৃষক সেচের পানির জন্য হাহাকার করছেন, আর বর্ষায় একই মানুষকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে বন্যা ও নদীভাঙনের।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এবার যেন নতুন কোনো প্রতিশ্রুতিতে বিষয়টি আটকে না থাকে। কাঁকন নদী পুনঃখনন, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও নদীভাঙন রোধে সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।

৪৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে কাঁকন নদী প্রকল্প ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ-নিষ্কাশন প্রকল্প এবার বাস্তবায়নের পথে এগোয়, নাকি আগের মতোই অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকে; এখন সেটিই দেখার বিষয়।