রঙিন প্যাকেটের আড়ালে ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য!
- সর্বশেষ আপডেট ১২:৩৪:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
- / 28
বাংলাদেশে মানুষের খাদ্যাভ্যাস আরও স্বাস্থ্যকর করার লক্ষ্যে সরকার নতুন একটি নীতিগত উদ্যোগ বিবেচনা করছে। এর অংশ হিসেবে প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কের সামনে (ফ্রন্ট অব প্যাকেজ) সতর্কবার্তা যুক্ত করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এমন একটি ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে, যেখানে উচ্চমাত্রার লবণ, চিনি ও চর্বিযুক্ত খাদ্য স্পষ্টভাবে চিহ্নিত থাকবে।
তবে এখনই দোকানে এ ধরনের সতর্ক লেবেল দেখা যাবে- এমন আশা করার সুযোগ নেই। কারণ, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখনো চূড়ান্ত হয়নি কী ধরনের পদ্ধতি গ্রহণ করা হবে।
সম্প্রতি সংস্থাটি “নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬” এর খসড়া প্রকাশ করেছে এবং জনমত আহ্বান করেছে। এতে খাদ্যের উপাদান, পুষ্টিগুণ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তথ্য বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে এখনো প্যাকেটের সামনের অংশে বাধ্যতামূলক সতর্কবার্তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে এই নীতিমালা বাস্তবায়িত হলেও ভোক্তারা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, স্পষ্ট খাদ্য লেবেল মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্য নির্বাচনকে উৎসাহিত করবে, বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মতো খাদ্যজনিত রোগ বাড়তে থাকায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে এক বিলিয়নের বেশি মানুষ স্থুলতায় ভুগছে এবং ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মতো সংশ্লিষ্ট সমস্যার কারণে প্রতি বছর প্রায় ৮০ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশই রোগীর মৃত্যু হচ্ছে এসব রোগের কারনে। অর্থাৎ স্বাস্থ্য সচেতনতার কথা ভেবে বাজার থেকে আপনি যে মোড়কজাত পণ্যটি কিনছেন তাই আপনার স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাড়াতে পারে।

বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মাত্র ৪৩টি দেশে কোনো না কোনোভাবে প্যাকেটের সামনের অংশে লেবেলিং ব্যবস্থা (বাধ্যতামূলক বা স্বেচ্ছামূলক) চালু আছে।
আপনি যদি মেক্সিকো বা চিলির কোন সুপার শপ কিংবা দোকান থেকে বিক্রি হওয়া খাবার ও পানীয়ের প্যাকেট কিনেন; তাহলে দেখতে পাবেন মোড়কের সামনে সতর্কবার্তা দেওয়া থাকে, যদি সেগুলোতে অতিরিক্ত সোডিয়াম, চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা ক্যালোরি থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, চিলি ২০১৬ সালে বাধ্যতামূলক সতর্কবার্তা চালু করার পর সেখানে উচ্চ চিনি ও লবণযুক্ত খাদ্যের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সতর্কবার্তাযুক্ত পণ্য থেকে ক্যালোরি গ্রহণ ২৩ শতাংশের বেশি কমেছে এবং চিনি ও সোডিয়াম গ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
মেক্সিকো-তেও একই ধরনের লেবেল চালুর পর ভোক্তাদের সচেতনতা বেড়েছে এবং অনেক খাদ্য কোম্পানি তাদের পণ্যের উপাদান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে- যেমন চিনি বা লবণের পরিমাণ কমানো।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে থাকা অধিকাংশ প্যাকেটজাত খাদ্যে পুষ্টি তথ্য থাকলেও তা থাকে প্যাকেটের পেছনে, ছোট অক্ষরে এবং জটিলভাবে লেখা। অনেক সময় ইংরেজিতে হওয়ায় সাধারণ ক্রেতার পক্ষে তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন- খাবারটি স্বাস্থ্যকর, নাকি ঝুঁকিপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞরা জোর দিচ্ছেন “ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং” বা প্যাকেটের সামনের অংশে সহজ ও স্পষ্ট সতর্কবার্তা যুক্ত করার ওপর। তাদের মতে, যদি বড় অক্ষরে “চিনি বেশি”, “লবণ বেশি” বা “চর্বি বেশি” লেখা থাকে, তাহলে একজন সাধারণ মানুষও সহজেই ঝুঁকি বুঝতে পারবেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্যাকেটের সামনে লেবেল থাকলে মানুষ তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্যাকেটের পেছনের জটিল তথ্যের চেয়ে সামনে সহজ সতর্কবার্তা অনেক বেশি কার্যকর।
তবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় বাধা খাদ্য শিল্প। অনেক কোম্পানি আশঙ্কা করছে, সতর্কবার্তা চালু হলে তাদের পণ্যের বিক্রি কমে যেতে পারে। তারা দাবি করছে, এ ধরনের লেবেল ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করতে পারে এবং কোনো পণ্যকে অযথা “অস্বাস্থ্যকর” হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাদের মতে, এটি মূলত তামাক শিল্পের মতোই নিয়ন্ত্রণ এড়ানোর কৌশল। গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্য শিল্প অনেক ক্ষেত্রেই স্বেচ্ছামূলক লেবেলিংয়ের পক্ষে থাকে, যেখানে তথ্য দেওয়া হয় কিন্তু তা বোঝার কোনো নির্দেশনা থাকে না।






































