প্রার্থীতা কিংবা ইশতেহার- কোথাও নেই হিজড়া জনগোষ্ঠী
- সর্বশেষ আপডেট ০৫:০৩:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 312
আনোয়ারা ইসলামী রানী; তিনি ছিলেন হিজরা জনগোষ্ঠীর একমাত্র প্রতিনিধি। শেষমেষ তিনিও নির্বাচন থেকে সরে দাড়ান। ছবি: সংগৃহীত
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলো নানামুখী প্রতিশ্রুতি ও ‘চমকপ্রদ’ ইশতেহার প্রকাশ করলেও একেবারেই উপেক্ষিত থেকে গেছে দেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীর ইস্যু। ভোটার হিসেবে সংখ্যায় কম- এই যুক্তিতে রাজনৈতিক দলগুলো কার্যত এই জনগোষ্ঠীকে গুরুত্বই দেয়নি। ফলে ইশতেহার থেকে শুরু করে প্রার্থী মনোনয়ন- সব ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব।
সারা দেশে মাত্র দু’জন হিজড়া প্রার্থী প্রাথমিকভাবে নির্বাচনী মাঠে থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা কেউই টিকতে পারেননি। এর ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কার্যত সম্পূর্ণভাবেই অনুপস্থিত হিজড়া জনগোষ্ঠী।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপ অনুযায়ী, দেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। তবে বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাব বলছে, এই সংখ্যা ৫০ হাজারেরও বেশি। অন্যদিকে ট্রান্স ওমেন শিক্ষার্থী আমাইরা ইরতেজা ইরা দাবি করেন, বাস্তবে হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষ এক লাখের কাছাকাছি। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংক্রান্ত জটিলতা, নাম ও লিঙ্গ পরিচয় পরিবর্তনের প্রতিবন্ধকতার কারণে অধিকাংশ হিজড়া এখনো ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারেননি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় পৌনে ১৩ কোটি ভোটারের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ২৩০ জন হিজড়া ভোটার রয়েছেন। অথচ বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির ব্যবস্থাপক ম্যানেজার (এডভোকেসি অ্যান্ড কমিউনিকেশন্স) মো. মশিউর রহমানের মতে, এনআইডি জটিলতা না থাকলে এই সংখ্যা হওয়ার কথা ছিল ১২ হাজার ৬৩২ জন। প্রশ্ন উঠছে- বাকি ১০ হাজারের বেশি হিজড়া ভোটার কোথায়?
হিজড়া জনগোষ্ঠীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রথমবারের মতো ভোটার নিবন্ধন ফরমে ‘হিজড়া’ শব্দটি যুক্ত করে। পাশাপাশি জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা- ২০০৮ সংশোধনের মাধ্যমে প্রার্থীর লিঙ্গ পরিচয়ে ‘হিজড়া’ যুক্ত করা হয়। এর ফলে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যরা নিজস্ব পরিচয়েই সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আইনি সুযোগ পান। তবে এই বিধান এখনও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কার্যকর হয়নি।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ‘হিজড়া’ পরিচয়ে অংশ নিয়েছিলেন মোছা. আনোয়ারা ইসলাম রানী। রংপুর-৩ আসনে ঈগল প্রতীকে তিনি পেয়েছিলেন ২৩ হাজার ৩৩৯ ভোট। যদিও জয়ী হন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। এবার ত্রয়োদশ নির্বাচনে একই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে হরিণ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছিলেন আনোয়ারা ইসলাম রানী। তিনিই ছিলেন এবারের নির্বাচনে একমাত্র হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। কিন্তু পুরুষ প্রতিদ্বন্ধীদের নানাবিধ হয়রানির কারনে শেষমেষ তিনিও নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন।
আনোয়ারা ইসলাম রানীর অভিযোগ, কোনো রাজনৈতিক দলই এবার হিজড়া জনগোষ্ঠী থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি কিংবা ইশতেহারে তাদের উন্নয়নের কথা উল্লেখ করেনি। বরং তাকে অনলাইনে বুলিং, অপপ্রচার ও কূক্তির মুখে পড়তে হয়। তার ভাষায়, “আমার লড়াই কোনো দল বা প্রার্থীর বিরুদ্ধে ছিলো না, আমার লড়াই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের জন্য।”
ট্রান্স ওমেন শিক্ষার্থী আমাইরা ইরতেজা ইরা মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো হিজড়া জনগোষ্ঠীকে কেবল টোকেনিজম হিসেবে ব্যবহার করে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সমতার কথা বলা হলেও নির্বাচনে সেই সমতা প্রতিফলিত হয়নি। এমনকি হাসপাতাল কিংবা ভোটকেন্দ্রেও নারী-পুরুষ লাইনের বাইরে হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন কমিশন বিধিমালা সংশোধন করলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে হিজড়া জনগোষ্ঠীর বিষয়টি ইশতেহার ও নির্বাচনী আলোচনায় জায়গা পায়নি। ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি, প্রার্থী মনোনয়ন এবং নীতিগত অঙ্গীকার ছাড়া গণতন্ত্রের এই অংশগ্রহণমূলক চিত্র কখনোই পূর্ণতা পাবে না।































