ঢাকা ০৫:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খাল পুনঃখনন কর্মসূচি হোক সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনার অংশ

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:৩০:৫৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬
  • / 27

বিআইপি

খাল পুনঃখনন কর্মসূচিকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশের খাল পুনঃখনন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে পানিব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন, প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সংরক্ষণ এবং সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনার গুরুত্ব তুলে ধরেন বক্তারা ।

শনিবার (৯ মে) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর উদ্যোগে সকাল ১১টায় রাজধানীর প্ল্যানার্স টাওয়ারে বিআইপি কনফারেন্স হলে “খাল পুনঃখনন কর্মসূচি: পানিব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন ও স্থানিক পরিকল্পনার প্রেক্ষিত” শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা একথা বলেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইপি’র সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। সভা সঞ্চালনা করেন বিআইপি’র সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ ড. মুঃ মোসলেহ উদ্দীন হাসান। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিআইপি’র সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান এবং যুগ্মসম্পাদক পরিকল্পনাবিদ কাজী সালমান হোসেন।

ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের নদী, খাল, বিল, লেক, জলাভূমি ও নিম্নভূমি কেবল পানি ধারণের স্থান নয়; বরং কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, জীবিকা এবং জলবায়ু সহনশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ।

তিনি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে পানি ব্যবস্থাপনা শুধুমাত্র প্রকৌশলগত বিষয় নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানিক পরিকল্পনা ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন। এ প্রেক্ষিতে সরকারের “খাল পুনঃখনন কর্মসূচি” একটি সময়োপযোগী ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্যোগ হলেও এটিকে কেবল মাটি কাটার প্রকল্প হিসেবে দেখলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জন সম্ভব হবে না।

তিনি আরও বলেন, খাল পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে জাতীয় জলাশয় পরিকল্পনা, অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সংরক্ষণ, নগর জলাবদ্ধতা নিরসন, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, কৃষি ও মৎস্য উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, খাল পুনঃখনন কার্যক্রমকে ন্যাশনাল এডাপটেশন  প্ল্যান (২০২৩-২০৫০), বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ ও স্পেশাল প্ল্যানিং  ফ্রেমওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে।

এছাড়াও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এক্ষেত্রে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করা সম্ভব হলে পুনঃখনন কার্যক্রমের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ফলাফল অর্জন করা যাবে।

তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, খাল পুনঃখনন কর্মসূচিকে জাতীয় জলাশয় পুনরুদ্ধার, জলবায়ু অভিযোজন ও টেকসই স্থানিক পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি একই সঙ্গে  বিআইপি কারিগরি সহায়তা, নীতিগত পরামর্শ, জিআইএস ও রিমোট সেনসিং  ভিত্তিক বিশ্লেষণ, অংশীজন পরামর্শ এবং পর্যবেক্ষণ কাঠামো প্রণয়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, সরকারের অন্যতম রাজনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে খাল পুনঃখনন প্রকল্পকে বিবেচনা করা হচ্ছে। যা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ; একসময় গ্রামবাংলার পরিচয় ছিল নদী, খাল, বিল ও প্রাকৃতিক জলাশয়কেন্দ্রিক।

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এসব জলাভূমি আজ সংকটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি ভূমির কার্যকরী ও পরিকল্পিত ব্যবহারে ব্যর্থতাকে দায়ী করেন। শহর ও গ্রামাঞ্চলে নির্বিচারে খাল-বিল ভরাট করে বসতবাড়ি, বাজার ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ধ্বংস হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দেশের নদী ও খালগুলোতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো আন্তদেশীয় নদী ব্যবস্থাপনার জটিলতা। তিনি বলেন, উজানে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা প্রদান করছে না।

ফলে একসময় শুষ্ক মৌসুমেও যেসব নদীতে পানির প্রবাহ দেখা যেত, বর্তমানে সেসব নদীতে বর্ষা মৌসুমের সীমিত সময় ছাড়া পানি প্রবাহ প্রায় অনুপস্থিত। পাশাপাশি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও অধিকাংশ নদীর নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, স্থানীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতাকে সমন্বয় না করে বিচ্ছিন্নভাবে খাল পুনঃখনন প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনা সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। তিনি আরো বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার পুনর্গঠন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অর্জন করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এখন পর্যন্ত খাল পুনঃখনন প্রকল্পটিতে কোনো উল্লেখযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক নতুনত্ব দৃশ্যমান হয়নি। প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের জন্য কাজের ধরনে পরিবর্তন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি এবং কৃষিখাতের সেচ প্রকল্পসমূহ সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যদি পৃথকভাবে খাল পুনঃখননের কাজ পরিচালনা করে, তবে কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জন করা কঠিন হবে। এ ধরনের বৃহৎ প্রকল্পে বিভিন্ন পেশাজীবীর পাশাপাশি পরিকল্পনাবিদদের সম্পৃক্ত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

ড. মুঃ মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, খাল পুনঃখনন কর্মসূচিকে একটি সমন্বিত নগর ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের অন্তত আরও সাতটি মন্ত্রণালয়কে এ কাজে সম্পৃক্ত করা দরকার।

তিনি আরও বলেন, খাল খননকে লাভজনক প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রমের বাইরে এনে পরিবেশ ও নগর সুরক্ষার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। ঢাকার বিভিন্ন খাল ভরাট করে যারা আবাসিক ভবন নির্মাণ করেছে, তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

পাশাপাশি, খাল পুনঃখনন ও সংরক্ষণ কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে খাল রক্ষা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নগর পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর ও টেকসই ফলাফল অর্জন সম্ভব হবে।

কয়েকটি প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়:

* জাতীয় পানিসম্পদ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে নদী, খাল, বিল, পুকুর, জলাভূমি, নিম্নভূমি এবং পানি নিষ্কাশন পথ একসঙ্গে মানচিত্রায়িত ও শ্রেণিবদ্ধ হবে।

* নদী অববাহিকা ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যেন উজান-ভাটি, শহর-গ্রাম এবং খাল-ড্রেন-নদী সংযোগ একই ব্যবস্থায় বিবেচিত হয়।

* জিআইএস, রিমোট সেনসিং, এলআইডিএআর এবং ফিল্ড সার্ভে ব্যবহার করে দখল, সিলটেশন, জলপ্রবাহ, দূষণ এবং জলাভূমি পরিবর্তনের নিয়মিত ডিজিটাল মনিটরিং চালু করা।

*  স্পেশাল প্ল্যানিং ফ্রেমওয়ার্ক, বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ এবং ন্যাশনাল এডাপটেশন প্ল্যান ২০২৩-২০৫০ এর সঙ্গে খাল-জলাশয় পুনঃখনন কর্মসূচিকে বাধ্যতামূলকভাবে সংযুক্ত করা।

* পুনঃখননের পাশাপাশি পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, এসটিপি/ইটিপি, কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ এবং শিল্প বর্জ্য নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়ন করতে হবে। দূষণ বন্ধ না করলে খননের সুফল স্থায়ী হবে না।

* প্রতি প্রকল্পে পরিবেশগত সমীক্ষা যেমন এনভারোমেন্টাল ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট, এনভারোমেন্ট এন্ড সোশ্যাল ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান, মাটির গুণমান পরীক্ষা, মাটি অপসারণের অঞ্চল নির্ধারণ এবং খননকৃত মাটি-র উপকারী ব্যবহার যাচাই করা দরকার। খননকৃত মাটি – কোথায় ও কীভাবে ব্যবহার হবে তা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা।

* খালের পাড়ে বাস্তুতান্ত্রিক বাফার এলাকা, স্থানীয় উদ্ভিদ, মাছ চলাচলের পথ এবং জীববৈচিত্র্য করিডোর নিশ্চিত করতে হবে। খালকে শুধু ড্রেনেজ নয়, জীববৈচিত্র্যের অবকাঠামো হিসেবে দেখা।

* কৃষক, মৎস্যজীবী, স্থানীয় বাসিন্দা, সিটি করপোরেশন/পৌরসভা/ইউনিয়ন পরিষদ এবং পানি ব্যবহারকারী কমিটির অংশগ্রহণে কমিউনিটি-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে  তোলা।

* রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, বার্ষিক নিরীক্ষা এবং সিটিজেন রিপোর্টিং সিস্টেম নির্ধারণ না করে কোনো পুনঃখনন প্রকল্প শেষ ঘোষণা করা উচিত নয়।

* পেশাদার পরিকল্পনাবিদদের কারিগরি সহায়তা, স্থানিক পরিকল্পনার পর্যালোচনা এবং পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা।

* দখলদারির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, এবং স্থানীয় জনগণকে শুধু উপকারভোগী হিসেবে নয়, রক্ষণাবেক্ষণ অংশীদার হিসেবে যুক্ত করা।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

খাল পুনঃখনন কর্মসূচি হোক সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনার অংশ

সর্বশেষ আপডেট ১১:৩০:৫৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

খাল পুনঃখনন কর্মসূচিকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশের খাল পুনঃখনন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে পানিব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন, প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সংরক্ষণ এবং সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনার গুরুত্ব তুলে ধরেন বক্তারা ।

শনিবার (৯ মে) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর উদ্যোগে সকাল ১১টায় রাজধানীর প্ল্যানার্স টাওয়ারে বিআইপি কনফারেন্স হলে “খাল পুনঃখনন কর্মসূচি: পানিব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন ও স্থানিক পরিকল্পনার প্রেক্ষিত” শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা একথা বলেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইপি’র সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। সভা সঞ্চালনা করেন বিআইপি’র সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ ড. মুঃ মোসলেহ উদ্দীন হাসান। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিআইপি’র সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান এবং যুগ্মসম্পাদক পরিকল্পনাবিদ কাজী সালমান হোসেন।

ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের নদী, খাল, বিল, লেক, জলাভূমি ও নিম্নভূমি কেবল পানি ধারণের স্থান নয়; বরং কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, জীবিকা এবং জলবায়ু সহনশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ।

তিনি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে পানি ব্যবস্থাপনা শুধুমাত্র প্রকৌশলগত বিষয় নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানিক পরিকল্পনা ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন। এ প্রেক্ষিতে সরকারের “খাল পুনঃখনন কর্মসূচি” একটি সময়োপযোগী ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্যোগ হলেও এটিকে কেবল মাটি কাটার প্রকল্প হিসেবে দেখলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জন সম্ভব হবে না।

তিনি আরও বলেন, খাল পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে জাতীয় জলাশয় পরিকল্পনা, অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সংরক্ষণ, নগর জলাবদ্ধতা নিরসন, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, কৃষি ও মৎস্য উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, খাল পুনঃখনন কার্যক্রমকে ন্যাশনাল এডাপটেশন  প্ল্যান (২০২৩-২০৫০), বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ ও স্পেশাল প্ল্যানিং  ফ্রেমওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে।

এছাড়াও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এক্ষেত্রে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করা সম্ভব হলে পুনঃখনন কার্যক্রমের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ফলাফল অর্জন করা যাবে।

তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, খাল পুনঃখনন কর্মসূচিকে জাতীয় জলাশয় পুনরুদ্ধার, জলবায়ু অভিযোজন ও টেকসই স্থানিক পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি একই সঙ্গে  বিআইপি কারিগরি সহায়তা, নীতিগত পরামর্শ, জিআইএস ও রিমোট সেনসিং  ভিত্তিক বিশ্লেষণ, অংশীজন পরামর্শ এবং পর্যবেক্ষণ কাঠামো প্রণয়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, সরকারের অন্যতম রাজনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে খাল পুনঃখনন প্রকল্পকে বিবেচনা করা হচ্ছে। যা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ; একসময় গ্রামবাংলার পরিচয় ছিল নদী, খাল, বিল ও প্রাকৃতিক জলাশয়কেন্দ্রিক।

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এসব জলাভূমি আজ সংকটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি ভূমির কার্যকরী ও পরিকল্পিত ব্যবহারে ব্যর্থতাকে দায়ী করেন। শহর ও গ্রামাঞ্চলে নির্বিচারে খাল-বিল ভরাট করে বসতবাড়ি, বাজার ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ধ্বংস হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দেশের নদী ও খালগুলোতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো আন্তদেশীয় নদী ব্যবস্থাপনার জটিলতা। তিনি বলেন, উজানে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা প্রদান করছে না।

ফলে একসময় শুষ্ক মৌসুমেও যেসব নদীতে পানির প্রবাহ দেখা যেত, বর্তমানে সেসব নদীতে বর্ষা মৌসুমের সীমিত সময় ছাড়া পানি প্রবাহ প্রায় অনুপস্থিত। পাশাপাশি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও অধিকাংশ নদীর নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, স্থানীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতাকে সমন্বয় না করে বিচ্ছিন্নভাবে খাল পুনঃখনন প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনা সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। তিনি আরো বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার পুনর্গঠন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অর্জন করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এখন পর্যন্ত খাল পুনঃখনন প্রকল্পটিতে কোনো উল্লেখযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক নতুনত্ব দৃশ্যমান হয়নি। প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের জন্য কাজের ধরনে পরিবর্তন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি এবং কৃষিখাতের সেচ প্রকল্পসমূহ সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যদি পৃথকভাবে খাল পুনঃখননের কাজ পরিচালনা করে, তবে কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জন করা কঠিন হবে। এ ধরনের বৃহৎ প্রকল্পে বিভিন্ন পেশাজীবীর পাশাপাশি পরিকল্পনাবিদদের সম্পৃক্ত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

ড. মুঃ মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, খাল পুনঃখনন কর্মসূচিকে একটি সমন্বিত নগর ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের অন্তত আরও সাতটি মন্ত্রণালয়কে এ কাজে সম্পৃক্ত করা দরকার।

তিনি আরও বলেন, খাল খননকে লাভজনক প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রমের বাইরে এনে পরিবেশ ও নগর সুরক্ষার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। ঢাকার বিভিন্ন খাল ভরাট করে যারা আবাসিক ভবন নির্মাণ করেছে, তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

পাশাপাশি, খাল পুনঃখনন ও সংরক্ষণ কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে খাল রক্ষা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নগর পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর ও টেকসই ফলাফল অর্জন সম্ভব হবে।

কয়েকটি প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়:

* জাতীয় পানিসম্পদ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে নদী, খাল, বিল, পুকুর, জলাভূমি, নিম্নভূমি এবং পানি নিষ্কাশন পথ একসঙ্গে মানচিত্রায়িত ও শ্রেণিবদ্ধ হবে।

* নদী অববাহিকা ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যেন উজান-ভাটি, শহর-গ্রাম এবং খাল-ড্রেন-নদী সংযোগ একই ব্যবস্থায় বিবেচিত হয়।

* জিআইএস, রিমোট সেনসিং, এলআইডিএআর এবং ফিল্ড সার্ভে ব্যবহার করে দখল, সিলটেশন, জলপ্রবাহ, দূষণ এবং জলাভূমি পরিবর্তনের নিয়মিত ডিজিটাল মনিটরিং চালু করা।

*  স্পেশাল প্ল্যানিং ফ্রেমওয়ার্ক, বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ এবং ন্যাশনাল এডাপটেশন প্ল্যান ২০২৩-২০৫০ এর সঙ্গে খাল-জলাশয় পুনঃখনন কর্মসূচিকে বাধ্যতামূলকভাবে সংযুক্ত করা।

* পুনঃখননের পাশাপাশি পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, এসটিপি/ইটিপি, কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ এবং শিল্প বর্জ্য নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়ন করতে হবে। দূষণ বন্ধ না করলে খননের সুফল স্থায়ী হবে না।

* প্রতি প্রকল্পে পরিবেশগত সমীক্ষা যেমন এনভারোমেন্টাল ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট, এনভারোমেন্ট এন্ড সোশ্যাল ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান, মাটির গুণমান পরীক্ষা, মাটি অপসারণের অঞ্চল নির্ধারণ এবং খননকৃত মাটি-র উপকারী ব্যবহার যাচাই করা দরকার। খননকৃত মাটি – কোথায় ও কীভাবে ব্যবহার হবে তা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা।

* খালের পাড়ে বাস্তুতান্ত্রিক বাফার এলাকা, স্থানীয় উদ্ভিদ, মাছ চলাচলের পথ এবং জীববৈচিত্র্য করিডোর নিশ্চিত করতে হবে। খালকে শুধু ড্রেনেজ নয়, জীববৈচিত্র্যের অবকাঠামো হিসেবে দেখা।

* কৃষক, মৎস্যজীবী, স্থানীয় বাসিন্দা, সিটি করপোরেশন/পৌরসভা/ইউনিয়ন পরিষদ এবং পানি ব্যবহারকারী কমিটির অংশগ্রহণে কমিউনিটি-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে  তোলা।

* রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, বার্ষিক নিরীক্ষা এবং সিটিজেন রিপোর্টিং সিস্টেম নির্ধারণ না করে কোনো পুনঃখনন প্রকল্প শেষ ঘোষণা করা উচিত নয়।

* পেশাদার পরিকল্পনাবিদদের কারিগরি সহায়তা, স্থানিক পরিকল্পনার পর্যালোচনা এবং পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা।

* দখলদারির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, এবং স্থানীয় জনগণকে শুধু উপকারভোগী হিসেবে নয়, রক্ষণাবেক্ষণ অংশীদার হিসেবে যুক্ত করা।