ঢাকা ০৩:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেইলি রোড ট্র্যাজেডি: চার্জশিটে বাদ নকশা অনুমোদনকারী

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:৫৭:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
  • / 121

ভবনের নকশা অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত তৎকালীন রাজউক কর্মকর্তা, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী।

রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ও প্রাণহানীর ঘটনায় সম্প্রতি আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। দুই বছর তদন্ত শেষে দাখিল করা এই অভিযোগপত্রে ভবনের নকশা অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত তৎকালীন রাজউক কর্মকর্তা প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নাম না থাকায় তদন্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ওই ভবনের ‘কাচ্চি ভাই’ নামক রেষ্টুরেন্ট থেকে অগ্নিকান্ডের সূচনা ঘটে। ওই ঘটনায় ৪৬ জনের মৃত্যু এবং আরও অন্তত ১৩ জন দগ্ধ ও আহত হন।
দুই বছর তদন্ত শেষে গত ৩১ মার্চ ভবনের মালিকপক্ষ আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. রমজানুল হক নিহাদসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে সিআইডি।

অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর সামনে আসে ভবনটির নকশার বেশ কিছু দুর্বলতা। বহুতল এই ভবনটিতে কার্যত একটি মাত্র সিঁড়ি ছিল, যা জরুরি অবস্থায় বিকল্প পালানোর পথ হিসেবে যথেষ্ট নয়। অগ্নিকাণ্ডে এই সিঁড়িটিই ধোঁয়ায় ভরে গেলে মানুষ আটকা পড়ে। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুযায়ী আলাদা ফায়ার এক্সিট থাকা বাধ্যতামূলক, কিন্তু এখানে তা ছিল না বা কার্যকর ছিল না। সিঁড়ির প্রস্থ কম এবং ঘুরানো হওয়ায় দ্রুত নিচে নামা কঠিন হয়ে পড়ে- বিশেষ করে আতঙ্কের মুহূর্তে। ভবনটির বিভিন্ন তলায় রেস্টুরেন্ট থাকলেও আগুন বা ধোঁয়া আটকে রাখার জন্য পর্যাপ্ত কম্পার্টমেন্টেশন ছিল না। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ধোঁয়া বের হওয়ার জন্য যথাযথ শ্যাফট বা ভেন্টিলেশন না থাকায় ধোঁয়া দ্রুত পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে- যা মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়। স্প্রিংকলার, ফায়ার অ্যালার্ম, ফায়ার ডোর- এসব আধুনিক সিস্টেম নকশায় ছিল না বা কার্যকর ছিল না। ভবনটি মূলত আবাসিক/মিশ্র ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত হলেও বাস্তবে তা বহু রেস্টুরেন্টে রূপান্তর করা হয়- যা নকশার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

মোদ্দকথা এই ভবনের নকশায় সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল- অগ্নি-নিরাপত্তাকে প্রাধান্য না দেওয়া। এক্সিটের অভাব, ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা এবং অননুমোদিত ব্যবহার- সব মিলিয়ে এটি একটি “ডিজাইন ফেইলিওর’- এর উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়- এমনটাই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজউক সূত্রে জানা যায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে ২০১১ সালে এই প্রকৌশলী অথরাইজড অফিসার প্রেষণে রাজউকে আসেন। সে সময় বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের নকশার অনুমোদন দেন তিনি। নকশাগত ত্রুটি নিয়ে ভবনটির নির্মাণকালে বিষয়টি নিয়ে সে সময় ব্যাপক আলোচনা হলেও পরে তা স্তিমিত হয়ে যায়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গণপূর্ত ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা খালেকুজ্জামানের চাকরিজীবনের বড় সময় কেটেছে অস্ট্রেলিয়ায়। স্ত্রী-সন্তান অস্ট্রেলিয়ায় থাকায় সেখানে তিনি বহুবার যাতায়াত করেন। তবে ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে উচ্চতর শিক্ষাছুটির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর লঘুদণ্ড দেয় পূর্ত মন্ত্রণালয়। তাঁর বেতন স্কেলও এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়।

এরপর নিজ জেলার বাসিন্দা ফরিদপুরের প্রভাবশালী সাবেক দুদক কমিশনার মোজ্জাম্মেল হক খানের মাধ্যমে জোরালো তদবির শুরু করেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী। একপর্যায়ে গোপালগঞ্জের বাসিন্দা সাবেক পূর্তসচিব শহীদ উল্লা খন্দকারের আমলে একটি আবেদন করে তিনি। তৎকালীন সচিব এ বিষয়ে জনপ্রশাসনের মতামত চান। জনপ্রশাসন তাদের মতামতে তাঁর জ্যেষ্ঠতা স্থগিত রাখার সুপারিশ করে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের ২৮ অক্টোবর এই কর্মকর্তাকে চলতি দায়িত্ব হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেয়া হয়। চেয়ারে বসেই গত ৬ মাসে তার বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে বদলি বাণিজ্যসহ একাধিক অভিযোগ আসতে শুরু করেছে। একদিনে তিনি অর্ধ শতাধিক কর্মকর্তাকে বদলি করে রেকর্ড গড়েন। এ নিয়ে বিস্তারিত থাকছে- দ্বিতীয় পর্বে

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

বেইলি রোড ট্র্যাজেডি: চার্জশিটে বাদ নকশা অনুমোদনকারী

সর্বশেষ আপডেট ১১:৫৭:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ও প্রাণহানীর ঘটনায় সম্প্রতি আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। দুই বছর তদন্ত শেষে দাখিল করা এই অভিযোগপত্রে ভবনের নকশা অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত তৎকালীন রাজউক কর্মকর্তা প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নাম না থাকায় তদন্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ওই ভবনের ‘কাচ্চি ভাই’ নামক রেষ্টুরেন্ট থেকে অগ্নিকান্ডের সূচনা ঘটে। ওই ঘটনায় ৪৬ জনের মৃত্যু এবং আরও অন্তত ১৩ জন দগ্ধ ও আহত হন।
দুই বছর তদন্ত শেষে গত ৩১ মার্চ ভবনের মালিকপক্ষ আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. রমজানুল হক নিহাদসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে সিআইডি।

অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর সামনে আসে ভবনটির নকশার বেশ কিছু দুর্বলতা। বহুতল এই ভবনটিতে কার্যত একটি মাত্র সিঁড়ি ছিল, যা জরুরি অবস্থায় বিকল্প পালানোর পথ হিসেবে যথেষ্ট নয়। অগ্নিকাণ্ডে এই সিঁড়িটিই ধোঁয়ায় ভরে গেলে মানুষ আটকা পড়ে। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুযায়ী আলাদা ফায়ার এক্সিট থাকা বাধ্যতামূলক, কিন্তু এখানে তা ছিল না বা কার্যকর ছিল না। সিঁড়ির প্রস্থ কম এবং ঘুরানো হওয়ায় দ্রুত নিচে নামা কঠিন হয়ে পড়ে- বিশেষ করে আতঙ্কের মুহূর্তে। ভবনটির বিভিন্ন তলায় রেস্টুরেন্ট থাকলেও আগুন বা ধোঁয়া আটকে রাখার জন্য পর্যাপ্ত কম্পার্টমেন্টেশন ছিল না। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ধোঁয়া বের হওয়ার জন্য যথাযথ শ্যাফট বা ভেন্টিলেশন না থাকায় ধোঁয়া দ্রুত পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে- যা মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়। স্প্রিংকলার, ফায়ার অ্যালার্ম, ফায়ার ডোর- এসব আধুনিক সিস্টেম নকশায় ছিল না বা কার্যকর ছিল না। ভবনটি মূলত আবাসিক/মিশ্র ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত হলেও বাস্তবে তা বহু রেস্টুরেন্টে রূপান্তর করা হয়- যা নকশার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

মোদ্দকথা এই ভবনের নকশায় সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল- অগ্নি-নিরাপত্তাকে প্রাধান্য না দেওয়া। এক্সিটের অভাব, ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা এবং অননুমোদিত ব্যবহার- সব মিলিয়ে এটি একটি “ডিজাইন ফেইলিওর’- এর উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়- এমনটাই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজউক সূত্রে জানা যায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে ২০১১ সালে এই প্রকৌশলী অথরাইজড অফিসার প্রেষণে রাজউকে আসেন। সে সময় বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের নকশার অনুমোদন দেন তিনি। নকশাগত ত্রুটি নিয়ে ভবনটির নির্মাণকালে বিষয়টি নিয়ে সে সময় ব্যাপক আলোচনা হলেও পরে তা স্তিমিত হয়ে যায়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গণপূর্ত ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা খালেকুজ্জামানের চাকরিজীবনের বড় সময় কেটেছে অস্ট্রেলিয়ায়। স্ত্রী-সন্তান অস্ট্রেলিয়ায় থাকায় সেখানে তিনি বহুবার যাতায়াত করেন। তবে ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে উচ্চতর শিক্ষাছুটির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর লঘুদণ্ড দেয় পূর্ত মন্ত্রণালয়। তাঁর বেতন স্কেলও এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়।

এরপর নিজ জেলার বাসিন্দা ফরিদপুরের প্রভাবশালী সাবেক দুদক কমিশনার মোজ্জাম্মেল হক খানের মাধ্যমে জোরালো তদবির শুরু করেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী। একপর্যায়ে গোপালগঞ্জের বাসিন্দা সাবেক পূর্তসচিব শহীদ উল্লা খন্দকারের আমলে একটি আবেদন করে তিনি। তৎকালীন সচিব এ বিষয়ে জনপ্রশাসনের মতামত চান। জনপ্রশাসন তাদের মতামতে তাঁর জ্যেষ্ঠতা স্থগিত রাখার সুপারিশ করে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের ২৮ অক্টোবর এই কর্মকর্তাকে চলতি দায়িত্ব হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেয়া হয়। চেয়ারে বসেই গত ৬ মাসে তার বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে বদলি বাণিজ্যসহ একাধিক অভিযোগ আসতে শুরু করেছে। একদিনে তিনি অর্ধ শতাধিক কর্মকর্তাকে বদলি করে রেকর্ড গড়েন। এ নিয়ে বিস্তারিত থাকছে- দ্বিতীয় পর্বে