উৎপাদন বাড়লেও লাগামহীন পোলাও চালের দাম
- সর্বশেষ আপডেট ১০:২৩:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 325
বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা পারিবারিক আয়োজন; দেশের নানা উৎসবে পোলাও যেন অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে সেই পোলাও চালের দাম এখন সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। উৎপাদন বাড়লেও গত তিন মাস ধরে বাজারে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে সুগন্ধি ও পোলাও চালের দাম।
ঢাকার খুচরা বাজারে বর্তমানে মানভেদে প্রতি কেজি পোলাও চাল বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত। এক মাসের ব্যবধানেই কোনো কোনো চালের দাম বেড়েছে ৬০ থেকে ৮০ টাকা। আর গত তিন মাসে কিছু সুগন্ধি চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ১০০ টাকারও বেশি।
দাম বাড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, চালের উৎপাদন বাড়ার পরও দাম কমার বদলে উল্টো বেড়েই চলেছে। একজন ক্রেতা বলেন, এক কেজি পোলাও চাল কিনতেই ২০০ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। এর সঙ্গে মাছ-মাংসসহ অন্যান্য উপকরণ কিনতে গেলে একটি সাধারণ আয়োজনের খরচ অনেক বেড়ে যায়।
আরেক ক্রেতার ভাষ্য, উৎপাদন বাড়লে দাম কমার কথা। কিন্তু ১৪০ টাকার চাল এখন ২০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। বাজারে বড় বড় কোম্পানি ও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণের কারণেই দাম বাড়ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, মিলারদের কাছ থেকেই বাড়তি দামে চাল কিনতে হচ্ছে। এক বিক্রেতা বলেন, মিলাররা সরকার নির্ধারিত ১৯০ টাকা দরের কথা বলে দাম বাড়িয়েছেন। পরে সেই দাম ২০০ টাকার ওপরে চলে গেছে।
অন্য এক বিক্রেতা বলেন, পোলাও চালের দাম এতটাই বেড়েছে যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। মূলত সামর্থ্যবান ক্রেতারাই এখন বেশি দামে এই চাল কিনছেন।
তবে চালের দাম বাড়ার যৌক্তিক কারণ দেখছেন না ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ। তাদের দাবি, বর্তমানে পোলাও চাল রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি এই চালের উৎপাদনও নির্দিষ্ট মৌসুমে হয়। ফলে সরবরাহ সংকট দেখিয়ে দাম বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
রাজধানীর কৃষি মার্কেটের পাইকারি বাজারে বর্তমানে মানভেদে সুগন্ধি চাল বিক্রি হচ্ছে ১৪৮ থেকে ২১০ টাকা কেজি দরে। পাইকারদের অভিযোগ, উৎপাদন ও বিক্রির পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে তারা আগের মতো বেশি চাল মজুত করতে পারছেন না। দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতার চাহিদাও কমেছে।
একজন পাইকার বলেন, এক মাস আগে তিনি ১০০ থেকে ১৫০ মণ চাল কিনেছিলেন। দাম কম থাকলে আরও বেশি পরিমাণে চাল কিনতেন। এখন দাম বেশি হওয়ায় বিক্রিও কমে গেছে।
পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের পার্থক্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পাইকারদের হিসাবে, পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি চালের দামের ব্যবধান প্রায় ৩০ টাকা। তাদের মতে, এই ব্যবধান অযৌক্তিক।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে পাইকারি বাজারে দাম কিছুটা কমেছে বলেও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের তথ্য অনুযায়ী, কিছুদিন আগে পোলাও চালের দাম ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠলেও বর্তমানে ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে দেশে পোলাও চালের উৎপাদন ও আবাদ; দুটিই বেড়েছে। গত বছর উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে পোলাও চালের মোট উৎপাদন হয়েছে ২৩ লাখ ৪০ হাজার ৫৮৮ মেট্রিক টন।
এরপরও সম্প্রতি সুগন্ধি চালের রপ্তানি বৃদ্ধি ও বাজারে সরবরাহ সংকটের অজুহাতে সব ধরনের পোলাও চালের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, পোলাও চালের দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। এ পর্যন্ত রপ্তানির পরিমাণও খুব বেশি নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার টন চাল রপ্তানি হয়েছে।
অন্যদিকে বাজারে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির লাগাম টানতে নজরদারি বাড়িয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ঢাকা জেলার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান বলেন, চাল রপ্তানির অনুমোদন নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো অনুমোদিত চাল কোথাও মজুত করে রেখেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কোথাও অবৈধ মজুতদারির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উৎপাদন বাড়ার পরও পোলাও চালের দাম কেন কমছে না; এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন ক্রেতারা। বাজারে সিন্ডিকেট, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ও অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে সুগন্ধি চালের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার দাবি তাদের।































