ধর্ষণ, পাচার ও অনলাইন ফাঁদে কন্যাশিশুরা
- সর্বশেষ আপডেট ০৬:৩১:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
- / 46
বাংলাদেশে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহ ও মানবপাচারের মতো পুরোনো ঝুঁকির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণা, অনলাইন যৌন নিপীড়ন, ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল এবং ডিজিটাল মাধ্যমে প্রলুব্ধ করার ঘটনা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট কিংবা অনলাইন; কোনো পরিবেশেই কন্যাশিশুর নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
আজ ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। বিশ্বজুড়ে কন্যাশিশুর অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও নেতৃত্বের গুরুত্ব তুলে ধরতে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘বাল্যবিবাহ বন্ধ করি, কন্যাশিশুর অধিকারে বিনিয়োগ করি’। বাংলাদেশ সরকার ১২ অক্টোবর জাতীয় কন্যাশিশু দিবস ২০২৬ পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সংবাদপত্রভিত্তিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে ১ হাজার ৯১৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৮৮৪টি ঘটনায় ভুক্তভোগী কন্যাশিশু। একই সময়ে ধর্ষণের ৩৩১টি ঘটনার মধ্যে ২৪০ জন ভুক্তভোগী ছিল কন্যাশিশু। ধর্ষণের পর হত্যার ৩৩টি ঘটনার মধ্যে ২২ জনই ছিল কন্যাশিশু। এ ছাড়া ধর্ষণচেষ্টার ১৩৬টি ঘটনার মধ্যে ১১২ জন ভুক্তভোগী কন্যাশিশু।
এর আগের বছর, ২০২৫ সালে সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৭৮৬ জন নারী ও কন্যাশিশুর তথ্য উঠে আসে। তাঁদের মধ্যে ৫৪৩ জনের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে। কন্যাশিশুদের মধ্যে ১৪২টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ২০৩টি আত্মহত্যা এবং ১১৭টি ধর্ষণচেষ্টার ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়।
অনলাইনেও নিরাপদ নয় শিশুরা
প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কন্যাশিশুর নিরাপত্তার ঝুঁকিও জটিল হচ্ছে। ভুয়া পরিচয়ে বন্ধুত্ব, অনলাইনে গ্রুমিং, অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন বার্তা, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং ব্ল্যাকমেইলের মতো ঘটনা শিশুদের মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ইউনিসেফের একটি গবেষণায় ২১ দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী আনুমানিক ২ কোটি শিশু এক বছরের মধ্যে প্রযুক্তির মাধ্যমে সংঘটিত কোনো না কোনো ধরনের যৌন শোষণ বা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এটি গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের মধ্যে প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজনের সমান। ভুক্তভোগীদের ৪০ শতাংশের বেশি কাউকে বিষয়টি জানায়নি এবং ১ শতাংশেরও কম ঘটনা পুলিশ, সমাজকর্মী বা হেল্পলাইনের মতো কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হয়েছে।
ইউনিসেফের এই গবেষণা বিশ্বজুড়ে শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। তবে এসব বৈশ্বিক পরিসংখ্যানকে সরাসরি বাংলাদেশের চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। বাংলাদেশের শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে আরও বিস্তৃত ও নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন।
পাচার ও যৌন শোষণের ঝুঁকি
দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, বাল্যবিবাহ এবং দুর্বল সুরক্ষাব্যবস্থা কন্যাশিশুকে শোষণ ও পাচারের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। চাকরি, ভালো জীবন কিংবা আর্থিক সহায়তার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিশু ও কিশোরীদের প্রলুব্ধ করার আশঙ্কাও রয়েছে। পাচারের শিকার শিশুদের বাণিজ্যিক যৌন শোষণসহ নানা ধরনের নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়।
শিশু সুরক্ষা শুধু অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে বিপদ এড়ানোর বিষয় নয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তি, সামাজিক সম্পর্ক কিংবা শিশুর আস্থার পরিবেশেও নির্যাতনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিবেশী ও সংশ্লিষ্ট সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর নজরদারি এবং জবাবদিহি জরুরি।
আইন থাকলেও বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে নারী ও শিশুর সুরক্ষায় বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা রয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার, অনলাইন হয়রানি ও ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলের মতো অপরাধ মোকাবিলায়ও আইনি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। তবে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি অপরাধের দ্রুত তদন্ত, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, মানসিক সহায়তা এবং অপরাধীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু অভিভাবকের নয়। সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম এবং সমাজের প্রত্যেকের ভূমিকা রয়েছে। শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা শেখানো, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় সচেতন করা এবং বিপদের কথা জানালে দোষারোপ না করে পাশে দাঁড়ানো জরুরি।
আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসে মূল প্রশ্ন তাই শুধু কন্যাশিশুর অধিকার নিয়ে আলোচনা নয়, বরং তাদের জন্য কতটা নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা যাচ্ছে। শিক্ষা, চলাফেরা, বন্ধুত্ব ও প্রযুক্তি ব্যবহারে ভয়মুক্ত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে না পারলে কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণ হবে না। নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে কার্যকর প্রতিরোধ, দ্রুত বিচার ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বিকল্প নেই।

































