আজতেকায় বিশ্বকাপের উদ্বোধন, বাইরে ব্যাপক সংঘর্ষ
- সর্বশেষ আপডেট ১২:৫৪:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
- / 112
মেক্সিকোর ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী আজতেকা স্টেডিয়াম রেকর্ড তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজন করে নতুন ইতিহাস গড়েছে। গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাতে এই মাঠেই এক চোখধাঁধানো ও জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্দা উঠেছে ২০২৬ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্টেডিয়ামজুড়ে ছিল আধুনিক আলোর ঝলকানি এবং মেক্সিকোর নানা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ফুটিয়ে তোলার চমৎকার প্রয়াস। এই মঞ্চে গান গেয়ে দর্শকদের মাতান বিশ্বখ্যাত পপস্টার শাকিরাসহ আরও বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক শিল্পী। তবে মাঠের ভেতরে যখন এই উৎসবের আমেজ চলছিল, তার ঠিক আগেই স্টেডিয়ামের বাইরে বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনরত বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
মেক্সিকো সিটি সময় দিবাগত রাত ১টায় স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার উদ্বোধনী ম্যাচটি শুরু হয়, যার ঠিক দেড় ঘণ্টা আগে অনুষ্ঠিত হয় এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। দেশটিতে চলমান তীব্র সামাজিক অস্থিরতা ও বড় ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটেই মূলত এই ম্যাচটি মাঠে গড়ায়। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ৮২ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই বিশাল স্টেডিয়ামের চারপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কঠোর ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় দুপুর ১টায় ম্যাচটি শুরু হওয়ার কথা থাকায় সাধারণ সমর্থক ও দর্শনার্থীদের অনেক আগেই স্টেডিয়ামে আসার জন্য বিশেষ পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। মেক্সিকো সিটির নাগরিক নিরাপত্তা সচিবালয় থেকে জানানো হয়, খেলা শুরু হওয়ার আগে স্টেডিয়ামের বাইরে প্রায় ২০০ জন মুখোশধারী ব্যক্তির একটি উগ্র দল আচমকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চড়াও হয় এবং সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। অবশ্য পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনে। এই সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২৮ বছর বয়সী এক নারীকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা হলেও পরবর্তীতে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এদিকে বিক্ষোভ ও সহিংসতার নিরাপত্তার স্বার্থে মেক্সিকো সিটি মেট্রো কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে কাছাকাছি কয়েকটি স্টেশন বন্ধ করে দেয়। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শহরের একটি ফ্যান জোনেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির একটি চেষ্টা চালানো হয়েছিল, যা পরে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে স্টেডিয়ামের বাইরে এসব বিচ্ছিন্ন উত্তেজনাকর ঘটনা ঘটলেও, খেলা দেখতে আসা অধিকাংশ সাধারণ ফুটবল সমর্থক কোনো বড় ধরনের ভোগান্তি বা বিলম্ব ছাড়াই নির্বিঘ্নে স্টেডিয়ামের ভেতরে প্রবেশ করতে পেরেছেন।
বিশ্বকাপের এই মেগা উদ্বোধনী ম্যাচের আগে থেকেই মেক্সিকোর সরকার এবং দেশটির জাতীয় শিক্ষক ইউনিয়নের (সিএনটিই) একটি বড় অংশের মধ্যে তীব্র বিরোধ ও লাগাতার বিক্ষোভ চলছিল। চলতি জুন মাসের প্রথম দুই দিনে আন্দোলনকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে প্লাস্টিকের তৈরি ফুটবলারদের বড় বড় ভাস্কর্যে আগুন ধরিয়ে দেয়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ তখন ব্যাপক কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছিল। এই আন্দোলনের কারণে মেক্সিকো সিটিতে এমন তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছিল যে স্বয়ং দেশের প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবম পর্যন্ত সময়মতো তাঁর জাতীয় প্রাসাদে পৌঁছাতে পারেননি।
এই চরম বিরোধের মূল কারণ হলো, প্রেসিডেন্ট শেইনবমের দেওয়া একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০০৭ সালের বিতর্কিত ‘আইএসএসএসটিই’ (ISSSTE) আইনটি বাতিল করার কথা ছিল, যা রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তাভিত্তিক সাধারণ পেনশন ব্যবস্থার কাঠামোকে বদলে দিয়েছিল। এই আইন বাতিলের দাবিতে সিএনটিই দেশজুড়ে টানা ১০ম দিনের মতো পূর্ণ ধর্মঘট পালন করছে, যার সরাসরি প্রভাবে বর্তমানে দেশের ১০ লাখের বেশি শিশু স্কুলে যাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি শিক্ষকদের এই সংগঠনটি শতভাগ বেতন বৃদ্ধির দাবিতেও অনড় রয়েছে।
শিক্ষকদের আন্দোলনের পাশাপাশি দেশে বাড়তে থাকা মাদক সহিংসতার বিষয়ে সরকারের চরম উদাসীনতার অভিযোগ তুলেও মেক্সিকোতে সাধারণ মানুষের বড় বিক্ষোভ হয়েছে। গত রবিবার একদল বিক্ষোভকারী আজতেকা স্টেডিয়ামের সংযোগকারী প্রধান সড়কটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। সেই সময় তাদের হাতে থাকা একটি বড় ব্যানারে লেখা ছিল— ‘ফিফা, চলে যাও’।
সার্বিক এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং শহরের যান চলাচল কিছুটা সহজ ও স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে মেক্সিকো সরকার গত ৯ জুন এক বিশেষ ঘোষণায় জানায়, ম্যাচের দিন রাজধানীর সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাস পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। এর আগে মে মাসে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় চলমান শিক্ষাবর্ষ নির্ধারিত সময়ের ৬ সপ্তাহ আগেই শেষ করার একটি আগাম সিদ্ধান্ত নিলেও, মাত্র ৫ দিন পর সেই সিদ্ধান্তটি আবার বাতিল করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে মাঠের বাইরের চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তাপ মাথায় নিয়েই মাঠের খেলায় গড়িয়েছে এবারের বিশ্বমঞ্চের লড়াই।


































