ঢাকা ০৮:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুফিয়ানের অবাক করা গল্প !

শিপুফরাজী, চরফ্যাশন প্রতিনিধি
  • সর্বশেষ আপডেট ০৫:৫৯:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
  • / 32

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আবু সুফিয়ান

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি “শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতার চিত্র। সমাজ তাঁকে অনেকটা করুণা বা অবহেলার চোখে দেখেই অভ্যস্ত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে সমাজের জন্য বোঝা মনে করা হয়। আর যদি হয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তাহলে তো কখাই নেই । তবে শারীরিক এই সীমাবদ্ধতার গ-ি পেরিয়ে নিজেকে সমাজে প্রমাণ করার অনেক উদাহরণও আছে।

তেমনই এক অদম্য কর্মজীবী মানুষ হলেন সুফিযান, যিনি দৃষ্টিহীন হওয়া সত্তে¦ও নিজের কর্মদক্ষতা ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহে সফল হয়েছেন। সুফিয়ানের শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করার এই ধরণের গল্প আমাদের সমাজে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং মানুষকে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে উৎসাহিত করে ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জন্ম থেকে পৃথিবীর আলো দেখেননি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুফিযান। তবুও প্রতিবন্ধকতাকে জয করে জীবনের সব হিসাব কষে এগিয়ে চলেছেন দৃঢ় মনোবল আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে। চরফ্যাশন পৌরসভার ৬নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবু সুফিয়ান (৩৩) দৃষ্টিশক্তির অভাবকে কখনো দুর্বলতা হতে দেননি।

বরং ১৫ বছর ধরে পরিচালনা করছেন নিজের ভ্রাম্যমাণ চায়ের দোকান, যা তাঁর জীবিকার পাশাপাশি আত্মসম্মানের প্রধান ভরসা।
চরফ্যাশন কলেজ রোডের পাশে প্রেসক্লাব সংলগ্ন স্থানে ভ্যানগাড়ির ওপর গড়া তাঁর ছোট দোকানটি প্রতিদিন জমজমাট থাকে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, টিউবওয়েল থেকে পানি এনে নিজেই চা তৈরি করছেন সুফিয়ান। ক্রেতারা চা, পান, সিগারেট কিংবা বিস্কুট চাইলে বিন্দুমাত্র ভুল না করেই তিনি হাতে ধরিয়ে দেন সঠিক পণ্য।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুফিয়ান বলেন, “জন্ম থেকেই দেখতে পাই না, তাই ‘ছোটবেলা থেকেই কিছু করার চেষ্টা করেছি। মা-বাবার মুখও কখনো চোখে দেখা হয়নি। শুধু কণ্ঠস্বর আর পর্শেই মানুষকে চিনেছি। চোখে দেখতে না পারলেও কাজ থেমে থাকলে চলে না। জানতাম পরিবার বেশিদিন আমার বোঝা বইতে পারবে না। এ কারণেই ১৮ বছর বয়স থেকে চায়ের দোকান করছি।”ব্যক্তিগত জীবনেও অসহায় মুহূর্ত এসেছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বলে অনেকে নিরুৎসাহিত করলেও আমার লক্ষ্যের প্রতি আমি স্থির ছিলাম ।

বিয়ের কয়েক বছর পর স্ত্রী নানা অজুহাতে চলে গেছেন। তবে সন্তানদের দায়িত্ব থেকে সরে যাননি তিনি। “দুই সন্তান আছে। ওদের মুখ দেখতে না পারলেও বাবা হিসেবে দায়িত্ববোধ আছে,” বলেন তিনি।প্রতিদিন লাঠির টোকায় টোকায় পথ চিনে বাড়ি থেকে দোকানে আসেন সুফিয়ান। নিয়মিত ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয় তাঁর দোকানে, লাভ থাকে প্রায় ২০০ টাকা। এই টাকায় চলছে মা, সন্তান ও বোনের সংসার।

পাশের ব্যবসায়ী মো তানভীর বলেন, সুফিযানের স্মৃতিশক্তি দেখে আমরা মাঝে মাঝে অবাক না হয়ে পারি না। চোখে দেখতে না পেলেও দোকান সামলানোর দক্ষতা ও সততা অবিশ্বাস্য। টাকার নোট ধরেই তিনি বলে দিতে পারেন কত টাকা। আমরা সবাই তাঁকে সম্মান করি। চরফ্যাশনের বাসিন্দা মামুন মাঝি জানান, দৃষ্টিহীন হয়েও পরিবারের ভরণপোষণ করছেন। এমন মানুষদের জন্য সমাজের সহযোগিতা প্রয়োজন।


চরফ্যাশন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মামুন হোসেন বলেন, “আবু সুফিয়ানকে সহায়ক ভাতার আওতায় আনার প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি তাঁর চায়ের দোকান উন্নয়নে সহযোগিতা দেওয়া হবে।”দৃষ্টিশক্তি নেই, তবু নিজের জীবনের রাস্তা খুঁজে নিয়েছেন সুফিয়ান। চায়ের দোকানের ধোঁয়া আর গরম পানির শব্দের মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন নিজের সম্মান ও বাঁচার শক্তি।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুফিয়ানের অবাক করা গল্প !

সর্বশেষ আপডেট ০৫:৫৯:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি “শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতার চিত্র। সমাজ তাঁকে অনেকটা করুণা বা অবহেলার চোখে দেখেই অভ্যস্ত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে সমাজের জন্য বোঝা মনে করা হয়। আর যদি হয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তাহলে তো কখাই নেই । তবে শারীরিক এই সীমাবদ্ধতার গ-ি পেরিয়ে নিজেকে সমাজে প্রমাণ করার অনেক উদাহরণও আছে।

তেমনই এক অদম্য কর্মজীবী মানুষ হলেন সুফিযান, যিনি দৃষ্টিহীন হওয়া সত্তে¦ও নিজের কর্মদক্ষতা ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহে সফল হয়েছেন। সুফিয়ানের শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করার এই ধরণের গল্প আমাদের সমাজে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং মানুষকে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে উৎসাহিত করে ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জন্ম থেকে পৃথিবীর আলো দেখেননি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুফিযান। তবুও প্রতিবন্ধকতাকে জয করে জীবনের সব হিসাব কষে এগিয়ে চলেছেন দৃঢ় মনোবল আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে। চরফ্যাশন পৌরসভার ৬নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবু সুফিয়ান (৩৩) দৃষ্টিশক্তির অভাবকে কখনো দুর্বলতা হতে দেননি।

বরং ১৫ বছর ধরে পরিচালনা করছেন নিজের ভ্রাম্যমাণ চায়ের দোকান, যা তাঁর জীবিকার পাশাপাশি আত্মসম্মানের প্রধান ভরসা।
চরফ্যাশন কলেজ রোডের পাশে প্রেসক্লাব সংলগ্ন স্থানে ভ্যানগাড়ির ওপর গড়া তাঁর ছোট দোকানটি প্রতিদিন জমজমাট থাকে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, টিউবওয়েল থেকে পানি এনে নিজেই চা তৈরি করছেন সুফিয়ান। ক্রেতারা চা, পান, সিগারেট কিংবা বিস্কুট চাইলে বিন্দুমাত্র ভুল না করেই তিনি হাতে ধরিয়ে দেন সঠিক পণ্য।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুফিয়ান বলেন, “জন্ম থেকেই দেখতে পাই না, তাই ‘ছোটবেলা থেকেই কিছু করার চেষ্টা করেছি। মা-বাবার মুখও কখনো চোখে দেখা হয়নি। শুধু কণ্ঠস্বর আর পর্শেই মানুষকে চিনেছি। চোখে দেখতে না পারলেও কাজ থেমে থাকলে চলে না। জানতাম পরিবার বেশিদিন আমার বোঝা বইতে পারবে না। এ কারণেই ১৮ বছর বয়স থেকে চায়ের দোকান করছি।”ব্যক্তিগত জীবনেও অসহায় মুহূর্ত এসেছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বলে অনেকে নিরুৎসাহিত করলেও আমার লক্ষ্যের প্রতি আমি স্থির ছিলাম ।

বিয়ের কয়েক বছর পর স্ত্রী নানা অজুহাতে চলে গেছেন। তবে সন্তানদের দায়িত্ব থেকে সরে যাননি তিনি। “দুই সন্তান আছে। ওদের মুখ দেখতে না পারলেও বাবা হিসেবে দায়িত্ববোধ আছে,” বলেন তিনি।প্রতিদিন লাঠির টোকায় টোকায় পথ চিনে বাড়ি থেকে দোকানে আসেন সুফিয়ান। নিয়মিত ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয় তাঁর দোকানে, লাভ থাকে প্রায় ২০০ টাকা। এই টাকায় চলছে মা, সন্তান ও বোনের সংসার।

পাশের ব্যবসায়ী মো তানভীর বলেন, সুফিযানের স্মৃতিশক্তি দেখে আমরা মাঝে মাঝে অবাক না হয়ে পারি না। চোখে দেখতে না পেলেও দোকান সামলানোর দক্ষতা ও সততা অবিশ্বাস্য। টাকার নোট ধরেই তিনি বলে দিতে পারেন কত টাকা। আমরা সবাই তাঁকে সম্মান করি। চরফ্যাশনের বাসিন্দা মামুন মাঝি জানান, দৃষ্টিহীন হয়েও পরিবারের ভরণপোষণ করছেন। এমন মানুষদের জন্য সমাজের সহযোগিতা প্রয়োজন।


চরফ্যাশন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মামুন হোসেন বলেন, “আবু সুফিয়ানকে সহায়ক ভাতার আওতায় আনার প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি তাঁর চায়ের দোকান উন্নয়নে সহযোগিতা দেওয়া হবে।”দৃষ্টিশক্তি নেই, তবু নিজের জীবনের রাস্তা খুঁজে নিয়েছেন সুফিয়ান। চায়ের দোকানের ধোঁয়া আর গরম পানির শব্দের মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন নিজের সম্মান ও বাঁচার শক্তি।