শিক্ষা, জেন্ডার ও জলবায়ুবান্ধব বাজেটের দাবি
- সর্বশেষ আপডেট ০৯:০১:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
- / 18
নতুন সরকার প্রথমবারের মতো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে যা সরকারেরর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি সুযোগ।
সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লিখিত অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যুবদের দক্ষতা উন্নয়ন, জেন্ডারসমতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রথম উদ্যোগ হতে যাচ্ছে এই বাজেট।
তবে সামগ্রিক অর্থনীতিতে বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং জলবায়ুজনিত সংকটের মুখে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী – বিশেষ করে নারী, যুবদের ও জলবাযু পরিবর্নের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই সুরক্ষাকবচ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের চাহিদার সুষম সমন্বয় ঘটিয়ে একটি জনবান্ধব ও ভবিষ্যতমুখী সামষ্টিক অর্থনৈতিক রূপরেখা প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে একশনএইড বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ভবিষ্যতে বিনিয়োগের সময় এখনই: নারী, তরুণ ও জলবায়ু সুরক্ষায় জনবান্ধব বাজেট’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, গবেষক, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, একাডেমিয়া ও সরকারি নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা তৃণমূলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে আলোকপাত করেন।
সংলাপে বিগত পাঁচ বছরের (২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬) জাতীয় বাজেটের একটি বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে দেখানো হয় যে, দেশে সামগ্রিক বাজেটের আকার ক্রমান্বয়ে বাড়লেও প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জেন্ডার বাজেটের মতো টেকসই উন্নয়নের নিশ্চিতকরণে বরাদ্দের ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থবিরতা বা সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
পাশপাশি বাজেটের গুণগতবাস্তবায়ন ও ফলাফল অর্জন ভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ খুবই গরুত্বপূর্ণ।
তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও বরাদ্দের বর্তমান চিত্র
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত একশনএইড বাংলাদেশ-এর বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপির ২.০৮ শতাংশ থেকে ক্রমান্বয়ে কমে ১.৭২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে, ৪৪টি মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার বাজেট প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করলেও নারীদের মাঠপর্যায়ের সুরক্ষা ও সামাজিক সেবার পরিধি আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে; বর্তমানে জেন্ডার বাজেটের আকার জিডিপির ৫.৭ শতাংশ থেকে কিছুটা সংকুচিত হয়ে ৪.২ শতাংশে অবস্থান করছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারীদের প্রত্যক্ষ জনসেবা এবং নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট উপখাতগুলোতে গত এক বছরে বরাদ্দ কিছুটা হ্রাস পাওয়ার কারণে তৃণমূল পর্যায়ে সহিংসতা প্রতিরোধ ও আইনি সহায়তার মতো উদ্যোগগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র ঝুঁকিতে থাকলেও এডিপি-তে (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বরাদ্দ মাত্র ২.৮৯ শতাংশ, যেখানে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (NAP), ও এনডিসি (NDC) বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে এক বিশাল ঘাটতি রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বক্তারা।
২০২৬ সালের বাজেট: জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ
সরকারের নীতিনির্ধারণে এখন ‘মানুষকেন্দ্রিক’ দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন) ড. সাইমুম পারভেজ। তিনি বলেন, আগের তুলনায় এখন নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণ অনেক বাড়ছে।
জলবায়ু ও উন্নয়ন অঙ্গীকারগুলোর ক্ষেত্রে নির্বাচনী ইশতেহার থেকে বাস্তব রূপান্তর এখন স্পষ্ট দৃশ্যমান উল্লেখ করে তিনি বলেন, “জলবায়ু অর্থায়ন, ঋণ, আন্তর্জাতিক তহবিল এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়কে এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।”
ড. সাইমুম পারভেজ আরও জানান, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য থেকে শক্তি (waste-to-energy) এবং বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের ধারণা নিয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও কার্বন ট্রেডিংয়ের মতো নতুন উদ্যোগও বাস্তবায়নের পথে রয়েছে, যেখানে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের কার্বন ট্রেডিংয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও যুব উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে একটি জলবায়ু-সচেতন, জেন্ডার-রেসপনসিভ ও মানুষকেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেল গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সবুজ উদ্যোগের জন্য প্রণোদনার বিষয়ে সম্মত হয়ে পরিকল্পনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোঃ গোলাম মোছাদ্দেক জানান, সরকারের মূল লক্ষ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আয় বৈষম্য হ্রাস। ইতোমধ্যে ১৫টি খাতে ক্লাইমেট জাস্টিস যুক্ত করা হয়েছে এবং স্বচ্ছতা বাড়াতে ১০০% ডিজিটাল রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড চালু করা হয়েছে।
দক্ষতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া উন্নয়ন অধরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, “শুধু জিডিপি বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না। তরুণরা যদি শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে না পারে, তবে উন্নয়নের সুফল মিলবে না।” জেন্ডার বাজেট কমে যাওয়ার প্রবণতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এটি নারীদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সুযোগকে ঝুঁকিতে ফেলবে। ‘গ্লাস সিলিং’ ভাঙতে নারী প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ে রাষ্ট্রীয় সহায়তার মতো বৈপ্লবিক পদক্ষেপের পরামর্শ দেন তিনি।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন জানান, যুব উন্নয়ন বাজেট এখন ‘বছরব্যাপী কর্মসূচি’ হিসেবে কাজ করছে। তরুণদের জন্য ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত এসএমই (SME) ঋণ ও আউটসোর্সিংয়ে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। তবে বাজেট প্রক্রিয়াকে আরও অংশগ্রহণমূলক করার ওপর জোর দেন তিনি।
জেন্ডার বাজেট শুধু ‘নারীদের আলাদা বরাদ্দ’ নয়
অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, “জেন্ডার বাজেটকে শুধুমাত্র নারীদের জন্য আলাদা বরাদ্দ হিসেবে দেখা ভুল; এটি সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কাঠামোর অংশ।” বাস্তবে বরাদ্দের বড় অংশই প্রশাসনিক পর্যায়ে শেষ হয়ে যায় উল্লেখ করে তিনি অবৈতনিক কাজের স্বীকৃতি, নিরাপদ পরিবহন ও তৈরি পোশাক খাতের বাইরে কর্মসংস্থান বিস্তৃত করার তাগিদ দেন।
জলবায়ু অর্থায়ন: বরাদ্দের চেয়ে বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ
জলবায়ু অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ ড. আহসান উদ্দিন আহমেদ এক চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরে বলেন, “গত এক দশকে প্রায় ২৫টি মন্ত্রণালয় জলবায়ু কার্যক্রমে যুক্ত হলেও গড় বাস্তবায়ন সক্ষমতা মাত্র ৭ শতাংশ।” দুর্বল জবাবদিহিতার কারণে জলবায়ু ঝুঁকি কমছে না উল্লেখ করে তিনি শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থার দাবি জানান।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক শারমিন্দ নীলোর্মি বলেন, নারী, তরুণ ও জলবায়ু ইস্যুকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক প্রকল্প বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং ঋণনির্ভর উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
সংলাপে অংশ নিয়ে এ সময় তিনি নারী কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মোসাম্মৎ নীপা আক্তার বলেন, “সরকার উন্নতমানের বীজ বরাদ্দ দিলেও মাঠপর্যায়ে নারীরা তা যথাযথভাবে পাচ্ছেন না। নারী কৃষকদের স্বাবলম্বী করতে এবং দেশের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন বাড়াতে এই বৈষম্য দূর করা জরুরি।”
জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি-পরামর্শসমূহ: সংলাপ থেকে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিবেচনার জন্য অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও সুনির্দিষ্ট কিছু কৌশল ও নীতিগত-সুপারিশ পেশ করা হয়:
– ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় (TVET) নারীর অংশগ্রহণ ৪০ শতাংশে উন্নীত করা এবং একটি বিশেষ ‘নারী উদ্যোক্তা তহবিল’ গঠন করা। ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (OCC) ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার আওতা বাড়ানো, নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করা এবং তৃণমূল পর্যায়ে জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা রোধে স্থানীয় সরকার খাতে পৃথক বরাদ্দ দেওয়া।
– ২০২৮ সালের মধ্যে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করা। যুব বাজেটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘ইয়ুথ বাজেট স্টেটমেন্ট’ প্রকাশ ও রিয়েল-টাইম পাবলিক ট্র্যাকিং ড্যাশবোর্ড চালু করা। উপকূলীয় ও ডিজিটাল খাতের তরুণদের জন্য ‘ইয়ুথ এন্টারপ্রেনারশিপ ফান্ড’ ৬০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা।
– জলবায়ুর ক্ষতিপূরণ (Loss and Damage) এবং অভিযোজনের (Adaptation) জন্য সুনির্দিষ্ট ও পৃথক বাজেট কোড তৈরি করা। স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু তহবিল সরাসরি হস্তান্তরের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
সংলাপের উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে ঢাবির আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমিন জেন্ডার বাজেট ও আইন থাকা সত্ত্বেও কার্যকর সমন্বয় এবং সুনির্দিষ্ট বরাদ্দের অভাবে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা কমছে না বলে উল্লেখ করে উন্নয়ন বাজেটে এর সরাসরি স্বীকৃতি ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য কৌশলগত বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন।
এছাড়াও সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতনসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা জলবায়ু-ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ, ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটির নেতা, প্রতিবন্ধী তরুণ ও তৃণমূলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা তাঁদের দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশার কথা নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরেন।

































