ঢাকা ০১:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

প্রতিবন্ধী নারীদের অভিজ্ঞতা চ্যালেঞ্জ ও নেতৃত্বের গল্প-১

রীতা ভৌমিক, সিনিয়র প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৭:০৭:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ অক্টোবর ২০২৫
  • / 233

আশরাফুন নাহার মিষ্টি।

পরিবার-সমাজের নির্যাতন, অবহেলার সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন অনেক প্রতিবন্ধী নারী। এখনও লড়াই করছেন। তাদের অনেকে লেখাপড়া শিখে, প্রশিক্ষণ নিয়ে, কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সমাজে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। শুধু নিজের জায়গা তৈরি করেননি, তাঁর মতো অন্য নারী-পুরুষ উভয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছেন। এমন প্রতিবন্ধী নারীদের প্রতিনিধিত্বের সংখ্যাও ধীর গতিতে হলেও বাড়ছে।

তবে প্রতিবন্ধী নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে তাদের চ্যালেঞ্জগুলোকেও মোকাবিলা করতে হবে। আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের মতো প্রতিবন্ধী নারীরও সমান মর্যাদা, প্রজননস্বাস্থ্য, কাজের স্বীকৃতি পাওয়া তার সাংবিধানিক অধিকার।

যদিও জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ এর প্রতিটি ধারায় প্রতিবন্ধী নারীর অধিকারের কথা উল্লেখ রয়েছে।

জাতিসংঘ সনদ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং এসডিজি-এর আলোকে নারী, শিশু ও বয়স্ক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ প্রান্তিক পর্যায়ের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সম-সুযোগের বিষয়টিতে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তবে এই আইনে স্বাস্থ্যের কথা উল্লেখ থাকলেও প্রতিবন্ধী নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের কথা উল্লেখ নেই।

জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল, ২০১৫-এ নারী, শিশু, বয়ষ্ক ও প্রতিবন্ধী জনগণের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার এই কৌশলে সকল অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী জনগণের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরিতেও অঙ্গীকারাবদ্ধ।

সমাজসেবা অধিদপ্তর যদিও প্রতিবন্ধী ভাতা ও শিক্ষা ভাতা প্রদানেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এরপরও ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন প্রতিবন্ধী নারীরা। উইম্যান উইথ ডিজাব্লিটিজ ডেভেলপম্যান্ট ফাউন্ডেশনের (ডাব্লি উডিডিএফ) নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি এসব প্রতিবন্ধী নারীর অধিকার আদায়ে কাজ করছেন। তিনি নিজেও একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কাছে হার মানেননি তিনি। কিন্তু এতোটা পথ পাড়ি দিতে অনেক লড়াই করতে হয়েছে তাকে। এইচএসসি পড়ার সময় প্রতিবন্ধিতার শিকার হন তিনি। তার যমজ বোন জেলা সদরে কোচিং সেন্টারে কোচিং করতে পারলেও প্রতিবন্ধিতার কারণে উপজেলা থেকে হুইল চেয়ার নিয়ে তিনি কোচিং করতে যেতে পারেননি। কারণ একদিকে তার গণপরিবহনে ওঠা-নামা, রিজার্ভ পরিবহনে যাওয়া, অন্যদিকে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় ক্লাশ করাও সম্ভব ছিল না। তার বোন স্পোকেন ইংলিশ, কম্পিউটার শিখতে পারলেও তিনি পারেননি এসব জায়গায় প্রবেশগম্যতা না থাকার কারণে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই সে ব্যবস্থা ছিল না । মাস্টার্স সম্পন্ন করে এমফিলে ভর্তি হন মিষ্টি। কিন্তু এমফিল সম্পন্ন করতে পারেননি। এভাবে তিনি শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।

প্রতিবন্ধী নারীদের উন্নয়নে আশরাফুন নাহার মিষ্টি ২০০৭ সালে একটি সংগঠনের মাধ্যমে কাজ শুরু করেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তিনি বুঝতে পারেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে কোনো ব্যবস্থা নেই। এরপরও সমস্ত প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে পুরুষরা কোথাও কোথাও কাজের ব্যবস্থা করলেও নারীদের ক্ষেত্রে তা একেবারেই অসম্ভব।

কারণ একজন প্রতিবন্ধী পুরুষ তার ভাই, বন্ধু বা প্রতিবেশীর সহযোগিতায় বা তাকে সাথে নিয়ে বাড়ির বাইরে যেতে পারেন। তারা তাকে রিকশা বা সিএনজি, বাসে কোলে করে তুলে দিতে পারেন। কিন্তু একজন প্রতিবন্ধী নারীর ক্ষেত্রে এটা সম্ভব নয়। একজন পুরুষের সহযোগিতা নিয়ে বিভিন্ন যানবাহনে চড়তে পারবেন না। কোনো প্রতিষ্ঠানে র‌্যাম বা লিফট না থাকলে সিঁড়িতে প্রতিবন্ধী নারীকে পুরুষের তুলে দেওয়াকে সমাজ ভালো চোখে দেখবে না।

এ ব্যাপারে আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র, বিনোদন কেন্দ্র, অফিস আদালত, ব্যাংকে যাতায়াতের কোনো উপযোগী ব্যবস্থা না থাকলে প্রতিবন্ধী নারীরা এগুতে পারবেন না। প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য প্রকৃত পরিবর্তন না এলে তারা কোনো সমার্থক সুবিধা পাবেন না।

এ বিষয়গুলো বিবেচনা করে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভেবেছি আমাদের আগামী প্রজন্মের প্রতিবন্ধী নারীদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করবো। তারা যেন আমাদের মতো বাধার সম্মুখীন না হয়। সে লক্ষ্যে উইম্যান উইথ ডিজাব্লিটিজ ডেভেলপম্যান্ট ফাউন্ডেশন (ডাব্লিউ ডি ডি এফ) নামে সংস্থার মাধ্যমে আমরা প্রতিবন্ধী নারীরা একত্রিত হয়ে আওয়াজ তুলি ।
এই সংগঠনের মাধ্যমে প্রচার শুরু করি। কিছুদিন অন্য প্রতিবন্ধী সংগঠনগুলো বুঝতে পারেনি প্রতিবন্ধী নারীরা আলাদা একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে যাচ্ছি। কিন্তু নারী সংগঠনগুলো আমাদের সেভাবে গ্রহণ করেননি।

নারী সংগঠনগুলোর সভায় অংশ নেওয়ার একদিনের অভিজ্ঞতা তিনি তুলে ধরেন। সিডও প্ল্যাটফর্ম নিয়ে আলোচনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্টেপস স্টুয়ার্ডসের একটি সভায় অংশ নেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিরিন আখতার ও তিনি । সেখানে একজন নারী নেত্রীর সাথে তার দেখা হয়। তিনি তাকে অবাক হয়ে দেখেন, সিএনজি থেকে হুইল চেয়ার নিয়ে কিভাবে নামলেন। হুইল চেয়ার খুলে বসলেন। অন্যদের সহযোগিতায় তারা সিঁড়ি দিয়ে উঠে সভাকক্ষে প্রবেশ করেন। সেদিন কেউ তাদের সাথে কথা বলেননি। বরং যিনি সিএনজি থেকে নামতে দেখেছিলেন, তিনি তাদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘আপনাদের এখানে এত কষ্ট করে আসার কি দরকার ছিল। এত কষ্ট করে, আমরাই চলতে পারি না! আপনাদের কথাটা একটা চিরকুটে লিখে দিলে হতো।’
এটা ছিল তার নারী আন্দোলনের প্ল্যাটফর্মের প্রথম আলাপচারিতা। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নারী নেত্রীরা কেউ বলেননি, ওদের আসার দরকার আছে। যিনি তাদের সভায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনিও কোনো কথা বলেননি। তাহলে কি পুরুষরা, নারী নেত্রীরা তাদের প্রবেশগম্যতাকে গ্রহণ করছেন না। তাদের চেষ্টা কি বৃথা যাবে! এই প্রশ্নটি রাষ্ট্র, সমাজের কাছে রেখেছিলেন আশরাফুন নাহার মিষ্টি।

তিনি দমে যাননি। বরং শপথ নেন, জাতীয় পর্যায়ে নারী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, একবছর পর ড্রাফট রিপোট তৈরি হয়। কিন্তু সেখানে প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক কোনো শব্দ ছিল না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কমসংস্থান, গ্রামীণ নারী যতগুলো আর্টিকেল আছে সেখানে আমাদের মতামত নেই। সেদিন তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলাম, ‘সম্মান রেখে আপনাদেরকে বলছি, একটি বছর আমরা আপনাদের সাথে ছিলাম। আপনারা রিপোর্ট প্রস্তুত করেছেন। কিন্তু কোথাও আমাদের কথা উল্লেখ নেই। তারা বলেছেন, আমরা রিপোর্টটা তো কনসালটেন্ট দিয়ে করিয়েছি, কনসালটেন্ট ইস্যুটা বাদ দিয়েছে। কিন্তু আমরা তো এই সমাজেই বসবাস করি!

অন্যদিকে প্রতিবন্ধী পুরুষদের আন্দোলনে আমাদের অবহেলা, বঞ্চনা, কটাক্ষের শিকার হতে হয়েছে। তারা বলেছেন, আমাদের ৩০০ সংগঠন, আপনাদের জন্য আলাদা সংগঠন করার কী দরকার ছিল। তহবিল নেই। আপনারা কেনো এই ঝামেলার মধ্যে আসলেন!

আশরাফুন নাহার মিষ্টি এর প্রতিত্ত্যুরে বলেছেন , আপনারা প্রতিবন্ধী ইস্যুতে যখন কথা বলবেন, প্রতিবন্ধী নারীদের চাহিদার কথাও রয়েছে। তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য , চাকরি, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এই বিষয়গুলোও রয়েছে। এজন্য আমাদের উপস্থিতি দরকার। এ নিয়ে আমরা আওয়াজ তুলতে চাই। তাদের লিডারশিপ নষ্ট করতে অনেকেই চেষ্টা করেছেন। বিভিন্ন ফোরামে অনেক আলোচনা, সমালোচনা, অপমানের সম্মুখীনও হয়েছেন। কিন্তু তারা থেমে থাকেননি।

অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে এভাবেই শুরুটা করেছিলেন আশরাফুন নাহার মিষ্টি । প্রতিবন্ধী নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য , কর্মসংস্থান, বাসস্থান উপযোগী পরিবেশের অধিকারের জন্য যেমন সংগ্রাম করেছেন। তেমনি রাজধানীর ফুটপাতে চলাচলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রবেশগম্যতার জন্যও সংগ্রাম করেছেন। ফুটপাতে যাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা হাঁটতে পারেন, হুইল চেয়ারে চলাচল করতে পারেন, বাসে উঠতে পারেন। তাদের এডভোকেসির কারণেই ঢাকার উত্তরা, কিছু অংশে ফুটপাতের মাথার অংশ ঢালু হয়েছে। কিন্তু সেখানেও বাধা সৃষ্টি হয়েছে ফুটপাতের উপর মটরসাইকেল চলাচল করায়। এ কারণে খুঁটি, স্টিলের রড দিয়ে ফুটপাতের মাথা বন্ধ করে দিয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বললেও কাজ হয়নি।

অন্যদিকে ফুটপাত উঁচু হওয়ায়, বয়স্ক, অসুস্থ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী চার ধরনের জনগোষ্ঠীর কেউ ব্যবহার করতে পারেন না। ফুটপাতের প্রবেশগম্যতার সুবিধা কেবল প্রতিবন্ধী নারীদের জন্যই প্রযোজ্য নয়, চার ধরনের জনগোষ্ঠীর জন্যই দরকার। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লিফট, র‌্যাম না থাকা অর্থাৎ শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপরে ওঠা প্রতিবন্ধীবান্ধব না হওয়ার কারণে সমাজের সব মানুষের মতো একই তালে এগিয়ে যেতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। এটা শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী প্রতিবন্ধী ব্যক্তির চাহিদা হতে পারে হুইল চেয়ার, সাদা ছড়ি বা সানগ্লাস, একটা ম্যাগনেফাইড গ্লাস। এই জিনিসগুলো তার জীবনকে চালানোর জন্য প্রয়োজন। এটা তার বিশেষ চাহিদা নয়। এটা তার জীবনের প্রয়োজনীয় চাহিদা। মানুষের প্রতিবন্ধিতা বা অক্ষমতা বিবেচনা করে তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব ।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করতে গিয়ে চলাচলে প্রতিবন্ধকতার শিকার হন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যামের সামনে খুঁটি গেড়ে দেওয়া হয়েছে। তার মতে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাপনাকে যদি এভাবে নষ্ট করে দেয়, তাহলে ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা ডিগ্রি নিয়ে বের হবেন তারা প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে কি ধারণা নিবে। তাদের ধারণা থাকা দরকার ছিল, আমাদের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সংযুক্ত যেসকল কর্মকর্তা রয়েছেন তাদের সাময়িক বা স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধিতার শিকার হতে পারেন। সড়ক দুঘটনা, অসুখ, বিসুখের কারণে। তাহলে তারা কি তাদের দায়িত্বের জায়গা থেকে ছিটকে পড়বেন। তাদের বহিষ্কার করা হবে। তাদেরকে চাকরিচ্যুত করা হবে। তারা যে সম্মানজনক পজিশনে অবস্থান করছেন সেখান থেকে তাকে বাদ দেওয়া হবে। এই ধরনের অসংখ্য চ্যালেঞ্জ আমাদের সমাজে রয়েছে।

একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সমস্ত ইন্দ্রিয় অন্য সব স্বাভাবিক মানুষের মতোই। তারা যে কোনো রোগে ভুগতে পারেন। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ডাক্তার দেখাবেন। এটাই স্বাভাবিক চিত্র হওয়ার কথা। কিন্তু এখানেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নানারকম প্রতিবন্ধিতার শিকার হন। একটি উদাহরণ দিয়ে আশরাফুন নাহার মিষ্টি জানান, তার দুই সহকর্মীর একজনের একটি পা খাটো। আরেকজন এক পা আরেক পায়ে ভর করে হাঁটেন। তারা দাঁতের চিকিৎসক দেখাবেন। একজন ওয়ার্ড বয় তাদের দেখে বলেন, ডা. সফিউল্লাহ নয়, ডা. বিল্লালের কাছে যান। তাদের ধারণা একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির আর কোনো শারীরিক, মানসিক সমস্যা হতে পারে না। এ জায়গাটাতেও আমরা কাজ করছি।

পাঁচটি বিভাগে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে শেল্টার হোম রয়েছে । বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হয়ে প্রতিবন্ধী নারীরা আইনগত সহায়তা গ্রহণ করেন। বাড়িতে নিরাপত্তাহীনতার কারণে বিচারচলাকালীন এই সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকেন। এখানকার ব্যবস্থাপনাও প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য প্রযোজ্য নয় ।

স্থাপত্য অধিদপ্তর ও মহিলা অধিদপ্তরের যৌথ অনুমতি নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শেল্টার হোম পরিদর্শন করেন তিনি। তিনি বলেন, এখানে র‌্যামের ব্যবস্থা নেই। এ ব্যাপারে রাজশাহীর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর সাথে কথা বলেন। প্রধান প্রকৌশলী জানান, ‘ডিজাইনের মধ্যে র‌্যামের উল্লেখ নেই।’

রাজশাহীর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, আপনারা ভালো কাজে এসেছেন, এটা আমি অবশ্যই করে দিবো। প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য শেল্টার হোম অবশ্যই প্রবেশগম্যতা হবে।

তিনি আরো বলেন, আপনারা আরেকটি কাজ করে যেতে পারেন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের লিফটটা দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট । এটা রোগীদের জন্য উপযোগী নয়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের সাথে কথা বলে যান। অধ্যক্ষের সাথে দেখা করেন তিনি। অধ্যক্ষ একজন বিগ্রেডিয়ার ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আপনাকে কে বলেছে, আমাদের এখানে প্রতিবন্ধী রোগী সেবা নিতে আসেন। এখানে প্রতিবন্ধী রোগীর সেবা দেওয়া হয় না। যাদের হার্ট, কিডনি, মস্তিষ্কের সমস্যা হবে তাদের সেবা দেয়।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি তাকে জানান, এখনি তো তিনজন প্রতিবন্ধী রোগী এসেছেন সেবা গ্রহণ করতে।

অধ্যক্ষ নির্দ্বিধায় স্বীকার করে বলেন, ‘ আমি তো এগুলো জানি না। কারণ রোগীদের ফরমে কোথাও কোনো প্রতিবন্ধিকতা কথা উল্লেখ নেই ।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি তাকে অবগত করেন, রেজিস্ট্রেশন ফরমে বা যেখানে রেকর্ড করা হয় সেখানে উল্লেখ থাকতে হবে রোগীর প্রতিবন্ধিতা আছে কিনা? যদি থাকে সেখানে ধরনটা উল্লেখ করতে হবে। শারীরিক, বুদ্ধি, দৃষ্টি, বাক, মানসিক ইত্যাদি ১২ ক্যাটাগরির প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ধরণ উল্লেখ করতে হবে।

একই ঘটনা বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ, চিটাগাং মেডিকেল কলেজেও হয়েছে। অধিদপ্তরে ফোন করে ডিজাইন বের করে তাকে বলে দিতে হয়েছে কত নাম্বার পৃষ্ঠার কত কলাম। একটি মেডিক্যাল কলেজের প্রধান জানেন না, একজন চিকিৎসক প্রতিবন্ধী মানুষদেরও তো এই সমস্যা হতে পারে।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি প্রধান প্রকৌশলীকে বলেছিলেন, ভবনের ডিজাইনটা দেখেন, এত নাম্বার পৃষ্ঠায় রয়েছে। প্রধান প্রকৌশলী ডিজাইন বের করতে পারেননি।

চিটাগাং মেডিকেল কলেজের প্রশাসনও তাকে জানায়, মেডিকেল অফিসারদের অনেক লোড নিতে হয়। লোকবল অত্যন্ত কম। তারা যেখানে তথ্য সংযুক্ত করেন, সেখানে আরেকটা মানুষের তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। তারা মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলার পরামশ দেয়। এও বলেন, যদি একজন করে লোক দেয়, তাহলে এই ডাটা সংগৃহীত হবে। এর অর্থ সরকারের যে কাজগুলো রয়েছে এসডিজি বাস্তবায়ন করবে ২০৩০ সালের মধ্যে, এই এসডিজি বাস্তবায়নে যে থিম রয়েছে, কাউকে পিছিয়ে ফেলে নয়, এটা তারা অজন করবে, তা তারা অজন করতে পারবে না। কারণ ডাটা সংগৃহীত করার সময় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কথা সংযুক্ত করা হচ্ছে না।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি এভাবেই কাজ করছেন প্রতিবন্ধী নারী-পুরুষ উভয়ের জীবনমান্নোয়নে। তিনি বলেন, আমরা আলাদা কিছু চাই না। চাই অন্তর্ভুক্তিমূলক আশ্রয়কেন্দ্র, শেল্টারহোম হবে। এই শেল্টারহোমগুলোতে প্রতিবন্ধী নারীরা অপ্রতিবন্ধী নারীদের পাশাপাশি থাকবেন। তাহলে অপ্রতিবন্ধী নারীরা প্রতিবন্ধী নারীদের প্রতি সংবেদনশীল হবে। কারণ উভয়ে নির্যাতনের শিকার হন। তারা একই সমাজে বেড়ে উঠবেন। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা লিঙ্গ ভিত্তিক, বয়স ভিত্তিক তথ্য সংযুক্ত করতে হবে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণের দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডাক্তারদের। আমরা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি অবগত করেছি।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সুরক্ষা আইন ২০১৩ হয়েছে, এর আলোকে ২৮টি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করণের জন্য যখন সমাজসেবার কাছে যাওয়া হয়, তারা তাদেরকে এক ধরনের দুভোগের মধ্যে ফেলে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডাক্তাররা আরেক ধরনের দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে। এরফলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সবাই সরকারের প্রতিবন্ধিতা চিহ্নিতকরণের সেবা পাচ্ছে না। দেখা যায়, ১০০ জনের মধ্যে ৩০ জন চিহ্নিতকরণ সেবা পাচ্ছে। বাকিরা জানেই না এই সেবা পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, বগুড়ায় ডাক্তাররা একটি সেমিনারে বলেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি জেলা-উপজেলা সমাজসেবা অফিসে যেন একজন ডাক্তার নিয়োগ দেন প্রতিবন্ধিতা চিহ্নিতকরণের জন্য। কারণ জেলা-উপজেলা পর্যায়ের ডাক্তাররা অনেক ব্যস্ত থাকেন। তাহলে অন্তর্ভুক্তি কিভাবে হবে। সমাজসেবা ছাড়া অন্যান্য দফতর তাদের দায়িত্ব পালনে আগ্রহী নয়।
প্রতিবন্ধী ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি, ঋণ ইত্যাদি নিয়ে তিনি বলেন, শারীরিক ও এসিড দগ্ধ নারীদের জন্য ঋণটা প্রদানের ব্যবস্থা ছিল। বছর দুয়েক-তিনেক ধরে ঋণ বন্ধ।

আইন মন্ত্রণালয়ের ৫টি কমিটি -কার্যকরী কমিটি, জেলা কমিটি, উপজেলা কমিটি, শহর কমিটি রয়েছে। এই কমিটির ভেতরে সরকারের ইউএনও, ডিসি, পুলিশ, অন্যান্য কর্তৃপক্ষ জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে এবং প্রতিবন্ধী সংগঠনের একজন নারী ও পুরুষ থাকেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এই কমিটির মিটিং হয় না। কমিটির সদস্যরা জানেনও না, তারা এই কমিটিতে রয়েছেন।

বিশেষ শিক্ষা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, অটিজম, ডাউন সিমড্রোম ব্যক্তির দরকার। সেলিব্রাল পালসি থেকে আরম্ভ করে বাকিরা সবাই সাধারণ শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত হতে পারবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গায় যেতে পারবে। এভাবে অন্তর্ভুক্তি উত্তরণ হবে।

সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজের অন্যসব মানুষের সাথে একত্রিতভাবে, মিলিতভাবে জীবন যাপন করতে দিতে আগ্রহী নয়। এটা তাদের এক ধরণের মানসিক সমস্যা। সরকারের নিয়ম কানুনের মধ্যে রয়েছে সমন্বিত ব্যবস্থা হতে হবে। তাহলে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করবে সমাজসেবার সাথে অন্যান্য মন্ত্রণালয় জানালেন তিনি।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের কর্মকান্ডের সুবিধাগুলো প্রতিবন্ধী নারীরা পাবেন । অথচ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় বলছে আপনাদের দায়িত্ব আমাদের না। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে দুটো সেবা রয়েছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার স্তর অনুযায়ী শিক্ষা উপবৃত্তি। আরেকটি ভাতা। একজন শিক্ষার্থী দুটো সুবিধা পাবে না। এজন্য অনেকে আজীবন ভাতা পাওয়ার জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি না নিয়ে ভাতা নিয়েছেন। শিক্ষা উপবৃত্তি না নেওয়ায় কোটা পূরণ না হওয়ায় এর হার বাড়েনি। কারণ শিক্ষকরা তাদের ভাতা নেওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করেছেন। ভাতাটা দেওয়া হয় একজন প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনযাপন, চলাফেরা, ওষুধপত্র দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য। শিক্ষার্থীদেরও এই জিনিসগুলো প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষা উপবৃত্তি দেওয়া হয়, ভতি হওয়া, টিউশন ফি, বেতন প্রদান, খাতা, পেন্সিল, কলম কেনার জন্য। তাহলে একজন শিক্ষার্থী কেনো দুটো সেবা সমাজকল্যাণ থেকে পাবে না।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ও একই কথা বলছে। কোথাও কোথাও জেলা উপজেলা পর্যায়ে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় কিছু সুবিধা প্রতিবন্ধী নারীদের দিতে চাচ্ছে টার্গেট পূরণের জন্য। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে আপনারা দিতে পারবেন না। কারণ সরকারের নিয়ম রয়েছে, কেউ যদি সরকারের একটি সুবিধা পায়, আরেকটি সুবিধা পাবে না। একজন প্রতিবন্ধী নারীর অসুবিধা মাল্টিপল। নারীত্বের কারণে, প্রতিবন্ধিতার কারণে, মাইনোরিটি রিলিজিয়াস কমিটির হলে, ধর্মের কারণে, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে হলে তার নৃতাত্ত্বিকতার কারণে। একজন প্রতিবন্ধী নারী মাল্টিপল চ্যালেঞ্জ নিয়ে জীবন যাপন করে তাহলে সে যদি মাল্টিটল সুবিধা না পায় তাহলে চ্যালেঞ্জ উত্তরণ করবে কিভাবে!

আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মায়েদের মধ্যে যাদের মনোবল দৃঢ় আছে। তাদের মধ্যে কজন ভাবেন, আমার প্রতিবন্ধী সন্তানকে অন্তর্ভুক্তি সমাজে রেখে যাবো। এরকম কয়টি পরিবার রয়েছে। আমাদের দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বেশির ভাগ পরিবার নিরক্ষর, অর্থনৈতিক দুর্বল । প্রতিবন্ধী সন্তান হলে, সেই সন্তানের শিক্ষার সব্বোর্চ স্তরে যাওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

তিনি বলেন, আমাদের এসডিজির অগ্রগতি পরিমাপের জন্য একটা সিস্টেম আছে। এসডিজির মধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি হচ্ছে কিনা তা তা পরিমাপ করার ব্যবস্থা নেই। বিবিএসের তথ্যের সাথে সমাজকল্যাণের তথ্যের মিল নেই। দুটো দু’রকমের। আমরা সম্প্রতি দুটো প্রতিষ্ঠানের ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখেছি, সমাজকল্যাণে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ৩১ লাখের কিছু উপরে। বিবিএস প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা চিহ্নিত করেছে ১৯ লাখের কিছু উপরে। বিবিএসের আরেকটি জরিপের এক অংশে , বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৫টি প্রশ্ন অনুযায়ী, সেটাতে তারা বলছে ৭.৫৮। বিবিএসে প্রতিবন্ধিতার বিভিন্ন অংশের ফাংশনাবলটাকে তারা বিশ্লেষণ করেছে।

এখানে দুটো কারণ হতে পারে, পরিবারগুলো সঠিক তথ্য বিবিএসকে দেয়নি। অথবা বিবিএসের কমীরা তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সঠিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করেনি।
এক্ষেত্রে তিনি নিজেও একজন ভুক্তভোগী । আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, ২০২০ সালের জরিপে বিবিএসের তথ্য সংগ্রহকারীরা নিচতলায় দারোয়ানের কাছে শুনে তার মতো করে ফরম পূরণ করে দিয়েছেন। আমি দেখলাম, তথ্য সংগ্রহকারীরা আমার অফিস এবং বাসার ফ্লাটের দরজায় চিহ্ন দিয়ে গেছেন। এটা দেখে আমি বুঝতে পারলাম, গণনা শুরু হয়েছে। সেন্সর নিয়ে বিবিএসের সাথে বসেছি। প্রশিক্ষণের সময় বলেছি এই তথ্য গুলো নিতে হবে। বিবিএসের ফরমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আয়ের তথ্য, প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১২ ধরনের প্রতিবন্ধিতার কথা উল্লেখ করা রয়েছে। তাহলে তারা অবশ্যই সেটা জিজ্ঞেস করবে। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম, সেন্সরের লোক এসেছিল। তথ্য নিয়েছে। তিনি বললেন, নিয়েছে। কোথা থেকে নিয়েছে। আমার বাসায় তো আসেনি। তিনি জানালেন, তার বাসায় গিয়েছিল। তিনি তথ্য দিয়েছেন, কয়টা ফ্ল্যাট, কয়জন মানুষ, কি করে। তিনি বলেছেন, আমি চাকরি করি। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি কি বলেছেন আমার প্রতিবন্ধিতা রয়েছে। তিনি জানালেন সেটা তো জিজ্ঞেস করেনি?

সাথে সাথে আশরাফুন নাহার মিষ্টি বিবিএসের দায়িত্বরত একজন কর্মকর্তাকে ফোন করে বিষয়টি অবগত করেন। লোক পাঠান, কিন্তু তারা এমন আচরণ করেন, তিনি অনেক বড় অপরাধ করে ফেলেছেন। প্রতিবন্ধী নারীদের চাকরিতে অনেক প্রতিষ্ঠানের অনীহা রয়েছে। তারা মনে করেন, প্রতিবন্ধী নারীরা শুধু ফ্রন্ট ডেস্ক বা ব্যাক ডেস্কে কাজ করতে পারে। তারা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করতে পারেন না। যখন অভিজ্ঞতার কথা আসে তখন বলে, কর্মদক্ষতা নেই। সেজন্য মধ্যম পর্যায়ে বা উচ্চ পর্যায়ের অবস্থানে প্রতিবন্ধী নারীরা নিয়োগ পাচ্ছেন না। এই সমস্যা নিরসনে তিনি তার প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী নারীদের শুরু থেকে শেষ স্তর পর্যন্ত নিয়োগ প্রদান করেছেন। তার ৩৬ স্টাফের মধ্যে ২জন প্রতিবন্ধী পুরুষ স্টাফ রয়েছে। বাকি ৩৪ জন নারী । তাদের মধ্যে ৩১ জন প্রতিবন্ধী নারী।

এভাবেই প্রতিবন্ধী নারী নিয়ে তিনি তার সংগঠনটি সফলভাবে পরিচালনা করছেন। গত তিন বছরে এক হাজারের উপরে প্রতিবন্ধী নারীকে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা করছেন। কারো পিঠার দোকান আছে। কেউ দর্জির কাজ করছে, কারো কাপড়ের দোকান আছে। তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার জায়গাটা পরিবারেও বেড়েছে। ফলে পরিবারেও তাদের গুরুত্ব বেড়েছে। সাড়ে ৫ হাজার প্রতিবন্ধী নারী এই সংস্থার সাথে যুক্ত। এর সাথে যুক্ত হওয়ায় তাদের জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা বেড়েছে। শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। এজন্য এখন তারা আর সমাজের গালিগুলো শোনেন না।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিবন্ধী নারী-শিশুদের উন্নয়নেও কাজ করছেন। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরার নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য সেবা না পাওয়া, লবণাক্ত পানির কারণে প্রজননস্বাস্থ্য সেবা নষ্ট হওয়া। মাসিক না হওয়া, মাসিক নিয়ে নানা ট্যাবু, মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যু ইত্যাদি বিষয়গুলোও গুরুত্ব সহকারে দেখছেন।

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

প্রতিবন্ধী নারীদের অভিজ্ঞতা চ্যালেঞ্জ ও নেতৃত্বের গল্প-১

সর্বশেষ আপডেট ০৭:০৭:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ অক্টোবর ২০২৫

পরিবার-সমাজের নির্যাতন, অবহেলার সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন অনেক প্রতিবন্ধী নারী। এখনও লড়াই করছেন। তাদের অনেকে লেখাপড়া শিখে, প্রশিক্ষণ নিয়ে, কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সমাজে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। শুধু নিজের জায়গা তৈরি করেননি, তাঁর মতো অন্য নারী-পুরুষ উভয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছেন। এমন প্রতিবন্ধী নারীদের প্রতিনিধিত্বের সংখ্যাও ধীর গতিতে হলেও বাড়ছে।

তবে প্রতিবন্ধী নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে তাদের চ্যালেঞ্জগুলোকেও মোকাবিলা করতে হবে। আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের মতো প্রতিবন্ধী নারীরও সমান মর্যাদা, প্রজননস্বাস্থ্য, কাজের স্বীকৃতি পাওয়া তার সাংবিধানিক অধিকার।

যদিও জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ এর প্রতিটি ধারায় প্রতিবন্ধী নারীর অধিকারের কথা উল্লেখ রয়েছে।

জাতিসংঘ সনদ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং এসডিজি-এর আলোকে নারী, শিশু ও বয়স্ক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ প্রান্তিক পর্যায়ের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সম-সুযোগের বিষয়টিতে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তবে এই আইনে স্বাস্থ্যের কথা উল্লেখ থাকলেও প্রতিবন্ধী নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের কথা উল্লেখ নেই।

জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল, ২০১৫-এ নারী, শিশু, বয়ষ্ক ও প্রতিবন্ধী জনগণের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার এই কৌশলে সকল অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী জনগণের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরিতেও অঙ্গীকারাবদ্ধ।

সমাজসেবা অধিদপ্তর যদিও প্রতিবন্ধী ভাতা ও শিক্ষা ভাতা প্রদানেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এরপরও ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন প্রতিবন্ধী নারীরা। উইম্যান উইথ ডিজাব্লিটিজ ডেভেলপম্যান্ট ফাউন্ডেশনের (ডাব্লি উডিডিএফ) নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি এসব প্রতিবন্ধী নারীর অধিকার আদায়ে কাজ করছেন। তিনি নিজেও একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কাছে হার মানেননি তিনি। কিন্তু এতোটা পথ পাড়ি দিতে অনেক লড়াই করতে হয়েছে তাকে। এইচএসসি পড়ার সময় প্রতিবন্ধিতার শিকার হন তিনি। তার যমজ বোন জেলা সদরে কোচিং সেন্টারে কোচিং করতে পারলেও প্রতিবন্ধিতার কারণে উপজেলা থেকে হুইল চেয়ার নিয়ে তিনি কোচিং করতে যেতে পারেননি। কারণ একদিকে তার গণপরিবহনে ওঠা-নামা, রিজার্ভ পরিবহনে যাওয়া, অন্যদিকে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় ক্লাশ করাও সম্ভব ছিল না। তার বোন স্পোকেন ইংলিশ, কম্পিউটার শিখতে পারলেও তিনি পারেননি এসব জায়গায় প্রবেশগম্যতা না থাকার কারণে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই সে ব্যবস্থা ছিল না । মাস্টার্স সম্পন্ন করে এমফিলে ভর্তি হন মিষ্টি। কিন্তু এমফিল সম্পন্ন করতে পারেননি। এভাবে তিনি শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।

প্রতিবন্ধী নারীদের উন্নয়নে আশরাফুন নাহার মিষ্টি ২০০৭ সালে একটি সংগঠনের মাধ্যমে কাজ শুরু করেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তিনি বুঝতে পারেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে কোনো ব্যবস্থা নেই। এরপরও সমস্ত প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে পুরুষরা কোথাও কোথাও কাজের ব্যবস্থা করলেও নারীদের ক্ষেত্রে তা একেবারেই অসম্ভব।

কারণ একজন প্রতিবন্ধী পুরুষ তার ভাই, বন্ধু বা প্রতিবেশীর সহযোগিতায় বা তাকে সাথে নিয়ে বাড়ির বাইরে যেতে পারেন। তারা তাকে রিকশা বা সিএনজি, বাসে কোলে করে তুলে দিতে পারেন। কিন্তু একজন প্রতিবন্ধী নারীর ক্ষেত্রে এটা সম্ভব নয়। একজন পুরুষের সহযোগিতা নিয়ে বিভিন্ন যানবাহনে চড়তে পারবেন না। কোনো প্রতিষ্ঠানে র‌্যাম বা লিফট না থাকলে সিঁড়িতে প্রতিবন্ধী নারীকে পুরুষের তুলে দেওয়াকে সমাজ ভালো চোখে দেখবে না।

এ ব্যাপারে আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র, বিনোদন কেন্দ্র, অফিস আদালত, ব্যাংকে যাতায়াতের কোনো উপযোগী ব্যবস্থা না থাকলে প্রতিবন্ধী নারীরা এগুতে পারবেন না। প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য প্রকৃত পরিবর্তন না এলে তারা কোনো সমার্থক সুবিধা পাবেন না।

এ বিষয়গুলো বিবেচনা করে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভেবেছি আমাদের আগামী প্রজন্মের প্রতিবন্ধী নারীদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করবো। তারা যেন আমাদের মতো বাধার সম্মুখীন না হয়। সে লক্ষ্যে উইম্যান উইথ ডিজাব্লিটিজ ডেভেলপম্যান্ট ফাউন্ডেশন (ডাব্লিউ ডি ডি এফ) নামে সংস্থার মাধ্যমে আমরা প্রতিবন্ধী নারীরা একত্রিত হয়ে আওয়াজ তুলি ।
এই সংগঠনের মাধ্যমে প্রচার শুরু করি। কিছুদিন অন্য প্রতিবন্ধী সংগঠনগুলো বুঝতে পারেনি প্রতিবন্ধী নারীরা আলাদা একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে যাচ্ছি। কিন্তু নারী সংগঠনগুলো আমাদের সেভাবে গ্রহণ করেননি।

নারী সংগঠনগুলোর সভায় অংশ নেওয়ার একদিনের অভিজ্ঞতা তিনি তুলে ধরেন। সিডও প্ল্যাটফর্ম নিয়ে আলোচনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্টেপস স্টুয়ার্ডসের একটি সভায় অংশ নেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিরিন আখতার ও তিনি । সেখানে একজন নারী নেত্রীর সাথে তার দেখা হয়। তিনি তাকে অবাক হয়ে দেখেন, সিএনজি থেকে হুইল চেয়ার নিয়ে কিভাবে নামলেন। হুইল চেয়ার খুলে বসলেন। অন্যদের সহযোগিতায় তারা সিঁড়ি দিয়ে উঠে সভাকক্ষে প্রবেশ করেন। সেদিন কেউ তাদের সাথে কথা বলেননি। বরং যিনি সিএনজি থেকে নামতে দেখেছিলেন, তিনি তাদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘আপনাদের এখানে এত কষ্ট করে আসার কি দরকার ছিল। এত কষ্ট করে, আমরাই চলতে পারি না! আপনাদের কথাটা একটা চিরকুটে লিখে দিলে হতো।’
এটা ছিল তার নারী আন্দোলনের প্ল্যাটফর্মের প্রথম আলাপচারিতা। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নারী নেত্রীরা কেউ বলেননি, ওদের আসার দরকার আছে। যিনি তাদের সভায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনিও কোনো কথা বলেননি। তাহলে কি পুরুষরা, নারী নেত্রীরা তাদের প্রবেশগম্যতাকে গ্রহণ করছেন না। তাদের চেষ্টা কি বৃথা যাবে! এই প্রশ্নটি রাষ্ট্র, সমাজের কাছে রেখেছিলেন আশরাফুন নাহার মিষ্টি।

তিনি দমে যাননি। বরং শপথ নেন, জাতীয় পর্যায়ে নারী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, একবছর পর ড্রাফট রিপোট তৈরি হয়। কিন্তু সেখানে প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক কোনো শব্দ ছিল না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কমসংস্থান, গ্রামীণ নারী যতগুলো আর্টিকেল আছে সেখানে আমাদের মতামত নেই। সেদিন তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলাম, ‘সম্মান রেখে আপনাদেরকে বলছি, একটি বছর আমরা আপনাদের সাথে ছিলাম। আপনারা রিপোর্ট প্রস্তুত করেছেন। কিন্তু কোথাও আমাদের কথা উল্লেখ নেই। তারা বলেছেন, আমরা রিপোর্টটা তো কনসালটেন্ট দিয়ে করিয়েছি, কনসালটেন্ট ইস্যুটা বাদ দিয়েছে। কিন্তু আমরা তো এই সমাজেই বসবাস করি!

অন্যদিকে প্রতিবন্ধী পুরুষদের আন্দোলনে আমাদের অবহেলা, বঞ্চনা, কটাক্ষের শিকার হতে হয়েছে। তারা বলেছেন, আমাদের ৩০০ সংগঠন, আপনাদের জন্য আলাদা সংগঠন করার কী দরকার ছিল। তহবিল নেই। আপনারা কেনো এই ঝামেলার মধ্যে আসলেন!

আশরাফুন নাহার মিষ্টি এর প্রতিত্ত্যুরে বলেছেন , আপনারা প্রতিবন্ধী ইস্যুতে যখন কথা বলবেন, প্রতিবন্ধী নারীদের চাহিদার কথাও রয়েছে। তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য , চাকরি, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এই বিষয়গুলোও রয়েছে। এজন্য আমাদের উপস্থিতি দরকার। এ নিয়ে আমরা আওয়াজ তুলতে চাই। তাদের লিডারশিপ নষ্ট করতে অনেকেই চেষ্টা করেছেন। বিভিন্ন ফোরামে অনেক আলোচনা, সমালোচনা, অপমানের সম্মুখীনও হয়েছেন। কিন্তু তারা থেমে থাকেননি।

অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে এভাবেই শুরুটা করেছিলেন আশরাফুন নাহার মিষ্টি । প্রতিবন্ধী নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য , কর্মসংস্থান, বাসস্থান উপযোগী পরিবেশের অধিকারের জন্য যেমন সংগ্রাম করেছেন। তেমনি রাজধানীর ফুটপাতে চলাচলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রবেশগম্যতার জন্যও সংগ্রাম করেছেন। ফুটপাতে যাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা হাঁটতে পারেন, হুইল চেয়ারে চলাচল করতে পারেন, বাসে উঠতে পারেন। তাদের এডভোকেসির কারণেই ঢাকার উত্তরা, কিছু অংশে ফুটপাতের মাথার অংশ ঢালু হয়েছে। কিন্তু সেখানেও বাধা সৃষ্টি হয়েছে ফুটপাতের উপর মটরসাইকেল চলাচল করায়। এ কারণে খুঁটি, স্টিলের রড দিয়ে ফুটপাতের মাথা বন্ধ করে দিয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বললেও কাজ হয়নি।

অন্যদিকে ফুটপাত উঁচু হওয়ায়, বয়স্ক, অসুস্থ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী চার ধরনের জনগোষ্ঠীর কেউ ব্যবহার করতে পারেন না। ফুটপাতের প্রবেশগম্যতার সুবিধা কেবল প্রতিবন্ধী নারীদের জন্যই প্রযোজ্য নয়, চার ধরনের জনগোষ্ঠীর জন্যই দরকার। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লিফট, র‌্যাম না থাকা অর্থাৎ শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপরে ওঠা প্রতিবন্ধীবান্ধব না হওয়ার কারণে সমাজের সব মানুষের মতো একই তালে এগিয়ে যেতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। এটা শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী প্রতিবন্ধী ব্যক্তির চাহিদা হতে পারে হুইল চেয়ার, সাদা ছড়ি বা সানগ্লাস, একটা ম্যাগনেফাইড গ্লাস। এই জিনিসগুলো তার জীবনকে চালানোর জন্য প্রয়োজন। এটা তার বিশেষ চাহিদা নয়। এটা তার জীবনের প্রয়োজনীয় চাহিদা। মানুষের প্রতিবন্ধিতা বা অক্ষমতা বিবেচনা করে তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব ।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করতে গিয়ে চলাচলে প্রতিবন্ধকতার শিকার হন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যামের সামনে খুঁটি গেড়ে দেওয়া হয়েছে। তার মতে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাপনাকে যদি এভাবে নষ্ট করে দেয়, তাহলে ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা ডিগ্রি নিয়ে বের হবেন তারা প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে কি ধারণা নিবে। তাদের ধারণা থাকা দরকার ছিল, আমাদের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সংযুক্ত যেসকল কর্মকর্তা রয়েছেন তাদের সাময়িক বা স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধিতার শিকার হতে পারেন। সড়ক দুঘটনা, অসুখ, বিসুখের কারণে। তাহলে তারা কি তাদের দায়িত্বের জায়গা থেকে ছিটকে পড়বেন। তাদের বহিষ্কার করা হবে। তাদেরকে চাকরিচ্যুত করা হবে। তারা যে সম্মানজনক পজিশনে অবস্থান করছেন সেখান থেকে তাকে বাদ দেওয়া হবে। এই ধরনের অসংখ্য চ্যালেঞ্জ আমাদের সমাজে রয়েছে।

একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সমস্ত ইন্দ্রিয় অন্য সব স্বাভাবিক মানুষের মতোই। তারা যে কোনো রোগে ভুগতে পারেন। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ডাক্তার দেখাবেন। এটাই স্বাভাবিক চিত্র হওয়ার কথা। কিন্তু এখানেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নানারকম প্রতিবন্ধিতার শিকার হন। একটি উদাহরণ দিয়ে আশরাফুন নাহার মিষ্টি জানান, তার দুই সহকর্মীর একজনের একটি পা খাটো। আরেকজন এক পা আরেক পায়ে ভর করে হাঁটেন। তারা দাঁতের চিকিৎসক দেখাবেন। একজন ওয়ার্ড বয় তাদের দেখে বলেন, ডা. সফিউল্লাহ নয়, ডা. বিল্লালের কাছে যান। তাদের ধারণা একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির আর কোনো শারীরিক, মানসিক সমস্যা হতে পারে না। এ জায়গাটাতেও আমরা কাজ করছি।

পাঁচটি বিভাগে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে শেল্টার হোম রয়েছে । বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হয়ে প্রতিবন্ধী নারীরা আইনগত সহায়তা গ্রহণ করেন। বাড়িতে নিরাপত্তাহীনতার কারণে বিচারচলাকালীন এই সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকেন। এখানকার ব্যবস্থাপনাও প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য প্রযোজ্য নয় ।

স্থাপত্য অধিদপ্তর ও মহিলা অধিদপ্তরের যৌথ অনুমতি নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শেল্টার হোম পরিদর্শন করেন তিনি। তিনি বলেন, এখানে র‌্যামের ব্যবস্থা নেই। এ ব্যাপারে রাজশাহীর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর সাথে কথা বলেন। প্রধান প্রকৌশলী জানান, ‘ডিজাইনের মধ্যে র‌্যামের উল্লেখ নেই।’

রাজশাহীর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, আপনারা ভালো কাজে এসেছেন, এটা আমি অবশ্যই করে দিবো। প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য শেল্টার হোম অবশ্যই প্রবেশগম্যতা হবে।

তিনি আরো বলেন, আপনারা আরেকটি কাজ করে যেতে পারেন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের লিফটটা দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট । এটা রোগীদের জন্য উপযোগী নয়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের সাথে কথা বলে যান। অধ্যক্ষের সাথে দেখা করেন তিনি। অধ্যক্ষ একজন বিগ্রেডিয়ার ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আপনাকে কে বলেছে, আমাদের এখানে প্রতিবন্ধী রোগী সেবা নিতে আসেন। এখানে প্রতিবন্ধী রোগীর সেবা দেওয়া হয় না। যাদের হার্ট, কিডনি, মস্তিষ্কের সমস্যা হবে তাদের সেবা দেয়।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি তাকে জানান, এখনি তো তিনজন প্রতিবন্ধী রোগী এসেছেন সেবা গ্রহণ করতে।

অধ্যক্ষ নির্দ্বিধায় স্বীকার করে বলেন, ‘ আমি তো এগুলো জানি না। কারণ রোগীদের ফরমে কোথাও কোনো প্রতিবন্ধিকতা কথা উল্লেখ নেই ।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি তাকে অবগত করেন, রেজিস্ট্রেশন ফরমে বা যেখানে রেকর্ড করা হয় সেখানে উল্লেখ থাকতে হবে রোগীর প্রতিবন্ধিতা আছে কিনা? যদি থাকে সেখানে ধরনটা উল্লেখ করতে হবে। শারীরিক, বুদ্ধি, দৃষ্টি, বাক, মানসিক ইত্যাদি ১২ ক্যাটাগরির প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ধরণ উল্লেখ করতে হবে।

একই ঘটনা বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ, চিটাগাং মেডিকেল কলেজেও হয়েছে। অধিদপ্তরে ফোন করে ডিজাইন বের করে তাকে বলে দিতে হয়েছে কত নাম্বার পৃষ্ঠার কত কলাম। একটি মেডিক্যাল কলেজের প্রধান জানেন না, একজন চিকিৎসক প্রতিবন্ধী মানুষদেরও তো এই সমস্যা হতে পারে।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি প্রধান প্রকৌশলীকে বলেছিলেন, ভবনের ডিজাইনটা দেখেন, এত নাম্বার পৃষ্ঠায় রয়েছে। প্রধান প্রকৌশলী ডিজাইন বের করতে পারেননি।

চিটাগাং মেডিকেল কলেজের প্রশাসনও তাকে জানায়, মেডিকেল অফিসারদের অনেক লোড নিতে হয়। লোকবল অত্যন্ত কম। তারা যেখানে তথ্য সংযুক্ত করেন, সেখানে আরেকটা মানুষের তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। তারা মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলার পরামশ দেয়। এও বলেন, যদি একজন করে লোক দেয়, তাহলে এই ডাটা সংগৃহীত হবে। এর অর্থ সরকারের যে কাজগুলো রয়েছে এসডিজি বাস্তবায়ন করবে ২০৩০ সালের মধ্যে, এই এসডিজি বাস্তবায়নে যে থিম রয়েছে, কাউকে পিছিয়ে ফেলে নয়, এটা তারা অজন করবে, তা তারা অজন করতে পারবে না। কারণ ডাটা সংগৃহীত করার সময় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কথা সংযুক্ত করা হচ্ছে না।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি এভাবেই কাজ করছেন প্রতিবন্ধী নারী-পুরুষ উভয়ের জীবনমান্নোয়নে। তিনি বলেন, আমরা আলাদা কিছু চাই না। চাই অন্তর্ভুক্তিমূলক আশ্রয়কেন্দ্র, শেল্টারহোম হবে। এই শেল্টারহোমগুলোতে প্রতিবন্ধী নারীরা অপ্রতিবন্ধী নারীদের পাশাপাশি থাকবেন। তাহলে অপ্রতিবন্ধী নারীরা প্রতিবন্ধী নারীদের প্রতি সংবেদনশীল হবে। কারণ উভয়ে নির্যাতনের শিকার হন। তারা একই সমাজে বেড়ে উঠবেন। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা লিঙ্গ ভিত্তিক, বয়স ভিত্তিক তথ্য সংযুক্ত করতে হবে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণের দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডাক্তারদের। আমরা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি অবগত করেছি।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সুরক্ষা আইন ২০১৩ হয়েছে, এর আলোকে ২৮টি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করণের জন্য যখন সমাজসেবার কাছে যাওয়া হয়, তারা তাদেরকে এক ধরনের দুভোগের মধ্যে ফেলে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডাক্তাররা আরেক ধরনের দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে। এরফলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সবাই সরকারের প্রতিবন্ধিতা চিহ্নিতকরণের সেবা পাচ্ছে না। দেখা যায়, ১০০ জনের মধ্যে ৩০ জন চিহ্নিতকরণ সেবা পাচ্ছে। বাকিরা জানেই না এই সেবা পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, বগুড়ায় ডাক্তাররা একটি সেমিনারে বলেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি জেলা-উপজেলা সমাজসেবা অফিসে যেন একজন ডাক্তার নিয়োগ দেন প্রতিবন্ধিতা চিহ্নিতকরণের জন্য। কারণ জেলা-উপজেলা পর্যায়ের ডাক্তাররা অনেক ব্যস্ত থাকেন। তাহলে অন্তর্ভুক্তি কিভাবে হবে। সমাজসেবা ছাড়া অন্যান্য দফতর তাদের দায়িত্ব পালনে আগ্রহী নয়।
প্রতিবন্ধী ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি, ঋণ ইত্যাদি নিয়ে তিনি বলেন, শারীরিক ও এসিড দগ্ধ নারীদের জন্য ঋণটা প্রদানের ব্যবস্থা ছিল। বছর দুয়েক-তিনেক ধরে ঋণ বন্ধ।

আইন মন্ত্রণালয়ের ৫টি কমিটি -কার্যকরী কমিটি, জেলা কমিটি, উপজেলা কমিটি, শহর কমিটি রয়েছে। এই কমিটির ভেতরে সরকারের ইউএনও, ডিসি, পুলিশ, অন্যান্য কর্তৃপক্ষ জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে এবং প্রতিবন্ধী সংগঠনের একজন নারী ও পুরুষ থাকেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এই কমিটির মিটিং হয় না। কমিটির সদস্যরা জানেনও না, তারা এই কমিটিতে রয়েছেন।

বিশেষ শিক্ষা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, অটিজম, ডাউন সিমড্রোম ব্যক্তির দরকার। সেলিব্রাল পালসি থেকে আরম্ভ করে বাকিরা সবাই সাধারণ শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত হতে পারবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গায় যেতে পারবে। এভাবে অন্তর্ভুক্তি উত্তরণ হবে।

সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজের অন্যসব মানুষের সাথে একত্রিতভাবে, মিলিতভাবে জীবন যাপন করতে দিতে আগ্রহী নয়। এটা তাদের এক ধরণের মানসিক সমস্যা। সরকারের নিয়ম কানুনের মধ্যে রয়েছে সমন্বিত ব্যবস্থা হতে হবে। তাহলে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করবে সমাজসেবার সাথে অন্যান্য মন্ত্রণালয় জানালেন তিনি।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের কর্মকান্ডের সুবিধাগুলো প্রতিবন্ধী নারীরা পাবেন । অথচ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় বলছে আপনাদের দায়িত্ব আমাদের না। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে দুটো সেবা রয়েছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার স্তর অনুযায়ী শিক্ষা উপবৃত্তি। আরেকটি ভাতা। একজন শিক্ষার্থী দুটো সুবিধা পাবে না। এজন্য অনেকে আজীবন ভাতা পাওয়ার জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি না নিয়ে ভাতা নিয়েছেন। শিক্ষা উপবৃত্তি না নেওয়ায় কোটা পূরণ না হওয়ায় এর হার বাড়েনি। কারণ শিক্ষকরা তাদের ভাতা নেওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করেছেন। ভাতাটা দেওয়া হয় একজন প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনযাপন, চলাফেরা, ওষুধপত্র দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য। শিক্ষার্থীদেরও এই জিনিসগুলো প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষা উপবৃত্তি দেওয়া হয়, ভতি হওয়া, টিউশন ফি, বেতন প্রদান, খাতা, পেন্সিল, কলম কেনার জন্য। তাহলে একজন শিক্ষার্থী কেনো দুটো সেবা সমাজকল্যাণ থেকে পাবে না।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ও একই কথা বলছে। কোথাও কোথাও জেলা উপজেলা পর্যায়ে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় কিছু সুবিধা প্রতিবন্ধী নারীদের দিতে চাচ্ছে টার্গেট পূরণের জন্য। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে আপনারা দিতে পারবেন না। কারণ সরকারের নিয়ম রয়েছে, কেউ যদি সরকারের একটি সুবিধা পায়, আরেকটি সুবিধা পাবে না। একজন প্রতিবন্ধী নারীর অসুবিধা মাল্টিপল। নারীত্বের কারণে, প্রতিবন্ধিতার কারণে, মাইনোরিটি রিলিজিয়াস কমিটির হলে, ধর্মের কারণে, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে হলে তার নৃতাত্ত্বিকতার কারণে। একজন প্রতিবন্ধী নারী মাল্টিপল চ্যালেঞ্জ নিয়ে জীবন যাপন করে তাহলে সে যদি মাল্টিটল সুবিধা না পায় তাহলে চ্যালেঞ্জ উত্তরণ করবে কিভাবে!

আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মায়েদের মধ্যে যাদের মনোবল দৃঢ় আছে। তাদের মধ্যে কজন ভাবেন, আমার প্রতিবন্ধী সন্তানকে অন্তর্ভুক্তি সমাজে রেখে যাবো। এরকম কয়টি পরিবার রয়েছে। আমাদের দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বেশির ভাগ পরিবার নিরক্ষর, অর্থনৈতিক দুর্বল । প্রতিবন্ধী সন্তান হলে, সেই সন্তানের শিক্ষার সব্বোর্চ স্তরে যাওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

তিনি বলেন, আমাদের এসডিজির অগ্রগতি পরিমাপের জন্য একটা সিস্টেম আছে। এসডিজির মধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি হচ্ছে কিনা তা তা পরিমাপ করার ব্যবস্থা নেই। বিবিএসের তথ্যের সাথে সমাজকল্যাণের তথ্যের মিল নেই। দুটো দু’রকমের। আমরা সম্প্রতি দুটো প্রতিষ্ঠানের ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখেছি, সমাজকল্যাণে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ৩১ লাখের কিছু উপরে। বিবিএস প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা চিহ্নিত করেছে ১৯ লাখের কিছু উপরে। বিবিএসের আরেকটি জরিপের এক অংশে , বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৫টি প্রশ্ন অনুযায়ী, সেটাতে তারা বলছে ৭.৫৮। বিবিএসে প্রতিবন্ধিতার বিভিন্ন অংশের ফাংশনাবলটাকে তারা বিশ্লেষণ করেছে।

এখানে দুটো কারণ হতে পারে, পরিবারগুলো সঠিক তথ্য বিবিএসকে দেয়নি। অথবা বিবিএসের কমীরা তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সঠিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করেনি।
এক্ষেত্রে তিনি নিজেও একজন ভুক্তভোগী । আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, ২০২০ সালের জরিপে বিবিএসের তথ্য সংগ্রহকারীরা নিচতলায় দারোয়ানের কাছে শুনে তার মতো করে ফরম পূরণ করে দিয়েছেন। আমি দেখলাম, তথ্য সংগ্রহকারীরা আমার অফিস এবং বাসার ফ্লাটের দরজায় চিহ্ন দিয়ে গেছেন। এটা দেখে আমি বুঝতে পারলাম, গণনা শুরু হয়েছে। সেন্সর নিয়ে বিবিএসের সাথে বসেছি। প্রশিক্ষণের সময় বলেছি এই তথ্য গুলো নিতে হবে। বিবিএসের ফরমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আয়ের তথ্য, প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১২ ধরনের প্রতিবন্ধিতার কথা উল্লেখ করা রয়েছে। তাহলে তারা অবশ্যই সেটা জিজ্ঞেস করবে। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম, সেন্সরের লোক এসেছিল। তথ্য নিয়েছে। তিনি বললেন, নিয়েছে। কোথা থেকে নিয়েছে। আমার বাসায় তো আসেনি। তিনি জানালেন, তার বাসায় গিয়েছিল। তিনি তথ্য দিয়েছেন, কয়টা ফ্ল্যাট, কয়জন মানুষ, কি করে। তিনি বলেছেন, আমি চাকরি করি। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি কি বলেছেন আমার প্রতিবন্ধিতা রয়েছে। তিনি জানালেন সেটা তো জিজ্ঞেস করেনি?

সাথে সাথে আশরাফুন নাহার মিষ্টি বিবিএসের দায়িত্বরত একজন কর্মকর্তাকে ফোন করে বিষয়টি অবগত করেন। লোক পাঠান, কিন্তু তারা এমন আচরণ করেন, তিনি অনেক বড় অপরাধ করে ফেলেছেন। প্রতিবন্ধী নারীদের চাকরিতে অনেক প্রতিষ্ঠানের অনীহা রয়েছে। তারা মনে করেন, প্রতিবন্ধী নারীরা শুধু ফ্রন্ট ডেস্ক বা ব্যাক ডেস্কে কাজ করতে পারে। তারা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করতে পারেন না। যখন অভিজ্ঞতার কথা আসে তখন বলে, কর্মদক্ষতা নেই। সেজন্য মধ্যম পর্যায়ে বা উচ্চ পর্যায়ের অবস্থানে প্রতিবন্ধী নারীরা নিয়োগ পাচ্ছেন না। এই সমস্যা নিরসনে তিনি তার প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী নারীদের শুরু থেকে শেষ স্তর পর্যন্ত নিয়োগ প্রদান করেছেন। তার ৩৬ স্টাফের মধ্যে ২জন প্রতিবন্ধী পুরুষ স্টাফ রয়েছে। বাকি ৩৪ জন নারী । তাদের মধ্যে ৩১ জন প্রতিবন্ধী নারী।

এভাবেই প্রতিবন্ধী নারী নিয়ে তিনি তার সংগঠনটি সফলভাবে পরিচালনা করছেন। গত তিন বছরে এক হাজারের উপরে প্রতিবন্ধী নারীকে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা করছেন। কারো পিঠার দোকান আছে। কেউ দর্জির কাজ করছে, কারো কাপড়ের দোকান আছে। তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার জায়গাটা পরিবারেও বেড়েছে। ফলে পরিবারেও তাদের গুরুত্ব বেড়েছে। সাড়ে ৫ হাজার প্রতিবন্ধী নারী এই সংস্থার সাথে যুক্ত। এর সাথে যুক্ত হওয়ায় তাদের জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা বেড়েছে। শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। এজন্য এখন তারা আর সমাজের গালিগুলো শোনেন না।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিবন্ধী নারী-শিশুদের উন্নয়নেও কাজ করছেন। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরার নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য সেবা না পাওয়া, লবণাক্ত পানির কারণে প্রজননস্বাস্থ্য সেবা নষ্ট হওয়া। মাসিক না হওয়া, মাসিক নিয়ে নানা ট্যাবু, মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যু ইত্যাদি বিষয়গুলোও গুরুত্ব সহকারে দেখছেন।