রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কমছে, সহিংসতামুক্ত পরিবেশের দাবি
- সর্বশেষ আপডেট ০৮:২৭:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬
- / 240
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে সর্বশেষ ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে আসায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বক্তারা। তাদের মতে, নির্বাচনী ব্যবস্থার কাঠামোগত বাধা, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এবং সাইবার বুলিং নারীদের রাজনৈতিক নেতৃত্বে আসার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত এক বিশেষ সংলাপে এসব কথা বলেন বক্তারা। ‘নারী নেতৃত্ব ও সুরক্ষা’ শীর্ষক এই সংলাপের আয়োজন করে একশনএইড বাংলাদেশ ও দৈনিক প্রথম আলো।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, গত ২৫ বছরের মধ্যে এবারই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তারা নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে সহিংসতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।
সংলাপটি পরিচালনা করেন একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির। অনুষ্ঠানে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ২০ জন নারী প্রার্থীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
এ সময় বক্তব্য দেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, ব্রিটিশ হাই কমিশনের সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাডভাইজার তাহেরা জাবীন, ইউএনডিপির সিনিয়র জেন্ডার অ্যানালিস্ট শারমিন ইসলাম, একশনএইড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সোসাইটির চেয়ারপার্সন ইব্রাহিম খলিল আল জায়াদ, জাগো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা করভি রাখসান্দ এবং জাতীয় রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের প্রতিনিধি সাদাফ প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ২০ নারী প্রার্থীকে সম্মাননা জানানো হয়। তাদের মধ্যে ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য নায়েব ইউসুফ আহমেদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা, ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা, এনসিপির ঢাকা-২০ আসনের প্রার্থী নাবিলা তাসনীদ, বিএনপির ঢাকা-১৪ আসনের প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলি, সিপিবির নেত্রকোনা-৪ আসনের জলি তালুকদার, গণঅধিকার পরিষদের মেঘলা আলম, গণসংহতি আন্দোলনের তাসলিমা আক্তার, জাতীয় পার্টির মনিকা আলম, বাসদের সীমা দত্ত, এবি পার্টির ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি, নাগরিক ঐক্যের শাহনাজ হক, গণফোরামের সরদার আশা পারভেজ এবং জাসদের আরিফা আক্তার বেবি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সংলাপে একশনএইড বাংলাদেশের উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইক্যুইটি টিম লিড মরিয়ম নেসা দেশের জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ধর্ষণের ঘটনা ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসেই অন্তত ২৭২ জন নারী ও কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৭০ জন ধর্ষণের শিকার।
তিনি আরও জানান, দেশের ৩৯ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়নি, যা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার উদাহরণ।
বক্তারা বলেন, ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র সাতজন নারী নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই সংখ্যক নারী নির্বাচিত হয়েছিলেন।
সংলাপে বক্তারা নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং রাজনীতিতে সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
তারা জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোতে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেন।
ফারাহ কবির বলেন, নারী প্রার্থীরা প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও সাহসিকতার সঙ্গে রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছেন। তবে কেবল সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা এখন জরুরি।
রুমিন ফারহানা বলেন, পরিবার থেকেই নারীর প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে সমাজের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি।
ডা. তাসনিম জারা বলেন, অনেক রাজনৈতিক দল নারীদের প্রতীকীভাবে ব্যবহার করে। তৃণমূল পর্যায়ে নারীরা সক্রিয় থাকলেও মনোনয়নের সময় পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো আবার পুরুষদেরই প্রাধান্য দেয়।
অনুষ্ঠানের শেষাংশে অন্যতম আকর্ষণ ছিল নাট্য সংগঠন ‘পালাকার’-এর পরিবেশনায় ইন্টারেক্টিভ ফোরাম থিয়েটার ‘ চেনা পরবাস’। অভিনয়ের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি এবং নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের প্রতিকূলতার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়।


































