ঢাকা ০১:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিরোধীদলের কর্মসূচি: জনদাবি নাকি রাজনৈতিক শোডাউন?

রোকন-উজ-জামান
  • সর্বশেষ আপডেট ১২:০৯:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 301

রোকন-উজ-জামান

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন ও কর্মসূচি নতুন কোনো বিষয় নয়। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংকট, বিশেষ করে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্য এবং সরবরাহ সংকটের প্রতিবাদে ১১ দলীয় জোটের রাজপথের কর্মসূচি নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি সরাসরি জনগণের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সংকট। ফলে এসব বিষয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সংকট নিরসনে বিরোধী জোটের আন্দোলনের কৌশল, কর্মসূচির ধরন এবং রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জ্বালানি সম্পদের অপচয় করে জ্বালানির দাম কমানোর দাবি কতটা যৌক্তিক, কর্মসূচির ধরন ও মূল দাবির মধ্যে কতটা বৈপরীত্য রয়েছে এবং সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত না করে দলীয় কর্মীনির্ভর বলয়ের মধ্যে আন্দোলন সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা; এসব বিষয় বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

১. আন্দোলনের যৌক্তিকতা ও জ্বালানি অপচয়ের দ্বন্দ্ব

১১ দলীয় জোটের আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য সাধারণ মানুষের জন্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সহজলভ্য করা এবং বর্ধিত দাম কমানো। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি জনবান্ধব ও প্রয়োজনীয় দাবি। তবে এই দাবি আদায়ে জোট যেসব কর্মসূচি; যেমন দীর্ঘ দূরত্বের রোডমার্চ, লংমার্চ কিংবা গাড়ি ও মোটরবাইক নিয়ে শোডাউন; বেছে নিচ্ছে, তা পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি করছে।

সংকটের সময়ে শত শত গাড়ির বহর নিয়ে পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেন পুড়িয়ে ‘তেল-গ্যাসের দাম কমাও’ স্লোগান দেওয়া এক ধরনের পদ্ধতিগত অসংগতি। একদিকে দেশ জ্বালানি ঘাটতি ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে ভুগছে, অন্যদিকে আন্দোলন করতে গিয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় হচ্ছে।

এ ধরনের কর্মসূচি শুধু জ্বালানি সম্পদের অপচয়ই বাড়ায় না, সাধারণ মানুষের চোখে আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে। একটি অর্থনৈতিক ও নীতিনির্ভর দাবিকে যদি অপচয়মূলক রাজপথের মহড়ায় রূপ দেওয়া হয়, তাহলে আন্দোলনের নীতিগত যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াই স্বাভাবিক।

২. কর্মসূচির ধরন ও জনদাবির বৈপরীত্য

রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মসূচি হওয়া উচিত দাবির প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জ্বালানি সংকটের মতো নীতিগত ও কাঠামোগত বিষয় নিয়ে আন্দোলনের ক্ষেত্রে মিছিল, সভা কিংবা সড়ক অবরোধের মতো প্রচলিত কর্মসূচি বাস্তব পরিবর্তন আনতে কতটা কার্যকর; তা ভেবে দেখা জরুরি।

নীতিগত দ্বন্দ্ব ও রাজপথের মহড়া

জ্বালানি খাতের সংস্কার, মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা, সিস্টেম লস কমানো কিংবা আইপিপি চুক্তির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা মূলত নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়। আন্দোলনকারীরা যেখানে কাঠামোগত সংস্কারের দাবি তুলছেন, সেখানে কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য যদি রাজপথ অচল করে দেওয়া হয়, তাহলে দাবির সঙ্গে কর্মপদ্ধতির একটি মৌলিক অসংগতি তৈরি হয়।

জনভোগান্তি বনাম জনস্বার্থ

গ্যাস বা জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট সৃষ্টি কিংবা দীর্ঘ লংমার্চের কারণে সাধারণ মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। একই সঙ্গে যানবাহনে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় হয়। অর্থাৎ যে জনস্বার্থ রক্ষার জন্য আন্দোলন, সেই আন্দোলনের কারণেই অনেক ক্ষেত্রে জনগণকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

ফলে কর্মসূচির ধরন এবং আন্দোলনের কাঙ্ক্ষিত অর্জনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এতে আন্দোলনের বাস্তব কার্যকারিতা কমে গিয়ে তা অনেক সময় রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

৩. জনগণের অনুপস্থিতি ও দলীয় কর্মীনির্ভরতা

দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের মতো সর্বজনীন ইস্যুতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই একটি কার্যকর আন্দোলনের প্রধান শক্তি হওয়া উচিত। কিন্তু ১১ দলীয় জোটের এসব কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের দৃশ্যমান অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম বলে সমালোচনা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মসূচি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে জোটভুক্ত দলগুলোর নেতা-কর্মীদের উপস্থিতিতে।

এর পেছনে কয়েকটি রাজনৈতিক দুর্বলতা কাজ করতে পারে।

জনগণের ওপর আস্থার সংকট

আন্দোলনকারী দলগুলো হয়তো নিজেরাই নিশ্চিত নয় যে তাদের আহ্বানে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নামবে। রাজনৈতিক দল যখন বুঝতে পারে তাদের সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা সাধারণ মানুষের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছেনি, তখন নিজস্ব কর্মী-সমর্থকদের বড় বহর নিয়ে জনসমাগমের চিত্র তৈরি করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

নাগরিকদের বিচ্ছিন্নতা

সাধারণ মানুষের একটি অংশ বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখে। রাজনৈতিক আন্দোলনের ফলে তাদের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব কোনো পরিবর্তন আসবে—এমন আস্থার ঘাটতি থাকলে তারা আন্দোলন থেকে দূরে থাকতে পারে।

দলীয় শক্তি প্রদর্শনের প্রবণতা

কোনো নির্দিষ্ট ইস্যুতে জনসম্পৃক্ততা তৈরির চেয়ে অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে বড় জমায়েত হলেও সেটি সবসময় গণআন্দোলনের রূপ নেয় না; বরং দলীয় শোডাউন হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

৪. আন্দোলনের রাজনৈতিক দুর্বলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা

১১ দলীয় জোটের আন্দোলন তাদের নীতিগত ও সামাজিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়।

বিকল্প নীতির অভাব

আন্দোলনকারীরা মূলত জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম কমানোর দাবি তুলছেন। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় কীভাবে সরকারের ব্যয় কমিয়ে দাম সহনীয় পর্যায়ে আনা সম্ভব; সে বিষয়ে সুস্পষ্ট বিকল্প পরিকল্পনা খুব একটা সামনে আসছে না।

একটি নীতিনির্ভর আন্দোলনের সঙ্গে গবেষণাভিত্তিক প্রস্তাব, তথ্য-উপাত্ত এবং বিকল্প নীতির রূপরেখা থাকা জরুরি। শুধু স্লোগাননির্ভর কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে জনআস্থা তৈরি করতে পারে না।

জোটভিত্তিক অসংগতি

১১টি ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত জোট একটি নির্দিষ্ট ইস্যুতে একসঙ্গে আন্দোলন করলেও তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীতির অভিন্ন রূপরেখা কতটা রয়েছে, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।

ফলে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন সাময়িক রাজনৈতিক উত্তাপ সৃষ্টি করলেও দীর্ঘমেয়াদে জনগণের মধ্যে স্থায়ী প্রভাব তৈরি করতে পারছে না।

গণমুখী কাঠামোর অভাব

আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো নীতিগত পরিবর্তন আদায়ে শুধু রাজপথের আন্দোলনই যথেষ্ট নয়। সংলাপ, আইনগত উদ্যোগ, গবেষণা, থিঙ্কট্যাংকের বিশ্লেষণ এবং নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে জনমত গঠনও গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের ঘাটতি থাকলে রাজনৈতিক দলগুলো সহজেই প্রচলিত মিছিল, সমাবেশ ও স্লোগাননির্ভর কর্মসূচির মধ্যে আটকে যেতে পারে।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অন্যায়, সংকট কিংবা জনদুর্ভোগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার অধিকার বিরোধী দলগুলোর রয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে জনগণের পক্ষে অবস্থান নেওয়াও নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু।

তবে তেল-গ্যাসের দাম কমানোর দাবি জানিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ব্যয় করে দীর্ঘ লংমার্চ কিংবা সড়ক অচল করে দেওয়ার কর্মসূচি আন্দোলনের নৈতিক ও বাস্তব যৌক্তিকতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে এতে রাজনৈতিক আন্দোলনের গভীরে থাকা কৌশলগত ও নৈতিক সংকটও প্রকাশ পায়।

১১ দলীয় জোট যদি এই আন্দোলনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আস্থা অর্জন করতে চায়, তাহলে তাদের কর্মীনির্ভর শোডাউনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাজপথে লোকসমাগম দেখানোর চেয়ে প্রয়োজন গঠনমূলক বিকল্প নীতি উপস্থাপন, তথ্য-উপাত্তনির্ভর প্রচার, জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং অপচয়মূলক কর্মসূচি পরিহার করা।

অন্যথায় জনস্বার্থের দাবিকে সামনে রেখে পরিচালিত এসব আন্দোলন রাজনৈতিক মাঠে শক্তি প্রদর্শনের কৌশল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে; কিন্তু তাতে সাধারণ মানুষের বাস্তব সংকটের স্থায়ী সমাধান কতটা সম্ভব হবে, সেটিই থেকে যাবে বড় প্রশ্ন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

বিরোধীদলের কর্মসূচি: জনদাবি নাকি রাজনৈতিক শোডাউন?

সর্বশেষ আপডেট ১২:০৯:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন ও কর্মসূচি নতুন কোনো বিষয় নয়। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংকট, বিশেষ করে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্য এবং সরবরাহ সংকটের প্রতিবাদে ১১ দলীয় জোটের রাজপথের কর্মসূচি নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি সরাসরি জনগণের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সংকট। ফলে এসব বিষয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সংকট নিরসনে বিরোধী জোটের আন্দোলনের কৌশল, কর্মসূচির ধরন এবং রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জ্বালানি সম্পদের অপচয় করে জ্বালানির দাম কমানোর দাবি কতটা যৌক্তিক, কর্মসূচির ধরন ও মূল দাবির মধ্যে কতটা বৈপরীত্য রয়েছে এবং সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত না করে দলীয় কর্মীনির্ভর বলয়ের মধ্যে আন্দোলন সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা; এসব বিষয় বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

১. আন্দোলনের যৌক্তিকতা ও জ্বালানি অপচয়ের দ্বন্দ্ব

১১ দলীয় জোটের আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য সাধারণ মানুষের জন্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সহজলভ্য করা এবং বর্ধিত দাম কমানো। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি জনবান্ধব ও প্রয়োজনীয় দাবি। তবে এই দাবি আদায়ে জোট যেসব কর্মসূচি; যেমন দীর্ঘ দূরত্বের রোডমার্চ, লংমার্চ কিংবা গাড়ি ও মোটরবাইক নিয়ে শোডাউন; বেছে নিচ্ছে, তা পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি করছে।

সংকটের সময়ে শত শত গাড়ির বহর নিয়ে পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেন পুড়িয়ে ‘তেল-গ্যাসের দাম কমাও’ স্লোগান দেওয়া এক ধরনের পদ্ধতিগত অসংগতি। একদিকে দেশ জ্বালানি ঘাটতি ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে ভুগছে, অন্যদিকে আন্দোলন করতে গিয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় হচ্ছে।

এ ধরনের কর্মসূচি শুধু জ্বালানি সম্পদের অপচয়ই বাড়ায় না, সাধারণ মানুষের চোখে আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে। একটি অর্থনৈতিক ও নীতিনির্ভর দাবিকে যদি অপচয়মূলক রাজপথের মহড়ায় রূপ দেওয়া হয়, তাহলে আন্দোলনের নীতিগত যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াই স্বাভাবিক।

২. কর্মসূচির ধরন ও জনদাবির বৈপরীত্য

রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মসূচি হওয়া উচিত দাবির প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জ্বালানি সংকটের মতো নীতিগত ও কাঠামোগত বিষয় নিয়ে আন্দোলনের ক্ষেত্রে মিছিল, সভা কিংবা সড়ক অবরোধের মতো প্রচলিত কর্মসূচি বাস্তব পরিবর্তন আনতে কতটা কার্যকর; তা ভেবে দেখা জরুরি।

নীতিগত দ্বন্দ্ব ও রাজপথের মহড়া

জ্বালানি খাতের সংস্কার, মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা, সিস্টেম লস কমানো কিংবা আইপিপি চুক্তির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা মূলত নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়। আন্দোলনকারীরা যেখানে কাঠামোগত সংস্কারের দাবি তুলছেন, সেখানে কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য যদি রাজপথ অচল করে দেওয়া হয়, তাহলে দাবির সঙ্গে কর্মপদ্ধতির একটি মৌলিক অসংগতি তৈরি হয়।

জনভোগান্তি বনাম জনস্বার্থ

গ্যাস বা জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট সৃষ্টি কিংবা দীর্ঘ লংমার্চের কারণে সাধারণ মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। একই সঙ্গে যানবাহনে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় হয়। অর্থাৎ যে জনস্বার্থ রক্ষার জন্য আন্দোলন, সেই আন্দোলনের কারণেই অনেক ক্ষেত্রে জনগণকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

ফলে কর্মসূচির ধরন এবং আন্দোলনের কাঙ্ক্ষিত অর্জনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এতে আন্দোলনের বাস্তব কার্যকারিতা কমে গিয়ে তা অনেক সময় রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

৩. জনগণের অনুপস্থিতি ও দলীয় কর্মীনির্ভরতা

দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের মতো সর্বজনীন ইস্যুতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই একটি কার্যকর আন্দোলনের প্রধান শক্তি হওয়া উচিত। কিন্তু ১১ দলীয় জোটের এসব কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের দৃশ্যমান অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম বলে সমালোচনা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মসূচি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে জোটভুক্ত দলগুলোর নেতা-কর্মীদের উপস্থিতিতে।

এর পেছনে কয়েকটি রাজনৈতিক দুর্বলতা কাজ করতে পারে।

জনগণের ওপর আস্থার সংকট

আন্দোলনকারী দলগুলো হয়তো নিজেরাই নিশ্চিত নয় যে তাদের আহ্বানে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নামবে। রাজনৈতিক দল যখন বুঝতে পারে তাদের সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা সাধারণ মানুষের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছেনি, তখন নিজস্ব কর্মী-সমর্থকদের বড় বহর নিয়ে জনসমাগমের চিত্র তৈরি করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

নাগরিকদের বিচ্ছিন্নতা

সাধারণ মানুষের একটি অংশ বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখে। রাজনৈতিক আন্দোলনের ফলে তাদের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব কোনো পরিবর্তন আসবে—এমন আস্থার ঘাটতি থাকলে তারা আন্দোলন থেকে দূরে থাকতে পারে।

দলীয় শক্তি প্রদর্শনের প্রবণতা

কোনো নির্দিষ্ট ইস্যুতে জনসম্পৃক্ততা তৈরির চেয়ে অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে বড় জমায়েত হলেও সেটি সবসময় গণআন্দোলনের রূপ নেয় না; বরং দলীয় শোডাউন হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

৪. আন্দোলনের রাজনৈতিক দুর্বলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা

১১ দলীয় জোটের আন্দোলন তাদের নীতিগত ও সামাজিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়।

বিকল্প নীতির অভাব

আন্দোলনকারীরা মূলত জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম কমানোর দাবি তুলছেন। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় কীভাবে সরকারের ব্যয় কমিয়ে দাম সহনীয় পর্যায়ে আনা সম্ভব; সে বিষয়ে সুস্পষ্ট বিকল্প পরিকল্পনা খুব একটা সামনে আসছে না।

একটি নীতিনির্ভর আন্দোলনের সঙ্গে গবেষণাভিত্তিক প্রস্তাব, তথ্য-উপাত্ত এবং বিকল্প নীতির রূপরেখা থাকা জরুরি। শুধু স্লোগাননির্ভর কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে জনআস্থা তৈরি করতে পারে না।

জোটভিত্তিক অসংগতি

১১টি ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত জোট একটি নির্দিষ্ট ইস্যুতে একসঙ্গে আন্দোলন করলেও তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীতির অভিন্ন রূপরেখা কতটা রয়েছে, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।

ফলে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন সাময়িক রাজনৈতিক উত্তাপ সৃষ্টি করলেও দীর্ঘমেয়াদে জনগণের মধ্যে স্থায়ী প্রভাব তৈরি করতে পারছে না।

গণমুখী কাঠামোর অভাব

আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো নীতিগত পরিবর্তন আদায়ে শুধু রাজপথের আন্দোলনই যথেষ্ট নয়। সংলাপ, আইনগত উদ্যোগ, গবেষণা, থিঙ্কট্যাংকের বিশ্লেষণ এবং নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে জনমত গঠনও গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের ঘাটতি থাকলে রাজনৈতিক দলগুলো সহজেই প্রচলিত মিছিল, সমাবেশ ও স্লোগাননির্ভর কর্মসূচির মধ্যে আটকে যেতে পারে।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অন্যায়, সংকট কিংবা জনদুর্ভোগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার অধিকার বিরোধী দলগুলোর রয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে জনগণের পক্ষে অবস্থান নেওয়াও নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু।

তবে তেল-গ্যাসের দাম কমানোর দাবি জানিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ব্যয় করে দীর্ঘ লংমার্চ কিংবা সড়ক অচল করে দেওয়ার কর্মসূচি আন্দোলনের নৈতিক ও বাস্তব যৌক্তিকতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে এতে রাজনৈতিক আন্দোলনের গভীরে থাকা কৌশলগত ও নৈতিক সংকটও প্রকাশ পায়।

১১ দলীয় জোট যদি এই আন্দোলনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আস্থা অর্জন করতে চায়, তাহলে তাদের কর্মীনির্ভর শোডাউনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাজপথে লোকসমাগম দেখানোর চেয়ে প্রয়োজন গঠনমূলক বিকল্প নীতি উপস্থাপন, তথ্য-উপাত্তনির্ভর প্রচার, জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং অপচয়মূলক কর্মসূচি পরিহার করা।

অন্যথায় জনস্বার্থের দাবিকে সামনে রেখে পরিচালিত এসব আন্দোলন রাজনৈতিক মাঠে শক্তি প্রদর্শনের কৌশল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে; কিন্তু তাতে সাধারণ মানুষের বাস্তব সংকটের স্থায়ী সমাধান কতটা সম্ভব হবে, সেটিই থেকে যাবে বড় প্রশ্ন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক