ঢাকা ০২:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নির্বাচনী ইশতেহার বিশ্লেষণে সমন্বিত উন্নয়ন রূপরেখা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৬:৪৪:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / 352

বিআইপি কনফারেন্স হলে সংবাদ সম্মেসলনের আয়োজন করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

দেশের তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার পর্যালোচনা করে পরিকল্পিত নগরায়ন ও টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি সমন্বিত দিকনির্দেশনা তুলে ধরেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। প্রমাণভিত্তিক, পেশাদার ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এই দিকনির্দেশনায় জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা, সাশ্রয়ী আবাসন, পরিবেশ সংরক্ষণ, আধুনিক গণপরিবহন, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার এবং সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিআইপি কনফারেন্স হলে আয়োজিত “জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬: ইশতেহার পর্যালোচনা- পরিকল্পনা, নগরায়ন ও টেকসই উন্নয়ন” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এই সমন্বিত রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো যদি সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশে জলবায়ু সহনশীল, বাসযোগ্য ও মানবিক নগর গড়ে তোলা সম্ভব।

বিআইপি’র সহ-সভাপতি-১ পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসানের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। আলোচনায় আরও অংশ নেন বিআইপি’র উপদেষ্টা পরিকল্পনাবিদ সালমা এ. শফি, সহ-সভাপতি-২ পরিকল্পনাবিদ ড. ফারহানা আহমেদ এবং সাবেক সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহম্মদ খান।

স্বাগত বক্তব্যে শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, উন্নয়নকে কেবল প্রকল্পভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, যেখানে নগরায়ন, পরিবেশ, অর্থনীতি ও সামাজিক ন্যায় একসঙ্গে বিবেচিত হবে। তিনি বলেন, আগামী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উন্নয়ন কার্যক্রম শুরুর আগে প্রশাসনিক কাঠামো, নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে। পাশাপাশি সরকার ও বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক শক্তিকে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

মূল প্রবন্ধে ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং উন্নয়ন দর্শনে নতুন সূচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে ঘোষিত ইশতেহারগুলোতে নগরায়ন, অবকাঠামো, পরিবহন ও আবাসন খাতে পরিকল্পনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, যা ইতিবাচক দিক। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে পেশাদার পরিকল্পনাবিদদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি জানান, বিকেন্দ্রীকরণ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।

পরিকল্পনাবিদ সালমা এ. শফি বলেন, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে ভিন্ন ভিন্ন শক্তিশালী দিক রয়েছে। একটি দলের ইশতেহারে যে বিষয়টি অনুপস্থিত, অন্য দলেরটিতে তা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাই নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সরকারকে পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিআইপি সেই সমন্বয়ের সূচনা করেছে।

ড. ফারহানা আহমেদ বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে নগর পরিবেশ ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। ইশতেহার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব দলই টেকসই ও পরিবেশবান্ধব নগরায়নের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। তবে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে পরিকল্পনার সংযোগ আরও সুস্পষ্ট হওয়া দরকার। পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে পরিকল্পনাবিদসহ সব অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দেন।

অধ্যাপক ড. আদিল মুহম্মদ খান বলেন, পরিকল্পনা বিষয়ক অঙ্গীকার বাড়লেও বাস্তবায়নের স্পষ্ট রোডম্যাপ এখনো দুর্বল। বিশেষ করে জেলাভিত্তিক বাজেট বণ্টন, পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের উন্নয়ন, গণপরিবহন ব্যবস্থার লক্ষ্য নির্ধারণ এবং শিল্পদূষণ নিয়ন্ত্রণে ইটিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনার অভাব রয়েছে। তিনি স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় বাজেট থেকে সরাসরি বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে বিআইপি দশ দফা সুপারিশ উপস্থাপন করে। এর মধ্যে রয়েছে- জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বিত ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও বিশেষ এলাকার জন্য পৃথক উন্নয়ন পরিকল্পনা, সাশ্রয়ী ও সামাজিক আবাসন, আধুনিক ও গণপরিবহনমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিবেশ সংরক্ষণ, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং প্রমাণভিত্তিক পেশাদার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন।

বিআইপি নেতারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, আগামী নির্বাচিত সরকার এই সুপারিশগুলো বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করবে, যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি শক্ত ভিত গড়ে দেবে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

নির্বাচনী ইশতেহার বিশ্লেষণে সমন্বিত উন্নয়ন রূপরেখা

সর্বশেষ আপডেট ০৬:৪৪:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দেশের তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার পর্যালোচনা করে পরিকল্পিত নগরায়ন ও টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি সমন্বিত দিকনির্দেশনা তুলে ধরেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। প্রমাণভিত্তিক, পেশাদার ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এই দিকনির্দেশনায় জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা, সাশ্রয়ী আবাসন, পরিবেশ সংরক্ষণ, আধুনিক গণপরিবহন, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার এবং সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিআইপি কনফারেন্স হলে আয়োজিত “জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬: ইশতেহার পর্যালোচনা- পরিকল্পনা, নগরায়ন ও টেকসই উন্নয়ন” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এই সমন্বিত রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো যদি সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশে জলবায়ু সহনশীল, বাসযোগ্য ও মানবিক নগর গড়ে তোলা সম্ভব।

বিআইপি’র সহ-সভাপতি-১ পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসানের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। আলোচনায় আরও অংশ নেন বিআইপি’র উপদেষ্টা পরিকল্পনাবিদ সালমা এ. শফি, সহ-সভাপতি-২ পরিকল্পনাবিদ ড. ফারহানা আহমেদ এবং সাবেক সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহম্মদ খান।

স্বাগত বক্তব্যে শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, উন্নয়নকে কেবল প্রকল্পভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, যেখানে নগরায়ন, পরিবেশ, অর্থনীতি ও সামাজিক ন্যায় একসঙ্গে বিবেচিত হবে। তিনি বলেন, আগামী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উন্নয়ন কার্যক্রম শুরুর আগে প্রশাসনিক কাঠামো, নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে। পাশাপাশি সরকার ও বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক শক্তিকে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

মূল প্রবন্ধে ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং উন্নয়ন দর্শনে নতুন সূচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে ঘোষিত ইশতেহারগুলোতে নগরায়ন, অবকাঠামো, পরিবহন ও আবাসন খাতে পরিকল্পনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, যা ইতিবাচক দিক। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে পেশাদার পরিকল্পনাবিদদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি জানান, বিকেন্দ্রীকরণ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।

পরিকল্পনাবিদ সালমা এ. শফি বলেন, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে ভিন্ন ভিন্ন শক্তিশালী দিক রয়েছে। একটি দলের ইশতেহারে যে বিষয়টি অনুপস্থিত, অন্য দলেরটিতে তা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাই নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সরকারকে পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিআইপি সেই সমন্বয়ের সূচনা করেছে।

ড. ফারহানা আহমেদ বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে নগর পরিবেশ ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। ইশতেহার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব দলই টেকসই ও পরিবেশবান্ধব নগরায়নের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। তবে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে পরিকল্পনার সংযোগ আরও সুস্পষ্ট হওয়া দরকার। পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে পরিকল্পনাবিদসহ সব অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দেন।

অধ্যাপক ড. আদিল মুহম্মদ খান বলেন, পরিকল্পনা বিষয়ক অঙ্গীকার বাড়লেও বাস্তবায়নের স্পষ্ট রোডম্যাপ এখনো দুর্বল। বিশেষ করে জেলাভিত্তিক বাজেট বণ্টন, পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের উন্নয়ন, গণপরিবহন ব্যবস্থার লক্ষ্য নির্ধারণ এবং শিল্পদূষণ নিয়ন্ত্রণে ইটিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনার অভাব রয়েছে। তিনি স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় বাজেট থেকে সরাসরি বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে বিআইপি দশ দফা সুপারিশ উপস্থাপন করে। এর মধ্যে রয়েছে- জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বিত ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও বিশেষ এলাকার জন্য পৃথক উন্নয়ন পরিকল্পনা, সাশ্রয়ী ও সামাজিক আবাসন, আধুনিক ও গণপরিবহনমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিবেশ সংরক্ষণ, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং প্রমাণভিত্তিক পেশাদার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন।

বিআইপি নেতারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, আগামী নির্বাচিত সরকার এই সুপারিশগুলো বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করবে, যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি শক্ত ভিত গড়ে দেবে।