ঢাকা ০৫:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্গাপূজার আগে ৩৪ স্থানে হামলা-প্রতিমা ভাঙচুর

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৪:৪৪:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
  • / 21

কুষ্টিয়ায় গভীর রাতে মন্দিরে ঢুকে প্রতিমা ভাঙচুর

শারদীয় দুর্গাপূজার প্রস্তুতির মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৪টি পূজামণ্ডপে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি।

বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় সংগঠন দুটির নেতারা এসব দাবি জানান। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে এ সভার আয়োজন করা হয়।

সভায় নেতারা বলেন, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর ও নির্বিঘ্নে উদযাপিত হবে—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা। ঈদ, পূজা, বড়দিন ও বুদ্ধপূর্ণিমাসহ সব ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে উদযাপিত হওয়া উচিত। তাঁরা এমন একটি সমাজ গঠনের প্রত্যাশা করেন, যেখানে ধর্মীয় উৎসব পালনে মানুষকে ভয়ভীতি কিংবা অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হবে না।

সভায় লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস (সাধন)। এতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ও কাজল দেবনাথ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দার, উপদেষ্টা বীরেশ চন্দ্র সাহা এবং মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথসহ অন্য নেতারা।

পাঁচ দিনের নয়, ৩৬৫ দিনের নিরাপত্তা দাবি

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দুর্গাপূজার প্রস্তুতির সময় সিলেট, রাজবাড়ী, পঞ্চগড়, নেত্রকোনা ও টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলায় প্রতিমা ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ফরিদপুরের একটি ঐতিহ্যবাহী কালীমন্দিরে চুরি এবং সুনামগঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, দোকানপাট ও মন্দিরে হামলা-লুটপাটের অভিযোগও তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া নওগাঁয় গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারী পরিচয়ে ডাকাতির ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়।

এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং অনেক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে লিখিত বক্তব্যে দাবি করা হয়। তবে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার ওপর নির্ভর না করে রাষ্ট্রীয়ভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ এবং সামাজিক প্রতিরোধ জোরদারের আহ্বান জানান নেতারা।

তাঁরা বলেন, শুধু পূজার পাঁচ দিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই চলবে না; ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সারা বছর নিরাপত্তা দিতে হবে। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে হলে ৩৬৫ দিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

লিখিত বক্তব্যে আরও জানানো হয়, পূজা আয়োজন নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি থাকবে না বলেও জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কোথাও সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

সুষ্ঠুভাবে পূজা আয়োজনের জন্য বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ২২ দফা নির্দেশনা পাঠানোর কথাও সভায় জানানো হয়।

সংখ্যালঘুদের আট দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত

সভায় ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার ও অস্তিত্ব রক্ষায় আট দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন ও সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন এবং অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভুক্তভোগীদের জমির মালিকানা ও দখল ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে জনসংখ্যার অনুপাতে সরকার, সংসদ ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

এ ছাড়া দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণে আইন প্রণয়ন, বৈষম্য বিলোপ আইন করা, হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টকে ফাউন্ডেশনে রূপান্তর এবং দুর্গাপূজার অষ্টমী থেকে দশমী পর্যন্ত তিন দিনের ছুটি সরকারি গেজেটে প্রকাশের দাবি জানানো হয়।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণ ও বৈষম্য বিলোপ আইনের খসড়া বিল ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে।

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

দুর্গাপূজার আগে ৩৪ স্থানে হামলা-প্রতিমা ভাঙচুর

সর্বশেষ আপডেট ০৪:৪৪:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

শারদীয় দুর্গাপূজার প্রস্তুতির মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৪টি পূজামণ্ডপে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি।

বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় সংগঠন দুটির নেতারা এসব দাবি জানান। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে এ সভার আয়োজন করা হয়।

সভায় নেতারা বলেন, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর ও নির্বিঘ্নে উদযাপিত হবে—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা। ঈদ, পূজা, বড়দিন ও বুদ্ধপূর্ণিমাসহ সব ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে উদযাপিত হওয়া উচিত। তাঁরা এমন একটি সমাজ গঠনের প্রত্যাশা করেন, যেখানে ধর্মীয় উৎসব পালনে মানুষকে ভয়ভীতি কিংবা অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হবে না।

সভায় লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস (সাধন)। এতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ও কাজল দেবনাথ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দার, উপদেষ্টা বীরেশ চন্দ্র সাহা এবং মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথসহ অন্য নেতারা।

পাঁচ দিনের নয়, ৩৬৫ দিনের নিরাপত্তা দাবি

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দুর্গাপূজার প্রস্তুতির সময় সিলেট, রাজবাড়ী, পঞ্চগড়, নেত্রকোনা ও টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলায় প্রতিমা ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ফরিদপুরের একটি ঐতিহ্যবাহী কালীমন্দিরে চুরি এবং সুনামগঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, দোকানপাট ও মন্দিরে হামলা-লুটপাটের অভিযোগও তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া নওগাঁয় গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারী পরিচয়ে ডাকাতির ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়।

এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং অনেক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে লিখিত বক্তব্যে দাবি করা হয়। তবে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার ওপর নির্ভর না করে রাষ্ট্রীয়ভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ এবং সামাজিক প্রতিরোধ জোরদারের আহ্বান জানান নেতারা।

তাঁরা বলেন, শুধু পূজার পাঁচ দিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই চলবে না; ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সারা বছর নিরাপত্তা দিতে হবে। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে হলে ৩৬৫ দিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

লিখিত বক্তব্যে আরও জানানো হয়, পূজা আয়োজন নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি থাকবে না বলেও জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কোথাও সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

সুষ্ঠুভাবে পূজা আয়োজনের জন্য বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ২২ দফা নির্দেশনা পাঠানোর কথাও সভায় জানানো হয়।

সংখ্যালঘুদের আট দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত

সভায় ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার ও অস্তিত্ব রক্ষায় আট দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন ও সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন এবং অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভুক্তভোগীদের জমির মালিকানা ও দখল ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে জনসংখ্যার অনুপাতে সরকার, সংসদ ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

এ ছাড়া দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণে আইন প্রণয়ন, বৈষম্য বিলোপ আইন করা, হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টকে ফাউন্ডেশনে রূপান্তর এবং দুর্গাপূজার অষ্টমী থেকে দশমী পর্যন্ত তিন দিনের ছুটি সরকারি গেজেটে প্রকাশের দাবি জানানো হয়।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণ ও বৈষম্য বিলোপ আইনের খসড়া বিল ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে।